Bartaman Logo
৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ছায়া থেকে আলোয়

ফাতিমাতার সংগ্রামে ফুটবলার ডেম্বেলের উত্থান। মা-ছেলের সম্পর্কের গল্প ও বর্তমান সাফল্য নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন।

ছায়া থেকে আলোয়
  • ৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ফ্রান্সের ছোট্ট শহর ভের্নন। শীতের সন্ধ্যায় ছোট্ট ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক আফ্রিকান নারী, ফাতিমাতা। কোলে সন্তান, চোখে দুশ্চিন্তা। চার সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব এখন একা তাঁর কাঁধে। আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ার শিকড় থেকে উঠে আসা ফাতিমাতা ফ্রান্সে এসেছিলেন ভালো জীবনের স্বপ্নে। কিন্তু বাস্তব বড়োই কঠিন। বাড়িতে নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থা। কিন্তু মায়েরা যে হার মানতে জানেন না। কখনো কারও বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করেছেন, কখনো অফিসে ক্লিনার অথবা কারখানায় মজুরি করেছেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি ফাতিমাতা। তাঁর বড়ো ছেলে ওসুমানে। বয়স মাত্র সাত। ছেলের একটাই স্বপ্ন— ফুটবল। মা-ও ঠাওর করেছেন, ছেলের প্রতিভা আছে। কিন্তু জুতোর দাম, কোচিংয়ের ফিজ মেটাবেন কীভাবে?

