Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম: গ্রাম থেকে শহর, উন্নয়নের মন্ত্রেই রানাঘাটের মন জয়ে মরিয়া তাপস. ভোট ব্যাংক ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ বিজেপির

রানাঘাট স্টেশনের জিআরপি গেটের পাশের ওভারব্রিজ ধরে ওপারে নামলে পার্ক স্ট্রিট। পিচ রাস্তা ধরে সুরেন্দ্র সিনেমা হলের দিকে কিছুটা এগোতেই রাস্তাটা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে।

রানাঘাট  উত্তর-পশ্চিম: গ্রাম থেকে শহর, উন্নয়নের মন্ত্রেই রানাঘাটের মন জয়ে মরিয়া তাপস. ভোট ব্যাংক ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ বিজেপির
  • ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, রানাঘাট: রানাঘাট স্টেশনের জিআরপি গেটের পাশের ওভারব্রিজ ধরে ওপারে নামলে পার্ক স্ট্রিট। পিচ রাস্তা ধরে সুরেন্দ্র সিনেমা হলের দিকে কিছুটা এগোতেই রাস্তাটা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। ডানদিকে বেশ কিছুটা গেলে মিলন সংঘের মাঠ। বিকেলের মাঠে একদিকে চলছে ক্রিকেট ম্যাচ। মাঠের অর্ধেকটা জুড়ে ছোটো গোলপোস্টে ফুটবল খেলতে ব্যস্ত জনা দশ-বারো। বাঁদিকের সরু রাস্তার পাশে ছোটো মঞ্চ করা। সন্ধ্যায় প্রচারে আসবেন তৃণমূল প্রার্থী তাপস ঘোষ। তারই প্রস্তুতি। সাইডলাইনে বসে মাঝেমধ্যেই সেদিকে তাকাচ্ছিলেন এক মাঝবয়সি যুবক। ইন্দ্রজিৎ সরকার। স্থানীয় বাসিন্দা। কথায় কথায় বললেন, ‘রানাঘাটে বড়ো রাস্তার পাশাপাশি অলিগলির অবস্থাও বেশ ভালো। পানীয় জল, আলো, নিকাশি নিয়েও আমাদের কোনো অভিযোগ নেই।’ বোঝা গেল, পুরসভার কাজের সুফল পাচ্ছেন স্থানীয়রা। সাড়ে ছ’টা নাগাদ এলেন তৃণমূল প্রার্থী। মিনিট দশেকের ভাষণ। রানাঘাটের উন্নয়নের কাজে আরও গতি আনার প্রতিশ্রুতি। রানাঘাট পুরসভা তৃণমূলের হাতে থাকলেও গত বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে পদ্ম ফুটেছিল। এবারে জোড়াফুল ফুটিয়ে ডবল ইঞ্জিনের গতিতে রানাঘাটের উন্নয়নে মরিয়া তাপস।

