ছিলেন অন্য পেশায়। জীবন এনে দাঁড় করিয়েছে আর এক অচেনা চ্যালেঞ্জের সামনে। সাফল্য এসেছে সেখানেও। এই পর্বে অক্ষয় কুমার।
পড়াশোনায় মোটেই মন ছিল না। দিনরাত খালি খেলাধুলো আর মার্শাল আর্ট নিয়েই মেতে থাকত ছেলেটি। সেন্ট্রাল বোম্বের কোলিওয়াড়াতে বাড়ি। পুরানো দিল্লির চাঁদনি চকে জন্ম ছেলেটির। বাবা আর্মির চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ইউনিসেফের অ্যাকাউন্ট্যান্টের চাকরি নিয়ে চলে এসেছিলেন বোম্বেতে। তখন সে নিতান্তই বালক। কাজেই তার বেড়ে ওঠা বোম্বেতেই। মাতুঙ্গার ডন বস্কো স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন বাবা। স্কুলের শিক্ষা সম্পূর্ণ করে মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গুরু নানক খালসা কলেজ অব আর্টস, কমার্স অ্যান্ড সায়েন্সে ভর্তিও হয়েছিল। কিন্তু সেখানে ভর্তি হওয়াই সার। বয়স যত বাড়ে ততই তার পড়াশোনা থেকে মন সরে যায়। মনে একটা প্রচ্ছন্ন ইচ্ছা ছিল অভিনেতা হওয়ার। পাশাপাশি চলছিল মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ। জীবনে তার দুটোই মন্ত্র, মার্শাল আর্ট ও অভিনয়। শেষকালে পড়া শেষ না করেই কলেজ ছেড়ে দিল সে।
এতটা পড়ে নিশ্চয়ই আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগছে, কে এই গুণধর ছেলে। হ্যাঁ, গুণধরই বটে। নিজের গুণেই সম্পূর্ণ অপরিচিত এক জগতে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব যে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাকে তো গুণধর বলতেই হবে। ছেলেটির নাম, রাজীব হরি ওম ভাটিয়া। বাবার নাম, হরি ওম ভাটিয়া, মা অরুণা ভাটিয়া। আদতে হরি ওম অমৃতসরের বাসিন্দা। হিন্দু পাঞ্জাবি। আর অরুণার বাড়ি কাশ্মীরে। হরি ওম আর অরুণার একটি মেয়েও আছে তার নাম অলকা। সে রাজীবের থেকে ছোটো।
রাজীব বোম্বেতে তাইকোনডু শিখত। তাতে ব্ল্যাক বেল্টও পেয়েছিল। এরপরেই মার্শাল আর্টের আরও বিভিন্ন ধারায় বিচরণ করার ইচ্ছে হয়। কলেজ ছেড়ে বাবাকে সে বলল, মার্শাল আর্ট শিখতে থাইল্যান্ড যেতে চায়। বাবা-মা আপত্তি করেননি। কলেজের পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই রাজীব পাড়ি দিয়েছিল থাইল্যান্ডে। ব্যাংককে টানা পাঁচ বছর থেকে রপ্ত করে থাই বক্সিং। যা এক ধরনের মার্শাল আর্ট। থাই ভাষায় একে বলে ‘মুয়ে থাই’। যার অর্থ অষ্ট অঙ্গের বিজ্ঞান। পাশাপাশি রাজীব ব্যাংককে আজকের ভাষায় নানা ‘অড জব’ করতে শুরু করে। কখনো রেস্তরাঁর শেফ, কখনো ওয়েটারের কাজ করে নিজের খরচ জোগাড় করত।
