Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বন্ধুত্বের বার্তা

কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! ক্ষমতা থেকে দূরে চলে যাওয়ার ১৫ বছর পরেও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় খাতা খুলতে পারেনি বামেরা। এখনো শূন্যের গেরোয় আটকে আছে তারা।

বন্ধুত্বের বার্তা
  • ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কী অদ্ভুত বৈপরীত্য! ক্ষমতা থেকে দূরে চলে যাওয়ার ১৫ বছর পরেও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় খাতা খুলতে পারেনি বামেরা। এখনো শূন্যের গেরোয় আটকে আছে তারা। অথচ বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনে ২০ বছর পর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফিরে এসেছে বিএনপি। একদা (২০০১-এ) জামাতকে জোটসঙ্গী করে ক্ষমতায় ফিরেছিল বিএনপি। সেবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া। দু’দশক পর গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সেই জামাতই ছিল বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। এবারে প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন খালেদাপুত্র তারেক রহমান। এবারের নির্বাচনে আওয়ামি লিগ ছিল না। তাছাড়া ভোটের মাস দেড়েক আগে প্রয়াত হন খালেদা। পাশাপাশি, গত দেড় বছর ধরে এক চরম অস্থিরতা, অরাজক অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ। ইসলামিক জামাতের জঙ্গি-যোগকেও ভালো চোখে নেয়নি ওপারের মানুষ। সব মিলিয়ে তাই বিএনপি ছিল সেরা ‘বিকল্প’। দেশের শাসনভার তুলে দিতে সেই বিকল্পকেই বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ। তবে আসন সংখ্যার বিচারে বিএনপির ধারেকাছে না থাকলেও এই ভোটে জামাতের উত্থান নজর কেড়েছে। এককভাবে ৬৮টি আসন, প্রায় ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে জামাত বুঝিয়ে দিয়েছে, সরকারপক্ষকে তাদের সমঝে চলতে হবে। এই জেতা-হারার হিসেবের বাইরে আসল কথাটা হল, এই ভোটে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হল। গণতন্ত্রের জয় হল। 

Advertisement

দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফেরার মাস খানেকের মধ্যে মসনদের শীর্ষে আরোহণ স্বপ্নের মতো মনে হবে। এলাম, দেখলাম, জয় করলাম-এর মতো। কিন্তু ভাবী প্রধানমন্ত্রী তারেকের কাজটা মোটেই সহজ নয়। তিনি ভালোই জানেন, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যে যে অভিযোগকে সামনে রেখে ২০২৪-এর আগস্টে ‘জন-অভ্যুত্থানের’ জেরে অশান্তির সাক্ষী থেকেছে বাংলাদেশ, গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে তার সুরাহা তো দূরের কথা, উলটে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছিল। সবার প্রথমে তাই দেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অবস্থাকে চাঙ্গা করা, শান্তিশৃঙ্খলা ফেরানো, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাত দিতে হবে তাঁকে। তাঁর কাছে অন্যতম বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে পাকিস্তানের মদতপুষ্ট জামাত। নিজেদের এজেন্ডা চরিতার্থ করতে মৌলবাদীরা বাংলাদেশে অরাজকতা তৈরি করে বিএনপি সরকারকে হেনস্তা করতে সচেষ্ট হতে পারে বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। ফলে একদা জোটসঙ্গীকে সামলে সুষ্ঠুভাবে দেশ চালানো খুব সহজ কথা নয়। এই নির্বাচনের সঙ্গেই ‘গণভোট’-এ বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের কিছু বিষয় নিয়ে তাদের দ্বিমতের কথা আগেই জানিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু গণভোটে প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় নতুন সরকার কী করবে সেটা বড়ো প্রশ্ন। ভবিষ্যতে এই নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসবের চেয়েও বড়ো কথা হল, প্রতিবেশী দুই দেশ পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক হবে তারেক সরকারের। ভোটের প্রচারে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়েছিলেন ভাবী প্রধানমন্ত্রী। হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন, কারো কাছে আত্মসমর্পণ নয়। বাংলাদেশের স্বার্থই প্রধান। কূটনীতিবিদদের মতে, বিভিন্ন কারণে ভারতকে অস্বীকার করার ক্ষমতা নেই বাংলাদেশের। আবার, পাকিস্তানও তাদের ভারত-বিরোধী এজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে চাইবে। অতএব এই দুই শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে নতুন সরকারকে। ভালো-মন্দ, সাদা-কালো বুঝতে ভুল হলে তা বাংলাদেশের পক্ষেই খারাপ হবে। ভারত অবশ্য শান্তি সৌভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী। 
বিএনপি জেতায় ভারত কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে বরাবরই ভারতের সম্পর্ক ছিল বেশ ভালো। বিশেষত, আওয়ামি লিগের সঙ্গে এদেশের নেতৃত্বের সখ্যতায় কোনো রাখঢাক নেই। এই কারণেই দেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে ভারতে রয়েছেন হাসিনা। কিন্তু বাংলাদেশে আওয়ামি লিগ এখন কার্যত অতীত। নতুন শক্তির নাম বিএনপি। তাই তাদের সঙ্গেই যাবতীয় সখ্যতা গড়ে তুলতে তারেকের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এটাই সঠিক কাজ। কারণ, প্রতিবেশী কোনো দেশে আগুন জ্বললে বা অশান্তি থাকলে তার আঁচ এসে পড়ে পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশী দেশে। একথা কারো অজানা নয়। ভারত চায় বাংলাদেশে শান্তি বিরাজ করুক। বিশেষত, পাকিস্তানের মতো ভারতবিরোধী শত্রু দেশের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করা ভারতের নিজেদের স্বার্থেই দরকার। তাছাড়া সীমান্তে জঙ্গি কার্যকলাপ আটকাতেও ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশের সুসম্পর্ক জরুরি। তবে অঙ্ক খুব সহজ নয়। প্রথমত, নতুন সরকার হাসিনাকে ফেরত চাইলে দিল্লি কী করবে তা দেখার। দ্বিতীয়ত, গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তি যা এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে, তাই নিয়ে দু’ দেশের আলোচনার জল কোন দিকে গড়াবে তাও লাখ টাকার প্রশ্ন। তৃতীয়ত, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে দু’দেশের সংঘাত বন্ধ হবে কি না সেটা বড়ো প্রশ্ন। চতুর্থত, পাকিস্তান নিয়ে তারেকের অবস্থান কী হবে, বিশেষত জঙ্গি কার্যকলাপের প্রেক্ষিতে? প্রশ্ন, বিতর্ক টানাপোড়েন যাই থাকুক, আশা করা যায় দু’ দেশই নিজেদের ভালো ও উন্নয়ন অগ্রগতির স্বার্থে একে অপরের সঙ্গে বেঁধে বেঁধে থাকবে। দরকার শুভবুদ্ধি। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