Advertisement

ভোটপ্রচারে উন্নয়নই মূল অস্ত্র। সঙ্গে রয়েছে জনসংযোগ দক্ষতা ও পরিচিতি। এই ত্রিফলাতেই এবার জয়ের অঙ্ক কষছেন রানাঘাট-১ পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন সভাপতি তাপস ঘোষ। একাধিকবার পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হওয়ার সুবাদে গোটা এলাকা চেনেন হাতের তালুর মতো। এই প্রথম বিধানসভায় প্রার্থী হয়েছেন তিনি। জিতে এসে রানাঘাটের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র ভবন পুনর্গঠনের কাজ ফের শুরু করতে চান তিনি। সব পরিকল্পনাই কি শহরকেন্দ্রিক? ‘তা কেন? পঞ্চায়েত এলাকার জন্যও একাধিক পরিকল্পনা রয়েছে। বারাসাত গ্রাম পঞ্চায়েতের মুগরাইল ও চন্দনদহ গ্রামের মধ্যে অঞ্জনা নদীর উপর একটি ফুটব্রিজ ও খিসমার কুটিরপাড়ায় অঞ্জনা নদীর উপর একটি কংক্রিটের সেতু নির্মাণ করার ভাবনা রয়েছে। তাহেরপুরে নিকাশি ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির পরিষেবার উন্নতিতে আরও জোর দেওয়া হবে।’
গত বিধানসভা নির্বাচনে রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম কেন্দ্র থেকে জয়ী হন বিজেপির পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়। আগে তৃণমূলে থাকলেও গত বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। এবছর ফের তাঁকেই প্রার্থী করেছে দল। গ্রামাঞ্চলে টোটো র‍্যালি ও শহরে পদযাত্রার মধ্যে দিয়ে জনসংযোগ সারছেন বিজেপি প্রার্থী। নিজের খাসতালুকে দ্বিতীয়বার জেতা নিয়ে আশাবাদী। বললেন, ‘এই বিধানসভার মানুষ গত পাঁচ বছরে আমার কাজ দেখেছেন। সেই কাজের নিরিখেই ভোট চাইছি।’ বিজেপি প্রার্থী কাজের নিরিখে ভোট চাইলেও রাস্তাঘাটের যানজট নিয়ে বেজায় ক্ষুব্ধ শহরবাসী। শহরের শক্তিশালী ভোট ব্যাংকে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে চিন্তায় পদ্মশিবির।
যুযুধান দলগুলির মাথায় ঘুরছে রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম কেন্দ্রের নির্বাচনি ইতিহাসও। ২০১১ সাল থেকে এই কেন্দ্রের বাসিন্দারা তিনবার তিন ভিন্ন দলকে বেছে নিয়েছে। ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায় সিপিএমের মীনা ভট্টাচার্যকে ২৭,৩৪৪ ভোটে পরাজিত করেন। ২০১৬ সালে কংগ্রেসের শঙ্কর সিংহ তৃণমূলের পার্থসারথিকে হারিয়ে জয়ী হন। আবার ২০২১ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপির টিকিটে লড়ে পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায় কংগ্রেস-ত্যাগী তৃণমূল প্রার্থী শঙ্কর সিংহকে পরাজিত করেন। গত বিধানসভা নির্বাচনে শুধু শহর থেকেই প্রায় ছ’হাজার ভোটে তৃণমূলকে পিছনে ফেলেছিল বিজেপি। বীরনগর পুরসভাতেও এগিয়েছিল বিজেপি। একাধিক পঞ্চায়েত এলাকাতেও লিড ছিল বিজেপির। গত লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে রানাঘাট শহর থেকে প্রায় সাত হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি। সেই ভোটব্যাংক এবার ধরে রাখতে মরিয়া পদ্মশিবির। আবার গত পুরসভা নির্বাচনে ২০টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৯টি ওয়ার্ডেই জয়ী হয়েছে তৃণমূল। সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখলে লিড পেতে বিশেষ অসুবিধা হবে না বলে দাবি তৃণমূল নেতৃত্বের। পুরসভার পাশাপাশি রামনগর, কালীনারায়ণপুর খিসমার মতো পঞ্চায়েত এলাকা থেকেও ভোট টানতে বাড়তি নজর দিচ্ছে ঘাসফুল শিবির। 
ভোটের আবহে এসআইআর নিয়েও হিসাবনিকেশে ব্যস্ত বাম-ডান সব শিবিরই। নদীয়া দক্ষিণের অধিকাংশ আসন মতুয়া প্রভাবিত হলেও রানাঘাটের এই আসনে তাঁদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। তারপরেও এসআইআরের কোপে এই বিধানসভার প্রায় ৩৬ হাজার ৫২৭ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। তা নিয়ে চিন্তায় সব শিবিরই।
রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম কেন্দ্রে মূল লড়াই দুই ফুলের মধ্যে হলেও পায়ের নীচে মাটি শক্ত করার লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বামেরাও। সৌজন্যে তাহেরপুর। গত পুর নির্বাচনে রাজ্যজুড়ে সবুজ ঝড়ের মধ্যে বামেদের একমাত্র মরুদ্যান ছিল এই তাহেরপুর পুরসভা। এই পুরসভায় সিপিএমকে  সাফল্য এনে দিয়েছিল নিবিড় জনসংযোগ। সেই ফর্মুলাতেই এবার নিজেদের ভোট লাল পতাকায় ফেরাতে মরিয়া সিপিআই প্রার্থী আইনজীবী দেবাশিস চক্রবর্তী। তিনি বলেন, ‘এই কেন্দ্রে গত ১৫ বছর মানুষের যা অভিজ্ঞতা, তাতে তৃণমূল বা বিজেপি আর জিততে পারবে না।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