Advertisement

কিন্তু ওই যে মায়েরা হারতে জানেন না, ফাতিমাতাও তাই ছেলের প্রতিভার উপর ভরসা করে চেনা পরিবেশ, ভের্নন ছেড়ে পাড়ি জমান রেন শহরে। সেখানে ওসুমানেকে এক কোচিং সেন্টারে ভরতি করেন। প্রতিদিন নিজে সঙ্গে করে ছেলেকে প্র্যাকটিসে নিয়ে যেতেন। পাশাপাশি এই রেন শহরেই থাকতেন ওসুমানের মামা বাদু সাম্বাগু। যিনি এক পেশাদার ফুটবলার। মালির জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্বও করেছিলেন। ফাতিমাতার অনুরোধে বাদুই হয়ে ওঠেন ছেলের কোচ তথা মেন্টর। আর মামার থেকে তালিম পেয়ে সেই ছেলে রকেট গতির উত্থানে এখন বিশ্ব কাঁপাচ্ছেন। তিনি আর কেউ নন— ওসুমানে ডেম্বেলে। পিএসজি-কে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানো, নিজে ব্যালন ডি’ওর জয়ী ফরাসি তারকা। চলতি বিশ্বকাপে ফ্রান্সের আক্রমণের অন্যতম অস্ত্রও। হ্যাটট্রিক সহ মোট চার গোল করে গোল্ডেন বুটের জন্য লড়ছেন।
ডেম্বেলে আজ যত বড়োই স্টার হোন, তাঁর উত্থানে মায়ের অবদান অনস্বীকার্য। লোকের বাড়ির কাজ, দিন মজুরি করে আসার পরও ফাতিমাতা ছেলের এজেন্টের দায়িত্বও সামলেছেন, চুক্তি নিয়ে দর কষাকষি করেছেন। তাই তো গত বছর ব্যালন ডি’ওর মঞ্চে মায়ের অবদানের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ডেম্বেলে। সঞ্চালক তখন ফাতিমাতাকে মঞ্চে ডেকে নেন।  ব্যালন ডি’ওরের দিকে মা অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর, পরম মমতায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন ছেলেকে। ডেম্বেলে যখনই বড়ো কোনো পুরস্কার নিতে মঞ্চে উঠেন, সবার আগে মায়ের কথা বলেন। আর দর্শকাসনে বসে থাকা ফাতিমাতা, তখন আনন্দাশ্রুতে ভাসেন। ভের্নন থেকে রেনের সেই সংগ্রাম— সব যেন সার্থক। আর এখন ফাতিমাতার চোখে একটাই স্বপ্ন— ডেম্বেলে আরও রেকর্ড করুন। ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিন। 
ওসুমানের কেরিয়ারের উত্থান হয়েছিল বিদ্যুৎগতিতে। খুব ছোটোবেলাতেই মা ছেলের কানে সংগ্রামী মন্ত্র দিয়েছিলেন। তাই ডেম্বেলেও হার মানতে শেখেননি। রেনের যুব দলে নাম লেখানোর পর অল্প সময়েই প্রতিভাগুণে প্রচারের আলোয় আসেন তিনি। ২০১৪- ২০১৫ মরশুমে সিনিয়র দলে অভিষেক। আর প্রথম বছরই লিগ ১-এর সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার। তাঁর গতি, ড্রিবলিং আর গোল করার সহজাত ক্ষমতা নজর কাড়ে গোটা ইউরোপের। ২০১৬ সালে জার্মানির বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে পাড়ি জমান, আর সেখানেও প্রথম মরশুমেই বাজিমাত।  ডিএফবি-পোকাল ট্রফি জেতেন, ফাইনালে গোলও করেন। তারপর আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ২০১৭ সালে বার্সেলোনা তাঁকে কেনে ১০৫ মিলিয়ন ইউরোতে — সেই সময়ের অন্যতম ব্যয়বহুল ট্রান্সফার। বার্সার কাছে এমবাপেকে নেওয়ারও সুযোগ ছিল। তবে তারা ডেম্বেলেকেই পছন্দ করে। নেইমারের ছেড়ে যাওয়া জায়গা পূরণ করতে যে তরুণকে আনা হল, তাঁর কাঁধে তখন গোটা বিশ্বের প্রত্যাশার ভার। কিন্তু ঠিক তখনই শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর থেকেই একের পর এক চোটে জর্জরিত ডেম্বেলে। তিনি টিমের থেকে হাসপাতালে বেশি সময় কাটাতেন। হ্যামস্ট্রিং, পেশি, লিগামেন্ট— শরীরের বিভিন্ন অংশে বারবার চোট। মিডিয়াতেও তাঁকে নিয়ে কটাক্ষের শেষ ছিল না। একজন তরুণ ফুটবলারের জন্য এই মানসিক চাপ, এই একাকিত্ব সামলানো সহজ ছিল না। বহু সমর্থক আর বিশেষজ্ঞ তখন ধরেই নিয়েছিলেন, ডেম্বেলে হয়তো আর কখনো নিজের সেই পুরানো ফর্মে ফিরতে পারবেন না। কিন্তু যে ছেলেকে দারিদ্র্য হারাতে পারেনি, তাঁকে চোট কীভাবে দুর্বল করবে! অন্ধকার কাটিয়ে ২০২৩ সালে ডেম্বেলের কেরিয়ারে নতুন মোড় আসে। বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজি’তে যোগ দেন তিনি। শুরুর দিকে ফরাসি ক্লাবটিতে কিলিয়ান এমবাপের ছায়াতেই ছিলেন তিনি। পার্শ্বচরিত্র। কিন্তু এমবাপে ক্লাব ছাড়ার পর তিনিই হয়ে ওঠেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। কোচ লুইস এনরিকে পিএসজিতে আসার পর চেনা ছন্দে দেখা যেতে থাকে ডেম্বেলেকে। আর ২০২৪-’২৫ মরশুমে ডেম্বেলেই পিএসজিকে এনে দেন ঐতিহাসিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। যে ট্রফি মেসি-নেইমার-এমবাপেও ফরাসি ক্লাবটিকে দিতে পারেননি। সেই অধরা মাধুরী লাভ করালেন ডেম্বেলে অ্যান্ড কোং। রিং মাস্টার অবশ্যই এনরিকে। আর সেই সুবাদে ডেম্বেলে জেতেন ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’ওর। সেখানেই শেষ নয়। পরের মরশুমেও পিএসজিকে চ্যাম্পিয়ন লিগ জেতান ওসুমানে। তাই আরও একবার ব্যালন ডি’ওর জেতার অন্যতম দাবিদার তিনি।
ক্লাব ফুটবলে যতই উজ্জ্বল হোন না কেন, ফ্রান্সের জাতীয় দলে ডেম্বেলে বহুদিন ধরেই ছিলেন এক ধাঁধার নাম। প্রায় এক দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে কোনো বড়ো টুর্নামেন্টে সেভাবে ছাপ রাখতে পারেননি। এমবাপের ছায়ায় থেকে যেতেন ম্লান, সমালোচনার মুখে পড়তেন বারবার। ২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুতেও একই চিত্র —চাপ আর প্রত্যাশা। নীরবে তা সহ্য করার লড়াই। মেগা আসর শুরুর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ দিদিয়ের দেশঁর ব্রিগেডের অনুশীলনে দেখতে এসেছিলেন। সেখানেও কেন্দ্রীয় চরিত্র এমবাপে। তাঁকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলছেন প্রেসিডেন্ট। ডেম্বেলে তখন পিছনের সারিতে হতাশ চোখে তাকিয়ে। কিন্তু, ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান যে ডেম্বেলের রক্তে। তাই জাত চেনাতে বিলম্ব হল না। বোস্টনের সেই ম্যাজিক্যাল সন্ধ্যা। নরওয়ের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ডেম্বেলে গড়েন এক অবিশ্বাস্য কীর্তি— মাত্র ৩২ মিনিটের মধ্যে হ্যাটট্রিক, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুত হ্যাটট্রিক। জাস্ট ফতেঁ আর এমবাপের পর তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা তৃতীয় ফরাসি খেলোয়াড়। 
ওসুমানে ডেম্বেলে আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা। তাঁর গল্প শুধু একজন ফুটবলারের সাফল্যের গল্প নয়। একজন সংগ্রামী মায়ের ত্যাগের গল্প, একটি শিশুর দারিদ্র্যের মধ্যেও স্বপ্ন দেখার সাহসের গল্প, আর বারবার ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। চোট-আঘাত তাঁকে থামাতে পারেনি, সমালোচনা তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি, এমনকি বিশ্বের অন্যতম বড়ো তারকার ছায়াও তাঁকে চিরকাল ঢেকে রাখতে পারেনি। 
যে ছেলেটি একদিন জুতো কেনার টাকার অভাবে অনুশীলনে যেতে পারতেন না, আজ তিনি বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের মধ্যে একজন, ব্যালন ডি’ওর জয়ী, বিশ্বকাপ মঞ্চে নায়ক। আগামী প্রজন্মের জন্য ডেম্বেলের জীবন বার্তা বহন করে— পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, ধৈর্য আর অধ্যবসায় শেষ পর্যন্ত সঠিক পথ দেখায়। কষ্ট আর সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই তৈরি হয় প্রকৃত চ্যাম্পিয়ন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