শান্তনু দত্তগুপ্ত: এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে বড় সেলিব্রিটি কি কুণাল কামরা? খবরের কাগজে তাঁকে নিয়ে যত শব্দ লেখা হচ্ছে, টিভিতে যত প্রোগ্রাম, আর সোশ্যাল মিডিয়ায় যত ‘সার্চ’, তা শাহরুখ খানকে নিয়েও হচ্ছে না। প্রচারের কাঞ্চনজঙ্ঘায় বসে আছেন তিনি। কেন? মহারাষ্ট্রের ডেপুটি মুখ্যমন্ত্রী একনাথ সিন্ধেকে নিয়ে প্যারোডি গেয়েছেন বলে? ‘মেরি নজর সে তুম দেখো তো গদ্দার নজর উও আয়ে’... এই ছিল তাঁর লাইন।
কোন প্রেক্ষিতে? সিন্ধে মশাই আগে অটো চালাতেন। সেটা উল্লেখ করেছেন কুণাল। শিবসেনা বিজেপির থেকে বেরিয়ে এসেছিল, আবার ক্ষমতার লোভে শিবসেনা দল ভেঙে শিবসেনা থেকেই বেরিয়ে এসেছে। সৌজন্যে? একনাথ সিন্ধে। কিন্তু কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া যেমন বলা যায় না, তেমনই সিন্ধে মশাইকে গদ্দার বলা যায় না। ‘যাহা বলিব
সত্যি বলিব’ এখন আর শপথবাক্য নয়, আজকের দুনিয়ায় ‘যাহা বলিব লুকাইয়া বলিব, নিজের পৃষ্ঠদেশ বাঁচাইয়া বলিব’... এটাই ফ্যাক্টো। মেনে চলতে হবে এই ফর্মুলাই। তবু কুণাল কামরা বলেছেন এবং তোপের মুখেও পড়েছেন। সত্যি কথা আবার বলা যায় নাকি? কংগ্রেসের ইমরান প্রতাপগঢ়ি যেমন। কী প্রয়োজন ছিল তাঁর মুশায়রায় ‘অ্যায় খুন কে প্যায়াসে...’ বলার?
একটা বিষয় ভেবে দেখার, সিন্ধে বাহিনী কামরার পিছনে মাটি কামড়ে পড়ে না গেলে এই ‘ফেম’ কি তিনি পেতেন? থাকতেন কি চর্চায়? নাকি ইমরানের বিরুদ্ধে গুজরাত পুলিস এফআইআর না করলে পুলিস-প্রশাসনকে রাজধর্ম মনে করিয়ে দিত সুপ্রিম কোর্ট? নেগেটিভ পাবলিসিটি যে যশ এবং অর্থলাভের ক্ষেত্রে কতটা সহায়ক হতে পারে, তার প্রমাণ এই জেনারেশন আলফা বারবার দিয়ে চলেছে। সবাই সার্চ করছে... ঠিক কী বলেছিলেন কুণাল কামরা? প্রত্যেকে জানতে চাইছে, ইমরান প্রতাপগঢ়ির মুশায়রা ঠিক কী ছিল? লাইক বাড়ছে, সাবস্ক্রাইবারও। কুণাল কামরার ৬০ লক্ষ ফলোয়ার। এই বৃদ্ধি তাঁকে আর্থিক দিক থেকেও সমৃদ্ধ করছে। তাই তিনিও চাইছেন, হোক বিতর্ক। আর ততই কুঁচকে উঠছে শাসকের কপাল। কিম জং উনের দেশ তো নয় যে এক ‘ডিক্রি’তেই সব হাপিস হয়ে যাবে! গণতন্ত্র বলে কথা। তাই সব করতে হবে ভেবেচিন্তে। আইনের পথে। রাজা নেই তো কী হয়েছে? রাজধর্মটা তো আছে! অন্তত লোক দেখানোর জন্য তো বটেই।
রাজধর্ম। বড্ড কঠিন একটা শব্দ। এবং এর মানেটাও ভীষণ আপেক্ষিক। যে রাজা সিংহাসনে বসেন, তাঁর মতো করেই এই শব্দটাকে দুমড়ে মুচড়ে নিজের মতো করে নেন। রামও রাজা, রাবণও। দু’জনেই কিন্তু নিজেদের মতো করে রাজধর্ম পালন করেন। তাও মানুষ রামের কথাই বলে। রাবণের নয়। কেন? সাম্য। ব্যালান্স। বিভেদ না করা। রাজতন্ত্র হোক বা গণতন্ত্র, এই শর্তগুলো যে ভীষণভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু মোদিতন্ত্রে? সাম্য থাকলে কর্পোরেট বন্ধুরা ঘি-মাখনের সমুদ্রে ভেসে বেড়ান না। ব্যালান্স থাকলে ধর্মের রাজনীতি হয় না। আর বিভেদ না করলে ভোট নিশ্চিত হয় না। সংবিধান আছে। সেখানে লেখা ১২ থেকে ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদও রয়েছে। কিন্তু ছাপার অক্ষরে লেখা মৌলিক অধিকারগুলো কোথায় যেন নিখোঁজ। তাই দিলওয়ার হুসেন মজুমদার যখন অসম সমবায় অ্যাপেক্স ব্যাঙ্কের দুর্নীতি সংক্রান্ত আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন করতে যান, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এফআইআরে লেখা হয়, তিনি নাকি ব্যাঙ্কের এক কর্মীর বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন। উপরন্তু তিনি ব্যাঙ্কের ফাইলও লুট করার চেষ্টায় ছিলেন। কিন্তু আসল কারণ কী? অ্যাপেক্স ব্যাঙ্কের ডিরেক্টরের নাম হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। অসমের মুখ্যমন্ত্রী আর চেয়ারম্যান? বিজেপি বিধায়ক বিশ্বজিৎ ফুকন। তাই দিলওয়ারের প্রশ্ন করার অধিকার নেই। বাক স্বাধীনতা নেই।
রিপোর্ট বলছে, মোদি জমানায় ১৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার ধারায় মামলা হয়েছে। অন্তত ছ’জন এখনও জেলে আছেন। কেন? তাঁরা শাসকের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন বলে? কঠোর বাস্তব নিয়ে প্রশ্ন করার জন্য? ওয়াশিংটন পোস্টে লেখা হয় কাশ্মীরের সাংবাদিকদের পরিস্থিতি। সরকার বিরোধিতায় কীভাবে তাঁদের গায়ে জঙ্গি তকমা সেঁটে দেওয়া হয়। কীভাবে তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয় প্রশাসন। যাতে তাঁরা দেশের বাইরে চলে যেতে না পারেন। প্রশ্ন উঠবে? কে করবে? চুপ, মোদিতন্ত্র চলছে। এই দেশের মাটিতে ক’জন সাংবাদিকের সৌভাগ্য হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎকার নেওয়ার? তাঁকে ওপেন ফোরামে প্রশ্ন করার? পেটোয়া হতে হবে। এটাই একমাত্র যোগ্যতা। প্রশ্ন হবে নিরামিষ। যার উত্তর সরকার এবং শাসক দলকে প্রচার দেবে। দুর্নীতি, বিরোধীদের কণ্ঠরোধ, বিভাজন, বিদেশনীতি... মোদি জমানায় এসব নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে নাকি? গারদের গ্রিল ধরে লাট খাওয়ার ইচ্ছে এতটুকু নেই মশাই। সাংবাদিক হোক, স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ান বা চলচ্চিত্র নির্মাতা—কথা বলুন না! কে আটকেছে? কিন্তু বেছে বেছে বলুন। ভেবেচিন্তে বলুন। সৃষ্টি অতি উত্তম বস্তু। খবর লিখুন, প্রবন্ধ ছাপুন বা সিনেমা তৈরি করুন... স্বাধীনতা আপনার নেই। শাসক কী বলে? বাক স্বাধীনতা আছে বলেই কাউকে যা খুশি বলে আক্রমণ করা যায় না। একটা ডিসিপ্লিন থাকা উচিত। যাতে মৌলিক অধিকারের সুযোগ নিয়ে কেউ সিস্টেমের ক্ষতি না করতে পারে। কিন্তু শাসক ভুলে যায়, এই মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করেই আম জনতা তাদের মসনদে বসায়। তাদের হয়ে প্রচার করে। শাসককে অধিকার দেয়, দেশ কীভাবে চলবে তা স্থির করার। আর ভুলে যায় বলেই বাক স্বাধীনতা থাকে শুধু শাসকের। মহারাষ্ট্রে জোট সরকারের মন্ত্রী অজিত পাওয়ার সরাসরি বলতে পারেন, ‘কৃষিঋণ মকুব করব না। ভোটের সময় অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সব কি রাখতে হবে নাকি?’ কী বলা যায় এই প্রবণতাকে? অজিত পাওয়ার ভনিতা করেননি? স্পষ্ট কথা বলেছেন? নাকি শাসকের ঔদ্ধত্য এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, গণতন্ত্রকে হেলাফেলা করতে তার আর এতটুকুও বাধছে না?
