


বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: প্রেমের প্রতীক তাজমহলের পাশে ধরা পড়বে জীবনযুদ্ধের প্রবহমান তরঙ্গ। রাজস্থানের রাজকীয় মণ্ডপের পাশে ভগ্ন রাজবাড়ির শেষ দুর্গাপুজো। এমন নানা থিমে জমজমাট বেলঘরিয়ার শারদীয়া উৎসব। প্রতিমাতেও রয়েছে অভিনবত্বের ছোঁয়া। জল যন্ত্রণাকে পিছনে ফেলে রাতদিন কাজ চলছে প্রতিটি পুজো মণ্ডপে। নির্ধারিত দিনে দর্শনার্থীদের সামনে মণ্ডপ তুলে ধরতে চেষ্টার কসুর করছে না কোনও পুজো কমিটি।
বেলঘরিয়ার দেওয়ানপাড়া মাঠে পথের সাথী সর্বজনীন দুর্গোৎসব এবার দ্বিতীয় বছরে পা দিয়েছে। এবার তাদের থিম ‘আলোক তাজ’। প্রেমের প্রতীক তাজমহলকে হুবহু কপি করে তুলে ধরা হয়েছে মণ্ডপে। শিল্পী গোবিন্দ গিরি অদ্ভুত মুন্সিয়ানার ছাপা রেখেছেন। মণ্ডপে ঢোকার মুখে বিশালাকার ফোয়ারা। তার দু’পাশে থাকবে ফুলের সারি। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে উপরে। বিশালাকার তাজমহলের নানা স্থাপত্যকর্ম চোখ ধাঁধিয়ে দেবে দর্শনার্থীদের। মূল মণ্ডপের মধ্যে মাটি থেকে বের হবে বিশালাকার অগ্নি স্ফুলিঙ্গ। আলোর মাধ্যমে তৈরি সেই স্ফুলিঙ্গ জানান দেবে সম্পর্কের অটুট বন্ধনকে। রাতে এই তাজমহলে আলোর কাজ দর্শনার্থীদের বিস্ময় তৈরি করবে। এই আলোক তাজের সামনে রাখা হচ্ছে সেলফি জোনও। তবে এই মণ্ডপে অবশ্য প্রতিমা রাখা হচ্ছে না। মণ্ডপের সামনে পৃথকভাবে তৈরি করা হচ্ছে একটি দুর্গামঞ্চ। সেখানেই হবে পুজোপাঠ। রাজস্থানী ঘরানার আদলে তৈরি মণ্ডপে মা আসবেন রাজকীয় সাজে। পুজো কমিটির কনভেনার বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, মণ্ডপে এলে বুঝতে পারবেন না আপনি আগ্রায় আছেন, নাকি দেওয়ানপাড়ার মাঠে।
মানসবাগ সর্বজনীন দুর্গোৎসবের এবার ৭৮ বছর। তাদের থিম তরঙ্গ। পরিবেশবান্ধব রং ও সামগ্রী দিয়ে তৈরি হয়েছে মূল মণ্ডপ। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযুদ্ধ প্রতিমুহূর্তে তরঙ্গের উপর নির্ভরশীল। শব্দ, তড়িৎ, আলো, বেতার এমন নানা তরঙ্গ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপের পরতে পরতে। মণ্ডপে ধ্যানস্থ বুদ্ধের শান্তি তরঙ্গের পাশাপাশি বর্ষা হাতে যুদ্ধংদেহী আদিবাসী যুবকের মডেল জানান দিচ্ছে শক্তি তরঙ্গের। মণ্ডপে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অবয়বের উপরে রয়েছে বিশালাকার রেডিও। যা জানান দিচ্ছে বেতার তরঙ্গের। এছাড়া মণ্ডপে নানা তরঙ্গ চাক্ষুষ করবেন দর্শনার্থীরা। এছাড়াও খাদ্য-খাদকের সম্পর্কও দেখা যাবে। পোকা ধরে খেতে উদ্যত হয়েছে ব্যাঙ। পিছনে ওই ব্যাঙকে খেতে উদ্যত সাপ। জীবনের এই সার সত্যকে তুলে ধরা হয়েছে। জীবনের এই উত্থান-পতনও তরঙ্গের মতো। সেখানে ভাসতে ভাসতে আমরা আঁকড়ে ধরি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে। ভগবানের কাছে মানত হিসেবে পাথর বেঁধে ঝোলানোর দৃশ্যও দেখতে পাওয়া যাবে মণ্ডপে। এখানে মা আসছেন সম্পূর্ণ মাটির সাজে। মায়ের উপরে উড়বে কয়েকশো পাখি। চারপাশে থাকবে বহু পাখির বাসা। জীবন তরঙ্গে প্রকৃতির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। পুজোর প্রধান উদ্যোক্তা অভিজিৎ চাকলাদার বলেন, শক্তি তরঙ্গ আর জীবন তরঙ্গ মিলেমিশে একাকার হয়েছে মণ্ডপে। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি মণ্ডপ দর্শনার্থীদের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।
অমৃতনগর সর্বজনীন দুর্গোৎসব এবার ৫৩ বছরে পা দিয়েছে। তাদের থিম অনাদরে রূপকথা। প্রাচীন ভগ্নপ্রায় রাজবাড়ির পাশে উঁকি দেবে বহুতল আবাসন। বন্ধ হতে বসা মাতৃ আরাধনা এবার স্থানীয়দের উদ্যোগে হচ্ছে। অসাধারণ দক্ষতায় তা ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী সৌরভ কর্মকার। মণ্ডপে ঢোকার সময় চোখে পড়বে পাশ্চাত্য ঘরানার প্রাচীন রাজমহল। তবে তা পরিত্যক্ত। সেই রাজবাড়িতে প্রবেশ করলে দেখা যাবে আভিজাত্যের ছাপ। দেওয়াল জুড়ে নামীদামি ছবি। তবে এখন তা পায়রার বাসার রূপ নিয়েছে। পরের অংশে রয়েছে দুর্গা দালান। দালানে মা আসছেন সাবেকি সাজে। চারপাশে বহুতল আবাসন। পুজো কমিটির কর্ণধার গোপাল সাহা বলেন, ঐতিহ্য ভুলে মানুষ সামাজিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের তাগিদে ছুটছে। তাই সংসার ভাঙছে, বড় ও প্রাচীন বাড়ি ভাঙছে, তৈরি হচ্ছে ছোট সংসার, গড়ে উঠছে পায়রার বাসার মতো ফ্ল্যাট। সমাজের নির্মম বাস্তবতাকেই মণ্ডপে তুলে ধরা হয়েছে।