নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: চূড়ান্ত বাস্তব থেকে সীমাহীন কল্পনা। পূর্ণাঙ্গ থিম থেকে থিমের আংশিক প্রতিফলন। ঐতিহ্যের অনুসরণ থেকে নিখাদ নতুন ভাবনা। শৈশব থেকে কর্মমুখর জীবনের ধারাকথন। উত্তরপাড়া থেকে চুঁচুড়া, থিমের মাধ্যমে ফুটে উঠছে এমনই নানা বিন্যাস। সময়ের এক বর্ণময় কোলাজ হয়ে উঠছে পুজোমণ্ডপ। স্বর্গীয় তার সজ্জা, মোহন তার সাজ। আলোকে আলোকময়, কায়া ধরে উঠছে মায়ানগরী।
উত্তরপাড়ার ভদ্রকালী বলাকা সর্বজনীন থিম পুজোর জন্য চর্চিত। এবছরও বিরাট আয়োজন করেছেন উদ্যোক্তারা। পুজোর সমস্তটাই এবার সাজছে বাঁকুড়ার ডোকরার সাজে। হারিয়ে যাওয়া ডোকরাকে নাগরিক চৈতন্যে উসকে দিতেই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেখানে আলোকসজ্জা থেকে প্রতিমা, মণ্ডপ থেকে মণ্ডপের অন্দরবাহির, সবটাই ডোকরার ধাঁচে তৈরি করা হচ্ছে। মাটির প্রতিমা অর্থাৎ দেবী এখানে ডোকরার গড়নে বিরাজ করছেন। অবশ্যই সপরিবারে। মণ্ডপের আনাচকানাচ থেকে মূল মণ্ডপের আদলও নির্মাণ হচ্ছে ডোকরার চর্চিত গঠনের আদলে। অন্দর ও বাহিরসজ্জায় ব্যবহার হবে ডোকরার নানা মডেল। সবটাই তৈরি করা হচ্ছে ফাইবার দিয়ে। আলোকসজ্জাতেও ডোকরাকে অনুসরণ করেই নানা মডেল থেকে আলোকময় আদল তৈরি করা হচ্ছে। পুজো উদ্যোক্তা সৌমেন ঘোষ বলেন, আমরা ডোকরাময় একটা ভুবন তৈরি করেছি। যেখানে দেবীও ডোকরার আদলেই অবতীর্ণ হবেন। আলোকসজ্জাতেও সেই আদলই দেখা যাবে। একটি অভিনব মণ্ডপ ও প্রতিমাসজ্জা করা হচ্ছে।
উত্তরপাড়ার ডোকরাময় ভুবন থেকে বেরিয়ে এলে শ্রীরামপুরের চাতরা দোলতলা সর্বজনীয় ডাক দেবে মোহনবাগানের মোহময় দুনিয়া দেখে যাওয়ার। ১০২ বছরে পা দেওয়া দোলতলা সর্বজনীনের মণ্ডপ ও প্রতিমাসজ্জায় থাকছে শতবর্ষ প্রাচীন সবুজ-মেরুনের ছোঁয়া। প্রতিমা মাটির এবং আধুনিক ধাঁচের। কিন্তু সেখানে থাকবে সবুজ, মেরুন রঙের প্রভাব। আর মণ্ডপ? সেইটি ‘সম্পূর্ণ মোহনবাগান’। আসলে শতবর্ষ প্রাচীন ক্লাবের ১০০ বছরের যাত্রার সবটাই মণ্ডপে ধরা থাকবে। ১৯১১ সালের শিল্ডজয় থেকে আধুনিক সময়ের নানা গৌরবময় অধ্যায়ের ধারাকথনের বিন্যাসেই বিন্যস্ত হয়েছে মণ্ডপ। থাকবে একগুচ্ছ মডেল আর ফুটবলের রকমারি বাহার। কেবলমাত্র আলোকসজ্জাতেই মোহনবাগানের ছোঁয়াচ থাকছে না। পুজোউদ্যোক্তা পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, শতবর্ষ প্রাচীন পুজো উদ্যোগ আর শতবর্ষ পার করা ক্লাবের ইতিহাসকে আমরা একসুতোয় গেঁথেছি। সুবিন্যস্ত আলোকসজ্জাও থাকবে।
দুই বাস্তবমুখী থিমকে পেরিয়ে চুঁচুড়ায় এলেই কল্পনার জগৎ বা কাল্পনিক ভয় দর্শককে ঘিরে ধরছে। সঙ্গে আছে ছোটোবেলার স্মৃতিচারণার সুযোগ। কী সেটা? ছোটোবেলার ভয়। পরিবারের বড়োরা ‘জুজু’ দেখাতেন, অন্ধকারে থাকত ভূতের হাতছানি। রাক্ষস, খোক্কস, ব্রেহ্মদত্যি কতই না জ্বালাতন করেছে শৈশবে। আধুনিক আলোকময় পৃথিবীতে শিশুদের সেই ভয়ের জগৎ অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু সেই নিষিদ্ধ পৃথিবীকেই সাকার করে তুলেছে চুঁচুড়ার কালুরায়তলা সর্বজনীন। অ্যাবস্ট্রাক্ট মণ্ডপে অন্তত দেড়শো মডেলে সাজানো হচ্ছে ‘ভয়হীন ভয়ংকর’ দুনিয়া। থাকবে যান্ত্রিক মডেলের কারসাজিও। দশের বেশি অসুরের সমাবেশে দেবী রণরঙ্গিনী হয়ে থাকবেন মণ্ডপে। পুজো উদ্যোক্তা সৌম্যরাজ দাস বলেন, আর থাকবে আলো-আধাঁরির খেলা। সেটাই আলোকসজ্জা।
কোথাও থিমের আড়ালে ভাবনার উসকানি কোথাও বা নিটোল সত্য-শিব-সুন্দর। বহতা গঙ্গা চাক্ষুস করছে বাঙালির মহোৎসবের মহাআয়োজন। আর নাগরিক মহল্লায় চড়ছে কৌতূহলের পারদ। সময় এগিয়ে আসছে। অপেক্ষা শুধু দুয়ার
খুলে দেওয়ার।