অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: বৃহত্তর হুগলির প্রেক্ষিতে শ্রীরামপুর বরাবরই পৃথক পরিচয়ের দাবি রাখে। পুজো মরশুম এলে সাবেক ডেনিস কলোনির আনাচ কানাচে পরিচয়ের দাবি যেন জোরাল হয়ে ওঠে। থিমময় শ্রীরামপুরের পুজো। কিন্তু থিমের রকমফেরের মধ্যেও পৃথক কিছু সংযোজনের বাসনা গঙ্গাপাড়ের নগরীর বাতাসে ভেসে নিশির ডাক ডাকে। আর তাতেই পরিচিত গানের সুরের আচমকা অপরিচিত মোচড়ের খোঁজ মেলে শ্রীরামপুরে। এবারও রেঁনেশাসের শহর, অক্ষরনগরী অভিধায় ভূষিত শ্রীরামপুরের আনাচকানাচে একাধিক পুজোর সমাহার। সর্বত্রই প্রতিযোগিতার তীব্র আবহ। সেই টানটান উত্তেজনার ফলাফলের আঁচ পোহাতে সমান্তরাল তৎপরতা নগরবাসীর মধ্যেও। এসবেরই সাক্ষী আপাতত নিস্তরঙ্গ হয়ে বয়ে চলা পুণ্যতোয়া গঙ্গাও।
চেনা ছকেও অচেনা হয়ে ওঠার বাসনা থেকেই ‘অঘোরী’ থিম নিয়ে পুজো মাতানোর আয়োজন করেছে দিলীপ স্মৃতি সঙ্ঘ। শ্রীরামপুর স্টেশন থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বের ওই ক্লাবে এখন দুর্গম পাহাড় নির্মাণের প্রয়াস চলছে। যেখানে গিরিকন্দরে আবিভূর্তা হবেন দেবী দশভুজা। কিন্তু তার আবাহন করবেন অঘোরী সন্ন্যাসীরা। আপাতত চেনা ছক, থিমের থমথমে গুরুপাক। কিন্তু সাবেক ডেনিস কলোনির পুজো উদ্যোক্তারা ওই আয়োজনের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছেন অঘোরী নৃত্য। প্রতিদিন মণ্ডপে একাধিকবার সেই নৃত্যের লাইভ শো হবে। আর সেটাই এই পুজোর উদ্যোগকে পৃথক করছে। দেবীকে এখানে পাহাড়ের গুহায় পাথর কুঁদে নির্মাণ করার ভঙ্গিমায় হাজির করা হচ্ছে। যদিও প্রতিমা মাটির। অঘোরী আছে মানে শিবও থাকবে। তাই মণ্ডপজুড়ে শিবের নানা মোটিভ দেখতে পাওয়া যাবে। থিমের সঙ্গে মানানসই অলোকসজ্জা। পুজো উদ্যোক্তা দীপক পাত্র বলেন, থিমের পুজোই এখনকার চালু ধারা। কিন্তু সেখানে আমরা না থেমে বিষয়টিকে আরও একটু এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছি। তাই অঘোরী নৃত্যকলা লাইভ শো করা হবে।
অঘোরী নৃত্যের ঘোর কাটলে একটি শান্ত সমাহিত পুজো মণ্ডপের দিকে যেতে চাইতে পারেন দর্শকরা। সেই শান্তিক্ষেত্রের আসন পেতে বসছে শ্রীরামপুরের ডাঃ চ্যাটার্জি লেনের সাগ্নিক ক্লাব। তাদের এবারের আয়োজন, অধিষ্ঠান। অধিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন আসন। সাবেক জমানার আসন ও সমান্তরাল সূচিশিল্পকে ঘিরেই মণ্ডপসজ্জা এবং মণ্ডপ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। গোটা মণ্ডপের বিমূর্ত কাঠামোটাই আসন দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। সঙ্গে থাকবে আলোর চোখধাঁধানো সজ্জা। মণ্ডপের অন্দরসজ্জায় ব্যবহার করা হবে অসংখ্য পটচিত্র। মূলত, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরকে নিয়ে আঁকা সেই সব পট সাবেক ঘরানার আদলে তৈরি করা হচ্ছে। পুজো উদ্যোক্তাদের দাবি, উমা যেমন দেবী তেমনই ঘরের মেয়ে। অতীতে ঘরের মেয়েরাই বসার আসন পেতে দিতেন, অতিথি সেবা করতেন। আবার ঠাকুরদালানে দেবীর আসন পাততেন। পুজো উদ্যোক্তা বিভাস হালদার বলেন, নারী ও দেবী, দু’য়ের ভাবসমাবেশ করেছি আমরা। গোটা মণ্ডপের সিলিংজুড়ে দেবীর আগমন সংকেত, পদচিহ্ন।
পদচিহ্নই চাইছেন সমস্ত উদ্যোক্তা, নাগরিক পদচিহ্ন। তাই চমকের পর চমকের পসরার সেজে উঠছে শ্রীরামপুরের সাবেক নগর কাঠামো। মুগ্ধতার পরশ আনতে সেই নান্দনিক প্রয়াসে এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতা।