হিমি মিত্র রায়: প্রত্যেকবার আমি কিন্তু সাফারার হব না ঐশানী। তোকেও বুঝতে হবে সমস্যাটা তোরও। একতরফা আমার দিকে এভাবে বন্দুক তাক করলে কিন্তু হবে না।
ওপাশ থেকে ঐশানী কী বলছে শোনা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মোবাইল কানে দিয়ে ঘরের মধ্যে জোরে জোরে পায়চারি করছে দিয়া। পরনে গোলাপি টি শার্ট, সামনে একটা টেডি বেয়ারের ছবি, ওটারই ম্যাচিং শর্টস। দরজার কাছে যে দিয়ার মা প্রত্যুষা দুধের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেটা দেখতেই পায়নি সে। তার মধ্যে আবার বলতে শুরু করল, জাস্ট ডোন্ট স্পিক ননসেন্স, এসব তোর মুখে মানায় না।
বলেই আরও জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করল, চোখ পুরো রেগে লাল। দিয়ার মা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তারপর ঘরে ঢুকে দিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল, কখন ও এদিকে তাকায়। মাকে দেখতে পেয়ে ইশারায় বলল, ও দুধ খাবে না এখন। মা যেন দুধটা নিয়ে চলে যায়।
ব্যস, রাজকুমারী ক্লিওপেট্রা তার অত্যন্ত দামি মতামত দিয়ে ফেলেছেন। তার হুকুম অমান্য করা কী আর সাজে? একবার মূকাভিনয় করে বোঝানোর চেষ্টা করল প্রত্যুষা, যে তোর এই জলবণ্টন চুক্তির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ ছেড়ে দুধটা খেয়ে নে। তারপর যত খুশি ঝগড়া কর। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ওরফে দিয়া ওর মহা গুরুত্বপূর্ণ ফোন ছাড়লই না। তাই প্রত্যুষা ‘পিছে মুর’ হয়ে বেরিয়ে চলে গেল ও ঘর থেকে। আর দোতলায় ওর ঘরে থেকে বেরতেই আওয়াজটা কানে এল আরও জোর। মারাত্মক বৃষ্টি হচ্ছে কিছুক্ষণ ধরে, ছাদের উপর অ্যাসবেসটাসের ছাউনির ওপর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এমনভাবে পড়ছে যেন মনে হচ্ছে ক্লাউড বার্সট হচ্ছে। তবে এই যা রক্ষে, এখন কারেন্ট যায়ই না বলতে গেলে, হঠাৎ কোনো ফল্ট হলে আলাদা কথা।
সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে গেস্ট রুম। কিন্তু ওটা এখন দখল করে বসে আছে বুবলাই। ওর নিজের ঘরটা নাকি ওর এখন ভালো লাগছে না, দম বন্ধ লাগছে। ফলে ঝিটিমিটি নিয়ে এখানে ট্রান্সফার হয়েছে।
ছেলে বড়ো হয়েছে, দরজায় নক করে ঢুকতে হয় এখন। একবার বাঁ হাত দিয়ে নক করল ও। ডান হাতে দুধের গ্লাস সমেত ছোটো ট্রেটা সাবধানে ধরে রাখা। সঙ্গে দুটো চকো চিপস বিস্কুট। প্রথম নকে শুনতে পায়নি মনে হয়। তাই আরও একবার নক করল ও।
—হ্যাঁ, কে?
—ঢুকলাম।
—ও তুমি।
মায়ের দিকে একবার দেখে নিয়ে ল্যাপটপে মন দিল ছেলে। ওদিকে তাকিয়েই বলল— কিছু বলবে? তাড়াতাড়ি বল।
—না... না, মানে তুই আজ দুধটা খাবি বুবলাই? বোন খেলো না। চিনি মেশানো, আবার কী করে রাখব, ভাবলাম তোকে বলে দেখি।
—দুধ! পাগল হলে? আমি কি ওর মতো টিনেজার? খাব না মা, প্লিজ তুমি যাও এখন। ইম্পর্টেন্ট জায়গাটার জাস্ট এন্ডে আছি, একটু ভুল হলেই গেল।
প্রত্যুষা রান্নাঘরে যখন এল ততক্ষণে দুধটা প্রায় ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মুখে। গ্লাসটা রেখে চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ও। দুধের ওপরে মোটা সর পড়ে গেছে। সরটা আলাদা করে বাটিতে তুলে রাখল ও, ঘি বানানোর জন্য। তারপর ভাবল এই চিনি মেশানো দুধটা কী করবে, ও আর নীলাভ দু’জনেই চিনি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, এমনিই। ওই যে প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর, তাই আর কী। তার চেয়ে কাল অঞ্জনাদি কাজ করতে এলে, ওঁকে দিয়ে দেবে, সেটাই ভালো। আগেও এমন হয়েছে যদিও।
এদিকে বৃষ্টির প্রকোপ থামবার কোনো লক্ষণই দেখছে না, আরও মনে হচ্ছে বেড়ে গিয়েছে জলের তোড়। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে মারাত্মক জলের ঝাপটা আসছে। পাল্লাগুলো টেনে বন্ধ করতে বেগ পেতে হচ্ছে। কোনোরকম দরজা দুটো বন্ধ করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল প্রত্যুষা। তারপর বেডরুমের দিকে এগল। আজ নীলাভর ছুটি, তাই সারাদিন বাড়িতেই খেলা দেখে আর ফোন ঘেঁটে বিছানায় গড়িয়ে বাবুর দিন কাটছে।
বেসিনের আয়নায় একবার নিজেকে দেখল প্রত্যুষা। দুই ভ্রুর মাঝখানে খয়েরি টিপটা একটু বেঁকে গিয়েছিল। ওটাকে আঙুল দিয়ে ঠিক জায়গামতো আনল ও। তারপর সবুজের মধ্যে হলুদ বাটিক প্রিন্টের কাফতানের বেল্টটা একটু টাইট করে চুলটা সামনের দিকটা হালকা করে টেনে কানের পাশে গুঁজে দিয়ে গুনগুন করতে করতে বেডরুমে গেল।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখে হালকা করে ফ্যান চলছে। তার মধ্যে নীলাভ বালিশের উপর আরেকটা বালিশ চাপিয়ে বুক পর্যন্ত চাদর টেনে দু’হাত বুকের উপর রেখে আরামে শুয়ে আছে। ওর মুখে মিটিমিটি হাসি। আসলে দু’হাতে ধরা মোবাইলে ও কোনো একটা রিল বা ভিডিও দেখছে। মোবাইল থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসছে। প্রত্যুষা পাশে দাঁড়াল। ওকে একবার দেখে মোবাইলের দিকে নজর দিল নীলাভ।
—কী, সারাদিন এই চলবে? একবার উঠে ছেলেমেয়ের ঘরে গেলেও তো পার, ওরা কী করছে না করছে, কোনো খেয়াল আছে বাবার?
—মা আছে তো, মা একাই একশো।
—কাজ সারার জন্য এসব বলা।
নীলাভর খুব একটা ভ্রূক্ষেপ হল না প্রত্যুষার কথায়। ও নিজের মনে রিল দেখছিল। একটু ভ্রু কুঁচকে কিছু একটা দেখে আবার স্ক্রোল করতে শুরু করে দিল ফোনের স্ক্রিন। প্রত্যুষা দরজা দিয়ে লাগোয়া বারান্দায় দাঁড়াল। জলের ঝাপটা আসছে প্রবল ভাবে। বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না। বারান্দার গাছগুলো ভিজে চুপচুপে হয়ে রয়েছে। জুঁই, গোলাপি জবা, গন্ধরাজ গাছগুলো বৃষ্টির জল পেয়ে যেন আনন্দে আত্মহারা আজ। বৃষ্টির শব্দ আর কানফাটা বাজ পড়ার আওয়াজ কানে আঙুল দিল ও, চোখ বন্ধ করে। কাছে কোথাও একটা পড়ল বোধহয়। কাফতানের পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখল নেটওয়ার্ক চলে গেছে। ঝড়-বৃষ্টিতে হয় এরকম। বলতে বলতেই ঝুপ করে অন্ধকার হয়ে গেল। লোডশেডিং।
নীলাভ ঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠল— কই গেলে? কী হল বল তো?
প্রত্যুষা মোবাইলের ফ্লাশ জ্বালিয়ে ঘরে ঢুকে বলল— কী আবার হবে? লোডশেডিং।
—লোডশেডিং হবে কেন? এখন তো হয় না!
—আশ্চর্য তো! হয় না আবার কী? হতে পারে না এমনটা তো নয়!
—বাড়িতে চার্জার গোছের কিছু আছে?
—দেখছি। বহুদিন তো লাইট যায়নি।
প্রত্যুষা নীচের ক্যাবিনেটগুলো খুলে খুলে দেখছে যদি চার্জার থাকে কোথাও। ততক্ষণে দিয়া আর বুবলাই সিঁড়ির রেলিং হাতড়ে হাতড়ে নেমে এসেছে।
—মা এটা কী হল, কারেন্ট চলে গেল কেন?
প্রত্যুষা চার্জার খুঁজতে খুঁজতে বলল— আমি কি ইলেকট্রিসিটি ডিপার্টমেন্টে চাকরি করি? আমি কী করে বলব?
—কী গো বাবা, দেখ ওয়াইফাই চলছে না, কেমন করে শেষ করব এবার? প্লিজ ডু সামথিং।
বুবলাই বিরক্তি সহকারে বলল।
—আর একটু ওয়েট করে দেখ, ঠিক চলে আসবে, ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে, কোথাও ফল্ট হতে পারে।
—ধ্যার ভালো লাগে না!