সুপ্রিম কোর্ট একটা খুব দামি কথা বলেছে... ‘আমাদের গণতন্ত্র, সহনশীলতার ভিত কি এতটাই ঠুনকো যে, কোনও একটা লেখা বা মন্তব্যে তা নড়ে যাবে?’ কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট যা বলেনি তা হল, নিশ্চয়ই সেই লেখা বা মন্তব্যের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে, যা টেনে খুলে দিয়েছে শাসকের অনৈতিকতার মুখোশটাকে। সেই শব্দগুলো চাঁদমারির মতো বিঁধেছে, অস্থির করে তুলেছে। তাই শুরু হয়েছে পাল্টা আঘাত। এফআইআর। রাষ্ট্রদ্রোহিতার ধুয়ো উঠেছে। মিথ্যা মামলায় জেলে যেতে হচ্ছে আম আদমিকে। আস্থা নয়, আতঙ্কে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কণ্ঠস্বর। বিশ্বগুরুর অহঙ্কার গোটা বিশ্বকেই সিংহাসনের মাপে ভাবতে শিখিয়ে দিয়েছে। ঠিক যেমন বিজয়াদিত্য বলেছিলেন, ‘পরিহাস করে তোমরা আমাদের বল পৃথিবীপতি কিন্তু পৃথিবীকে সিংহাসনের মাপে ছোট করে তোমরা আমাদের খেলনা বানিয়ে দিয়েছ—সব দেখা দেখতে পাই নে, সব শোনা শোনবার জো নাই।’ বিজয়াদিত্যকে দেখতে দেওয়া হতো না। সাধারণের কণ্ঠ তাঁর কানে এসে পৌঁছত না। কিন্তু আজকের রাজাধিরাজরা দেখেও দেখেন না। শুনেও শোনেন না। তাহলেই যে রাজধর্ম পালন করতে হবে! ক্ষমতার জোব্বাটা গা থেকে নামিয়ে জনসমুদ্রের হাহাকারের মাঝে নেমে পড়তে হবে। সেটাই তো নাপসন্দ। বিলকুল নাপসন্দ। হোক না সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারত ১৫৯। কী আসে যায়, বাক স্বাধীনতায় যদি ভারত ৩৩টি প্রথম সারির দেশের মধ্যে ২৪ নম্বরে থাকে! এটাই নতুন ভারত। এটাই মানতে হবে।
ইদানীং বহু স্কুলের সিলেবাসেই সংবিধান পড়ানো হয়। শেখানো হয় তার প্রয়োজনীয়তা। বলা হয়, বৈচিত্র্যের ভারতে ঐক্য ধরে রাখতে একটা বাঁধন দরকার। সেটাই সংবিধান। এই সংবিধান যেমন ভারতের নাগরিকদের ডিসিপ্লিনড হতে শেখায়, ঠিক তেমনই অধিকারের পথ খুলে দেয়। শীর্ষ আদালত মনে করিয়েছে, ‘সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার ভার পুলিস ও আদালতের। আর এই অধিকারের মধ্যে বাক স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বিভিন্ন লেখা বা কথা আমাদের পছন্দ না-ই হতে পারে। কিন্তু সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করাটা আমাদের কর্তব্য।’ সাধারণ মানুষ তাই আজও তাকিয়ে তাকে বিচার ব্যবস্থার দিকে। মনে করে, সরকার ভুল করতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট করবে না। সরকার অন্যায় করলে তা রুখে দেবে আদালত। গণতন্ত্রের তিন স্তম্ভ—আইনসভা, প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা। আইনসভা নির্বাচিত... অর্থাৎ আমরাই ভোট দিয়ে তাদের সংসদ বা বিধানসভায় পাঠাই। আর প্রশাসন চলে তাদেরই কথায়। শুধুমাত্র তৃতীয় স্তম্ভ, অর্থাৎ বিচার ব্যবস্থা নিরপেক্ষভাবে সবটা দেখে। তাদের দাঁড়িপাল্লার একদিকে থাকে সরকার, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ। সমাজ। এখনও তারা পাঁচিল হয়ে দাঁড়ায় সরকারে জনবিরোধী নীতি ও আম জনতার অধিকারের মাঝে। এটাই এখনও বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের আশা। এখনও আমরা স্বস্তিতে থাকি, দেশটা উত্তর কোরিয়া হয়ে যায়নি। কিংবা চীন। আমরা ভাবি, পরিস্থিতির বদল নিশ্চয়ই হবে।
আজ এপ্রিল ফুল’স ডে। বোকা বানানোর দিন। কিন্তু কখনও কখনও মনে হয়, বছরের সবক’টা দিনই আমাদের বোকা হয়ে থাকার। আমরা বুঝতে পারছি, স্রেফ বোকা বানানো হচ্ছে আমাদের। কিন্তু সেটাও মেনে নিচ্ছি। কেন? করার কিছু নেই? বলার কিছু নেই? শুধুই আতঙ্কে প্রতিদিন আমরা বাক স্বাধীনতাকে ধুলোয় মিশে যেতে দেখব? ইমার্জেন্সির সময় ভারত ভেবেছিল, আর বোধহয় স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি নেই। দু’বছরের মধ্যেই কিন্তু আমরা আবার গণতন্ত্রকেই প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই। স্বাধীনতার ৭৮ বছরে ভারতের ঐক্যের হিসেব হয় না। অতীতে যতবার রাজদণ্ডের অপব্যবহার হয়েছে, আমরাই উঠে দাঁড়িয়েছি। ছুড়ে ফেলেছি শাসককে। এই শিক্ষাটা অন্তত নেওয়া উচিত ইতিহাস থেকে। প্রত্যেকটা দলের। প্রত্যেক শাসকের।