Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নিরুপমা থেকে নিকি, পণের বলির শেষ কোথায়

পাঁচ ছেলের পর যখন এক কন্যা জন্মিল তখন বাপমায়ে অনেক আদর করিয়া তাহার নাম রাখিল নিরুপমা। ১৮৯১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প দেনাপাওনা।

নিরুপমা থেকে নিকি, পণের বলির শেষ কোথায়
  • ১১ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পাঁচ ছেলের পর যখন এক কন্যা জন্মিল তখন বাপমায়ে অনেক আদর করিয়া তাহার নাম রাখিল নিরুপমা। ১৮৯১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প দেনাপাওনা। সেই গল্পে লেখক দেখিয়েছিলেন, বরপক্ষের ১০ হাজার টাকা পণ আর বহুল দানসামগ্রী দিতে গিয়ে কীভাবে নাজেহাল হয়েছিলেন নিরুপমার বাবা রামসুন্দর মিত্র। যৌতুকের দাবি মেটাতে না পারায় শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন শেষ করেছিলেন রামসুন্দরের আদরের কন্যা। গল্পের শেষটা ছিল, প্রবাসে থাকা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছেলেকে তাঁর মা লিখছেন, বাবা তোমার জন্য আর একটি মেয়ের সম্বন্ধ করিয়াছি। অতএব অবিলম্বে ছুটি লইয়া এখানে আসিবে। এবার বিশ হাজার টাকা পণ এবং হাতে হাতে আদায়।

Advertisement

নিরুপমার হৃদয়বিদারক কাহিনির পর প্রায় দেড়শো বছর অতিক্রান্ত। পরিস্থিতি এতটুকু বদলায়নি। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর রিপোর্ট বলছে, প্রতিদিন পণের বলি হন অন্তত ২০ জন মহিলা। সম্প্রতি জাতীয় সংবাদের শিরোনামে উঠে আসা নিকি ভাট্টি তাঁদেরই একজন। পণ যে নিকির পরিবার দেয়নি এমনটা মোটেও নয়। কিন্তু খাঁই মেটেনি ছেলের পরিবারের। পণ দেওয়া ও নেওয়া দু’টোই অপরাধ। সরকারি নিয়ম অন্তত তাই বলছে। কিন্তু সরকারি নিয়ম আর বাস্তবের যে বিপুল ফারাক। যেমন নিকির পরিবারের কথাই ধরুন। পণ দেওয়া তারা মোটেও অপরাধ বলে মনে করে না, নেওয়াটাও। মহিলা সমাজকর্মী যোগিতা ভাবনা সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে তাঁর একটি অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। তিনি একটি আলোচনার প্যানেলে ছিলেন। সেখানে ছিলেন নিকির বাবাও। তিনি অম্লান বদনে বলে যাচ্ছিলেন, জামাইকে পণ হিসেবে তিনি একটি টপ মডেলের এসইউভি দিয়েছেন। মেয়ে মারা গিয়েছে, এতে তিনি শোক পেয়েছেন নিশ্চয়। কিন্তু তাঁর কথায় বারবার আসছিল ওই এসইউভি দেওয়ার প্রসঙ্গটিই।
পণপ্রথাকে বেআইনি ঘোষণা করে আইন তৈরি হয়েছিল সেই ১৯৬১ সালে। ‘যৌতুক’ নামের সামাজিক অভিশাপ থেকে মহিলাদের বাঁচাতেই এই আইন পাশ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, যৌতুক কাকে বলে? সেটাও ওই আইনে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ধরুন আপনার বন্ধু বা কোনও আত্মীয়ের বিয়েতে হাজির হলেন। উপহার হিসেবে আপনি কিছু নিয়ে গিয়েছেন। সেটা যাই হোক, তাকে কিন্ত যৌতুক বলা হবে না। এটা একান্তই উপহার। তাহলে যৌতুক কাকে বলে? আইনে বলছে, যৌতুক বলতে এমন সম্পত্তি বা মূল্যবান নিরাপত্তা বোঝানো হয়, যা বিয়েতে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দেয়। অথবা বাবা-মা বা অন্য কোনও ব্যক্তি বিয়ের আগে, চলাকালীন বা পরে দেয় কিংবা দেবে এমন প্রত্যাশা করা হয়। আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যৌতুক দেওয়া বা নেওয়া তো বটেই, এমনকী তা দাবি করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং এর জন্য কারাদণ্ড ও জরিমানা বা দুই-ই হতে পারে। কিন্তু আইনের এত বছর পরেও সেই সমস্যা কি আদৌ মিটেছে? মোটেও নয়। গ্রাম-গঞ্জে তো বটেই এমনকী শিক্ষিত সমাজেও এই অভিশাপ দিব্যি চলছে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর যে তথ্য সামনে আসছে, তা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। ২০২২ সালে পণপ্রথার বলি হয়েছেন ৬ হাজার ৫১৬ জন। ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৪৫ জন। একথা ঠিকই বিগত দু’বছরে সংখ্যাটি কমেছে। কিন্তু এখনও সেই সংখ্যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। প্রতি লক্ষ মানুষে পণের বলির হার ধরলে দেখা যাচ্ছে দেশের মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করেছে যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশ (১.৯)। দ্বিতীয় স্থানে নীতীশ কুমারের বিহার (১.৮)। তৃতীয় স্থানে বিজেপি শাসিত হরিয়ানা (১.৭)। আমাদের রাজ্যের স্থান মাঝারি (০.৮)। তুলনামূলক ভালো স্থানে রয়েছে 
দক্ষিণের রাজ্যগুলি। যেমন কেরল ও তামিলনাড়ু (০.১), অন্ধ্রপ্রদেশ (০.৪), কর্ণাটক (০.৫)। উত্তর-পূর্বের মেঘালয়ও ভালো অবস্থানে (০.১)। উত্তরপ্রদেশ, 
বিহার, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, রাজস্থান ও হরিয়ানা মিলিয়ে পণের বলি ৮০ শতাংশ। ধর্ষণে বা গণধর্ষণ ও তার জেরে মৃত্যুর সংখ্যা সেখানে ২০২২ সালে মোটামুটি ২৫০। অর্থাৎ, ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার চেয়েও দেশে নির্যাতনের মহামারী এই পণপ্রথা।
কিন্তু এনসিআরবি’র এই তথ্য দেখলেও ভারতের সমাজ ব্যবস্থায় নারী হত্যার বীজ কতটা গভীরে রয়েছে, তা বোঝা যাবে না। এই তথ্যকে হিমশৈলের ভাসমান অংশ বলা যেতে পারে। বিয়ের পর মহিলাদের উপর নির্যাতনের তথ্য যদি নাড়াচাড়া করা যায়, তাহলে চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। এনসিআরবি’র তথ্যই বলছে, স্রেফ ২০২২ সালে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮-এ ধারায় ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৫৯৩টি কেস হয়েছে। ২০২০ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ১ লক্ষ ১২ হাজার ২৯২। পণপ্রথায় মৃত্যু আর নির্যাতনের এই সংখ্যা যদি একত্রে ধরা যায়, তবে তা সত্যিই চিন্তার। এত প্রচার, আইন, উন্নয়নের বুলি আউড়েও সামাজিক অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া যাচ্ছে না। বরং বলা যায়, দিন দিন তা আরও গভীর হচ্ছে। দু’একদিন কোনও বড় ঘটনায় মিডিয়ায় হইচই হয়। তারপর সব চুপচাপ। 
নিকি ভাট্টির ঘটনার পরদিনই শোনা গিয়েছিল আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনা। যোধপুরে তিন বছরের শিশুকন্যাকে গায়ে আগুন দিয়েছিলেন স্কুলশিক্ষিকা সঞ্জু বিষ্ণোই। ঘটনায় শিশুটি সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। সঞ্জুর মৃত্যু হয় পরদিন হাসপাতালে। এই দু’টি উদাহরণই কিন্তু যথেষ্ট রোজগেরে মহিলার ঘটনা। এমন নয় যে আর্থিকভাবে দুর্বল কোনও মহিলার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাই প্রমাণ করে, মহিলারা যতই রোজগেরে হোন, আসলে অনেকে নিজেদের মনে করেন ডিপেন্ডডেন্ট। পুরুষ ইগোকে সামাল দিতে তাই প্রয়োজন যৌতুকের। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এই যে যৌতুক দেওয়া বা নেওয়া হচ্ছে, সেটাকেও অধিকাংশ পরিবার অন্যায় বলে মনেও করে না। সেটা কনেপক্ষই হোক বা পাত্রপক্ষ। বেশিরভাগ সময়ই দেখবেন যৌতুক দেওয়ার সময় বলা হয়, এটা কোনও যৌতুক নয়। মেয়েকে বিদায় দেওয়া হচ্ছে, তাই উপহার হিসেবেই ওইসব সামগ্রী দেওয়া হচ্ছে। এই দেওয়া নেওয়াটা আইন মোতাবেক যতই অন্যায় হোক, পাত্র-পাত্রীর পরিবার তা মানতে নারাজ। এই উপহারই কিন্তু কখনও-বা অন্যপক্ষের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। আর সেই চাহিদা-জোগানের ভারসাম্য না এলেই সমস্যা। কখনও অত্যাচার। আর তা সীমা ছাড়িয়ে গেলে বধূর মৃত্যু। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া ও ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক সম্প্রতি একটি তথ্য প্রকাশ করেছেন। সেখানে দেখা গিয়েছে, ১৯৩০ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে ভারতে ৭৪ হাজারের কিছু বেশি বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই যৌতুক দেওয়া হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এর অধিকাংশই পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে দেওয়া। বধূ মৃত্যুর ঘটনায়, বাবা মা শোকাতুর হন ঠিকই, কিন্তু তাঁরাও এর দায় পুরোপুরি এড়াতে পারবেন না। একদিনেই এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে এমনটা সাধারণত হওয়ার কথা নয়। কোনও বাড়িতে যৌতুক নিয়ে যখন বধূর উপর অত্যাচার শুরু হয়, তখন সেই মহিলা বাপের বাড়িতে জানান না, এটা বাস্তবসম্মত নয়। সেক্ষেত্রে বাবা-মায়ের দায়িত্ব থেকেই যায়। বেশিরভাগ সময়ই বাবা-মা সামাজিক লজ্জার ভয়ে মেয়েকে কম্প্রোমাইজ করতে পারমর্শ দেন। সেই আপস করতে করতে কখন যে মেয়ে নিজেকে শেষ করে দেন, তা বোঝার প্রয়োজনও পড়ে না কিছু বাবা-মায়ের। চরম ঘটনার পর তাই আর কান্নাকাটি করে লাভ হয় না। শুধু তাই নয়, মেয়েদের অনেকেও পণের পক্ষে থাকেন। যেমন নিকির কথাই ধরুন। তিনি নিজে পণের বলি হয়েছেন। কিন্তু তাঁর পরিবারে যখন পণ নিয়ে অশান্তি হয়, বউদিকে নির্যাতন করা হয়, তখন ভাইয়ের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন নিকি। আর এই অভিযোগ করেছিলেন নিকির বউদি নিজেই। 
যে বিষয়টিকে আইন করে শাস্তিযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে, এখন সেটিই হচ্ছে খুল্লাম-খুল্লা। আগে দেখা যেত যৌতুক বা পণ দেওয়া-নেওয়ার বিষয়টি পরিবারগুলি নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখত। এখন তো আবার ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকের যুগ। তাই বহু পরিবারকেই দেখা যায়, পণের বিষয়টি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে। গলা উঁচিয়ে কত পণ দিলাম সেটা ঘোষণা করে পরিবারের স্ট্যাটাসের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে এই সংস্কৃতি উত্তর ভারতের। সম্প্রতি ইনস্টায় একটি রিল দেখছিলাম গুজ্জর সম্প্রদায়ের। এই সম্প্রদায়েরই মেয়ে নিকি। সেখানে দিল্লির একটি বিয়ের অনুষ্ঠানকে দেখানো হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বড় শামিয়ানা খাটানো আছে। অনেক অতিথি বসে আছেন। সেখানেই কনের দাদা বেশ গর্বের সঙ্গে বলছেন, বোন ও তাঁর নতুন পরিবারকে সুন্দর একটি গাড়ি, ৩০ তোলা সোনা, ফার্নিচার ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়েছেন। দহেজ বা যৌতুক এই পরিবারের কাছে কোনও অপরাধ নয়। তাদের কাছে এটা রেওয়াজ। 
এটা শুধু একটা ঘটনা নয়। সমাজমাধ্যমে চাইলে আপনি আরও অনেক রিল দেখতে পাবেন। এবং এই রিল দেখে সবাই যে নিন্দা করছেন এমনটাও নয়। বরং কেউ কেউ সেটাকে প্রশংসাই করছেন। একজনের সরস মন্তব্য, ব্যাস, অ্যায়সা শ্বশুর মিল যায়ে। লাইফ সেট হ্যায়। রিলগুলিতে হাজারখানেক লাইক পড়েছে। গুজ্জর সম্প্রদায়ের কেউ কেউ বলছেন, এই রীতি পাল্টানোর একটা চেষ্টা হয়েছিল। পঞ্চায়েতও হয়। সেখানে এসব বন্ধের সিদ্ধান্তও হয়। কিন্তু পঞ্চায়েতের মাথারাই নিজেদের সময় পণ নেন ও দেন। পণের সংস্কৃতিকে অনায়াসে পরিবারের মান-সম্মানের আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। মজার কথা হল, কে কত ওজনদার, সেটা বোঝানোর জন্য কনের পরিবার যৌতুকের বিষয়টি সমাজমাধ্যমে তুলে ধরছে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