বলে মোবাইলটাকে বিছানায় ছুড়ে ধপাশ করে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল দিয়া, বাবার পায়ের কাছে।
বুবলাই বিছানার উলটোদিকে রাখা ছোটো সিঙ্গেল সোফাটায় দু’পা সামনের দিকে ছড়িয়ে পেছনে মাথা এলিয়ে দিল। ঘর পুরো অন্ধকার নয়, প্রত্যুষা আর বুবলাইয়ের মোবাইলের ফ্ল্যাশ রয়েছে। গরমও নেই এখন। উল্টে জানলা দিয়ে ফুরফুর করে সুন্দর হাওয়া আসছে।
—কী গো, পেলে?
—হ্যাঁ মনে হয়।
প্রত্যুষা ক্যাবিনেট থেকে কিছু একটা টেনে বের করেছে। একটা ছোট্ট ল্যাম্প। যার মাথাটা বাঁকানো যায়। ওটাকে নিয়ে ঘটাঘট করে সুইচ টেপার চেষ্টা করে দেখল ও, কিন্তু ব্যাটারি বসে গেছে। এতদিন চালানো হয়নি।
—মা তাড়াতাড়ি জ্বালাও, মোবাইলের চার্জ এক্ষুনি চলে যাবে। ডিজগাস্টিং লাগছে এবার।
—আরে দাঁড়া, এটা জ্বলছে না। মনে হয় ব্যাটারি শেষ। কত দিন জ্বালানো হয়নি।
—মানে? তাহলে এত খোঁজাখুঁজির মানে কী ? বাবা, ব্যাটারি আছে কোথাও?
—নাহ, আমি ওসব জানি না। তোরা জানবি।
দিয়া বাবার কথা শুনে বলল— অনলাইনে আনাচ্ছি তাহলে।
—হ্যাঁ, এই ঝড় বৃষ্টিতে ব্যাটারি আনাবেন মহারানি, ওটাই বাকি আছে। আর মোবাইলে চার্জ আছে কি না আগে দেখ। ওইটুকু রাখ ইমারজেন্সির জন্য। দাঁড়া, আমি একটা জিনিস পেয়েছি।
প্রত্যুষা ক্যাবিনেটের থেকে একটা প্লাস্টিকের মোড়ানো কিছু বের করল। তারপর ওটা নিয়ে এসে কার্পেটের ওপর রেখে নীলাভকে বলল— দেখ উঠে একবার, কী বের করেছি!
নীলাভ উঠে বসে নীচে তাকাল, এক মিনিট তাকিয়ে ঝপ করে নীচে এসে বসে পড়ল। জিনিসটাকে আলতো করে হাতড়ে বলল— তুমি কোথায় পেলে এটা?
—হুহু, আবার কোথায়? রেখে দিয়েছিলাম যত্ন করে, শাশুড়ি মায়ের স্মৃতিচিহ্ন আমি কি ফেলে দিতে পারি?
নীলাভ এবারে ছোট্ট কাচের চিমনিওয়ালা ল্যাম্পটা হাতে তুলে নিল। ভেতর থেকে পোলতের আগুনের শিখায় ওর মুখে এক আশ্চর্য আভা তৈরি করেছে, চোখ দুটো যেন আনন্দ আর উত্তেজনায় তিরতির করে কাঁপছে।
—আরে আরে করছটা কী? কেরোসিন পড়ে অ্যাক্সিডেন্ট হবে তো! শিগগির নীচে রাখ। দেখ, ভাগ্যিস কেরোসিন ভরে রেখেছিলাম। এভাবে কাজে লাগবে বুঝতে পারিনি।
—কী করছ বল তো তোমরা? এটা কেমন ল্যাম্প আবার?
—এখানে এসে বোস, বলছি।
বাবার ডাকে দুই ছেলে-মেয়ে নীচে এল।
—এটার আলোয় তোদের ঠাকুমা সংসারের কত কাজ করত জানিস? আমি আর তোদের কাকু তো এই আলোয় পড়াশোনা করতাম। সে সময় যখন তখন কারেন্ট চলে যেত। কারেন্ট থাকাটাই যেন অবাক করার বিষয়। অনেকের বাড়িতে তো ইলেট্রিসিটিই ছিল না। এই চিমনি ল্যাম্পগুলোই তখন বাঁচিয়ে রেখেছিল আমাদের। আমরা পড়াশোনা করতাম মাটিতে বসে আর তোদের ঠাকুমা পাশে বসে উল বুনত। মাঝে মাঝে আমরা ভুল উচ্চারণে পড়লে শুধরে দিত মা। উল বোনা সত্ত্বেও মায়ের কান এবং চোখ সবসময় আমাদের দিকে থাকত।
—তোমাদের গোটা বাড়িতে একটাই ল্যাম্প ছিল? হাউ ফানি!



