নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: পুজোকে ঘিরে আড়ম্বর একদিন থিম সংস্কৃতিকে পথ দেখিয়েছিল। সময় এগিয়েছে। উন্নত হয়েছে প্রযুক্তি। চন্দননগর-ভদ্রেশ্বরের জগদ্ধাত্রী পুজো প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহণ করেছে। তাতেই তৈরি হয়েছে থিমের আলো এবং তার বিশ্বজোড়া খ্যাতি। সেই প্রযুক্তির বিস্ময়কে ব্যবহার করেই চলতি বছর তৈরি হয়েছে মণ্ডপের থিম। ‘অচলায়াতন’ ভেঙে ‘আবহমান’-এর জয়গান গাইছে ২০২৫ সালের চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী উৎসব।
এআর অর্থাৎ ‘আগমেন্টেড রিয়ালিটি’। কার্টুন বা থ্রি-ডি অ্যানিমেশনে ব্যবহৃত হয় এই বিশেষ প্রযুক্তি। অনেকটা এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তিকে প্রয়োগ করেই তাক লাগানো মণ্ডপ গড়েছে চন্দননগরের লালবাগান পাদ্রীপাড়া। থিমের নাম, অচলায়তন। আসলে সমাজজীবনে বহু যুগ ধরে চলে আসা কুসংস্কার, তারই অনবদ্য আখ্যান ওই মণ্ডপ। আর তাতেই প্রয়োগ করা হয়েছে অচল থেকে সচলের ধারাভাষ্য। মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে নানা কুসংস্কারের স্থিরচিত্র। কিন্তু কোনও দর্শক মোবাইল ক্যামেরা তাক করে সেই সব ছবি তুলতে চাইলেই তা চলচ্চিত্র বা রিলসের মতো হয়ে উঠছে। একদিকে সুসজ্জিত সাবেক ধাঁচার প্রতিমা, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তির সুচারু প্রয়োগ, মণ্ডপ হয়ে উঠেছে এক নতুন বিস্ময়। মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে বইয়ের আদল। মাথার উপরে রাখা হয়েছে অনন্ত বিশ্ব। পাথর চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে বইগুলি। পুজোর উদ্যোক্তা অরিন্দম দে বলেন, জ্ঞানকে পাথর চাপা দিয়ে রেখেই অজ্ঞানের জগতে বিচরণ করছি আমরা। জ্ঞানের অনন্ত বিশ্বে উন্নীত হতে হবে। তাই কুসংস্কারের অচলায়তন ভাঙতে হবে। সমস্ত ক্ষেত্রেই সেই বিবৃতি দিয়ে মণ্ডপসজ্জা করা হয়েছে। সঙ্গে সর্বত্র থাকছে চন্দননগরের আলোর বাহার।
অচলায়তনের বিশ্ব যদি বিস্ময় জাগায়, তবে কপালিপাড়া সাহেববাগানের পুজোয় থাকছে ‘আবহমান’-এর ইতিহাস। একদা রাজা, জমিদারদের পুজো পরবর্তী সময়ে জনতার দরবারে নেমে এসেছে। পুজো হয়েছে সর্বজনীন। সেই ইতিহাসের স্মরণেই এক প্রাচীন রাজবাড়িতে দেবী আরাধনার আয়োজন করেছেন উদ্যোক্তারা। জং ধরা সিংহদুয়ার, ক্ষয়াটে রাজকীয় দেওয়ালের আড়ালে অবশ্য রাখা হচ্ছে আধুনিক আলো। পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা চন্দন সরকার বলেন, বিস্মৃতির বা ইতিহাসের গায়ে আধুনিক মননের আলো ফেলার নামই আবহমান। প্রাচীন রাজবাড়ির আধুনিক আলো, সেই স্মৃতিচারণারই ইঙ্গিতবাহী। পৌরাণিক এক ধাঁচা থেকে আধুনিক সময়ের জগদ্ধাত্রী পুজোর পথ তৈরি হয়েছে। মণ্ডপে তাই দেবী দুর্গার অবয়বের মধ্যে দিয়ে জগদ্ধাত্রী দর্শনের বিমূর্তভাব তৈরি করা হয়েছে। রাজবাড়িতে আছে সরোবর। সেখানে আলোকময় ঝর্ণাধারা। নানা সাজের ও থিমের আলোর সাজ। সব মিলিয়ে এক মোহন বিন্যাস। তাতে বাড়তি মাত্রা জুড়েছে দেবীর সাজ। মহিষাসুর হন্তারক দুর্গাই সাজের আদলে আড়েবহরে জড়িয়ে আছেন জগৎ-ধাত্রীকে। এভাবেই পুরাণ থেকে প্রযুক্তি, অচলায়তন থেকে গড়িয়ে আবহমানের পথে চমকের পসরা সাজিয়েছে চন্দননগর-ভদ্রেশ্বর।