কথায় বলে, মুখের কথা আর তূণের তির ফেরানো যায় না। ট্রোল থেকে শুরু করে যেখানে যা মুখে আসে বলে দেওয়া, আইনের চোখে এসব কি স্বাভাবিক? জানালেন আইনজীবী সুদেষ্ণা দাস ও নীলাঞ্জন হাজরা।
কথায় বলে, মুখের কথা আর তূণের তির ফেরানো যায় না। ট্রোল থেকে শুরু করে যেখানে যা মুখে আসে বলে দেওয়া, আইনের চোখে এসব কি স্বাভাবিক? জানালেন আইনজীবী সুদেষ্ণা দাস ও নীলাঞ্জন হাজরা।
ঘটনা ১
বান্টি আর রিংকি দুই ভাইবোন। দু’জনের মধ্যে ভালোই সম্পর্ক। বান্টি বড়ো মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত। রিংকি সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করছে। দু’জনের মধ্যে প্রায়ই রাজনৈতিক বিষয়ে চর্চা হয়, আলোচনা থেকে প্রায়ই দু’জনের মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে যায়। বান্টিকে যা খুশি তাই বলে সম্মানহানি করে রিংকি। প্রতিবাদ করলে বলে, ‘আমার বাক্ স্বাধীনতা আছে, আমি বলতেই পারি।’
সত্যিই কি এটা বাক্ স্বাধীনতা?
ঘটনা ২
লেডিস বগিতে তর্ক জমে উঠেছে। মেয়েদের পোশাক নিয়ে কথা হচ্ছে। অনেকেই মেয়েদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। একজন বলল, মেয়েদের বেশি রাত করে বাড়ি ফেরা ঠিক নয়। আর একজন বলল, পোশাক ঠিক না থাকলে নানা দুর্ঘটনা তো ঘটবেই। এই মন্তব্যের প্রতিবাদে আরও ১০ টি মন্তব্য চারপাশ থেকে ছুটে আসে। কোণঠাসা হয়ে অন্য পক্ষ হঠাৎ বাক্ স্বাধীনতার দোহাই দেয়। বলে, বাক্ স্বাধীনতা আছে, আমার মত আমি বলতেই পারি।
সত্যিই কি এটাও বাক্ স্বাধীনতা? বাক্ স্বাধীনতা মানে কি যাকে যা খুশি বলার স্বাধীনতা?
বাক্ স্বাধীনতা কী? আসুন জেনে নিই আইন কী বলছে।
আইনের চোখে বাক্ স্বাধীনতা
ভারতের সংবিধানের ১৯ নং অনুচ্ছেদের (১)(ক) ধারা অনুযায়ী, ভারতের সকল নাগরিকের স্বাধীনভাবে বাক্ ও মতামত প্রকাশের অধিকার আছে। এর মধ্যে মৌখিক, লিখিত, মুদ্রণ বা ডিজিটাল মাধ্যমে মতামত প্রকাশের অধিকার অন্তর্ভুক্ত। বাক্ স্বাধীনতা বা মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা অন্যতম মৌলিক মানবাধিকার। কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে সরকারি সেন্সরশিপ, প্রতিশোধ বা শাস্তির ভয় ছাড়াই স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত ও ধারণা প্রকাশ করতে দেয় এই অধিকার।
রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রে ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে এই অধিকারের উল্লেখ আছে। বাক্ স্বাধীনতা এমন একটি মানবাধিকার, যা বাক্য, লেখা কোনো বিষয়বস্তু, শিল্প বা প্রতীকী আচরণের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে। ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে এই মৌলিক অধিকারকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবেও সংরক্ষিত।
এত শৌখিনভাবে সংরক্ষিত যে অধিকার, সেই অধিকার কি ন্যায্য উপায়ে প্রয়োগ হয় সবসময়? আমাদের চারপাশের নানা ঘটনা কিন্তু সেকথা বলে না। এই যেমন সোশ্যাল মিডিয়া। নিত্য সেখানে ঝগড়া, কুরুচিকর আক্রমণ, ট্রোল লেগেই আছে। সেখানেও তো প্রতিদিন কারও বাক্ স্বাধীনতা হয় হরণ হচ্ছে, নয়তো মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে শিখণ্ডী খাড়া করে কেউ অনবরত ভুল কথা বলেই চলেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বাক্ স্বাধীনতা
সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট থাকলেই যেন আজকাল অন্যকে সম্মানহানি করার ‘লাইসেন্স’ পেয়ে যান অনেকে! আইনজীবী সুদেষ্ণা দাস জানালেন, ‘দেখা গিয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই আইনের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। তাই এর সংশোধন করার প্রয়োজন পড়ে। ভারতীয় সংবিধানের প্রথম সংশোধনী আইনে বেশ কয়েকটি পরিবর্তন আসে। যেখানে ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদও সংশোধিত হয়েছিল।
এই সংশোধনের উদ্দেশ্য ছিল ‘বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অপব্যবহার’ মোকাবিলা করা।’
আসলে এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিল তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গে শরণার্থী সংকট এবং মাদ্রাজে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলির সমালোচনা। সংবাদপত্রের উপর সেন্সরশিপ আরোপের প্রাথমিক চেষ্টা ‘অসাংবিধানিক’ বলে ঘোষিত হয়। তৎকালীন সরকার তখন বাক্ স্বাধীনতার উপর সীমাবদ্ধতা আরোপের যৌক্তিকতা বোঝাতে বিচারবিভাগের কিছু রায়ের উল্লেখ করে। এর পক্ষে যুক্তি দেয়।
এ নাহয় গেল সংশোধনের ইতিহাস। কিন্তু এই মৌলিক অধিকার সম্পর্কে ঠিকমতো ওয়াকিবহাল না হয়েই সামাজিক নানা মাধ্যমে অনেকে অশালীন ও বেআইনি মন্তব্য করেন ও জোর গলায় বাক্ স্বাধীনতার কথা বলেন। এর ফলে অন্যের
মানহানি হওয়ায় অনেকে অভিযোগ করছেন। মামলাও হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ধারায়। এই প্রসঙ্গে আইনজীবী নীলাঞ্জন হাজরা জানালেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার মতামত দ্রুত জনসমর্থন সংগঠিত করতে সহায়তা করে। তবে এরই সঙ্গে এমন একটি পরিসর তৈরি করে যা হয়তো ভ্রান্ত তথ্য ও ঘৃণাত্মক বক্তব্যের পরিমণ্ডল গড়ে তোলে।’
দুই আইনজীবীরই মত, বাক্ স্বাধীনতা হরণ হলে শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে তথ্য প্রযুক্তি আইনে। তবে কতটুকু লিখলে এবং ঠিক কী লিখলে শাস্তি দেওয়া হবে, এখনও পর্যন্ত সেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়নি। অভিযোগ প্রমাণ করার পদ্ধতির ক্ষেত্রেও কিছুটা জটিলতা আছে।
শাস্তি
বাক্ স্বাধীনতা কখনোই অন্যের মানহানির অধিকার দেয় না, কারণ এটি মৌলিক অধিকারের যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে। যদি কেউ বাক্ স্বাধীনতার কারণ দেখিয়ে অহেতুক কাউকে বিভ্রান্ত করে কারও মানহানি করেন, তবে দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় আইনেই শাস্তির বিধান রয়েছে। কেউ যদি অন্য ব্যক্তিকে অপমান করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য বা বক্তব্য প্রচার করেন তাহলে ভারতীয় আইন অনুসারে, সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি আর্থিক জরিমানা বা উভয় দণ্ডই বলবৎ হতে পারে।
অর্পিতা ঘোষ মণ্ডল