পাঁচ বছর পর কাজের খোঁজে রাজীব চলে আসে কলকাতায়। এখানে একটি ট্র্যাভেল এজেন্সিতে কাজ নেয়। সেই কাজ করতে করতে চলে যায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। ঢাকার একটি হোটেলে শেফের কাজ নেয় সে। তবে সে কাজও বেশিদিন করেনি। চলে যায় তার জন্মস্থান পুরানো দিল্লিতে। সেখানে ‘কুন্দন’ বা জাঙ্ক জুয়েলারি বেচতে শুরু করে। তবে তখনও তার মাথা থেকে অভিনয়ের ইচ্ছেটা মরে যায়নি। দিল্লি থেকে ফিরে আসে বোম্বেতে। সেখানে সে মার্শাল আর্টের ট্রেনিং দিতে শুরু করে। একদিন তার এক ছাত্রের বাবা রাজীবকে বিজ্ঞাপনের মডেল হওয়ার প্রস্তাব দেয়। সানন্দে সম্মতি দেয় রাজীব। সে তো অভিনেতা হতেই চেয়েছিল। মডেলিংও অভিনয়ের একটা ধাপ। একটি ফার্নিচার বিক্রেতা সংস্থার বিজ্ঞাপনের মডেল হয় সে। মডেলিং করতে করতেই তার ফোটোগ্রাফার জয়েশ শেঠের সঙ্গে আলাপ হয়। আসলে জয়েশের কাছে সে নিজের পোর্ট ফোলিও বানাতে গিয়েছিল। সেখানে জয়েশের সহকারী হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব পায়। রাজীব প্রায় দেড় বছর জয়েশের সহকারী হিসাবে কাজ করে। একদিকে জয়েশের সহকারী হিসাবে কাজ, পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থায় নিজের ছবি পাঠিয়ে অভিনয়ের ডাক পাওয়ার অপেক্ষা। এই চলতে থাকে দেড় বছর ধরে। কিছু কিছু ছবিতে ডান্সার হিসাবে কাজও পায়। এই সময়ে ১৯৮৭ সালে মহেশ ভাটের ‘আজ’ নামে একটি ছবিতে সে একজন ক্যারাটে ইনস্ট্রাক্টরের চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পায়। সেই ছবিতে কুমার গৌরব অভিনয় করেছিলেন। কুমার গৌরবের চরিত্রটির নাম ছিল অক্ষয়।
এইসব যখন চলছে, তখন একদিন বেঙ্গালুরুতে একটি বিজ্ঞাপনের শ্যুটিং করতে যাওয়ার পথে ফ্লাইট মিস করে রাজীব। মনের দুঃখে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে রাজীব চলে যায় একটি স্টুডিওতে। সেখানে প্রযোজক প্রমোদ চক্রবর্তী ওরফে চাক্কিদা তাঁর নতুন ফিল্মের অডিশন নিচ্ছিলেন। সেখানে অডিশন দিয়ে ছবির নায়কের চরিত্রে অভিনয়ে সুযোগ পেয়ে যান। বিপরীতে কে? না, করিশ্মা কাপুর! একেই বলে কপাল। বিজ্ঞাপনী ছবির শ্যুটিংয়ে যেতে না পারাটাই তার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এল। তবে রাজীব নামটি চলবে না! রাজীবের তখন মনে এল ‘আজ’ ছবিতে কুমার গৌরব অভিনীত ‘অক্ষয়’ চরিত্রটির কথা। নামটি বেশ! তাহলে এই নামটাই সে ছবির হিরো হিসেবে নিতে পারে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। চাক্কিদার ‘দিদার’ ছবিতে নতুন হিরোর নাম হল ‘অক্ষয় কুমার’!
তবে ‘দিদার’ নয়, অক্ষয়ের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির নাম ‘সৌগন্ধ’। যেটিতে তিনি পরে সই করেছিলেন। সেটিই আগে মুক্তি পায়, ১৯৯১ সালে। তার পরের বছরই মুক্তি পায় ‘দিদার’। তবে আব্বাস-মস্তান পরিচালিত ‘খিলাড়ি’ই অক্ষয়কে জনপ্রিয় করে তোলে। সে ছবিটিও মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯২ সালেই।
এইভাবেই হোটেলের শেফ, ট্র্যাভেল এজেন্সির মার্কেটিং এজেন্ট, কুন্দন বিক্রেতা, ক্যারাটে ইন্সট্রাক্টর রাজীব হরি ওম ভাটিয়া হয়ে উঠেছিলেন ফিল্ম স্টার অক্ষয় কুমার।
স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী



