সৌম্যকান্তি ত্রিপাঠী, বেলদা: পশ্চিম মেদিনীপুরের ওড়িশা সীমান্তের কাছে দাঁতন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শুরুর দিকে দাঁতনে থানা ভবন গড়ে তোলা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে সেই ভবন ছিল পরাধীনতার প্রতীক। ১৯৪২সালে দেশজুড়ে যখন ভারত ছাড়ো আন্দোলন তীব্র হচ্ছে, তখন মহাত্মা গান্ধীর ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ স্লোগানে দাঁতনেও কংগ্রেস নেতাকর্মী ও বিপ্লবীদের মধ্যে দেশপ্রেমের আগুন জ্বলে ওঠে। মেদিনীপুরের প্রান্তিক এলাকা দাঁতনে থানা আক্রমণ করে সেখানে চরকা ও ত্রিবর্ণরঞ্জিত প্রতীকী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। সেই ঘটনার কথা এখনও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করেন দাঁতনবাসী।
১৯৪২সালের ৯আগস্ট গান্ধীজির ডাক আপামর ভারতবাসীকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁরা একজোট হয়ে দেশের জন্য প্রাণ পর্যন্ত বাজি রাখতে প্রস্তুত হন। এতে ভয় পেয়ে দুর্বৃত্ত ইংরেজ সরকার বিনা নোটিসে যেখানে সেখানে কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের ধরপাকড় শুরু করে। দাঁতনের অবিসংবাদিত কংগ্রেস নেতা চারুচন্দ্র মহান্তি ও প্রসন্ন গিরিকেও গ্রেপ্তার করে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি করা হয়। এঘটনায় দাঁতনজুড়ে শোরগোল পড়ে যায়। স্থানীয় কংগ্রেস নেতাকর্মী ও স্বাধীনতাকামী মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়েন।এরপর মেদিনীপুর জেলা কংগ্রেস কমিটি অনতিবিলম্বে নির্দেশ জারি করে, ২৯সেপ্টেম্বর থেকে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ব্রিটিশ পুলিশের থানায় হামলা শুরু হবে। থানা, আদালত সহ বিভিন্ন সরকারি ভবনে প্রতীকী জাতীয় পতাকা তোলা হবে। ১৯৪২সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনও একদিন দাঁতনের থানা ভবন আক্রমণ করা হয়। সেসময় বিভিন্ন থানায় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর ইংরেজ পুলিস অকথ্য অত্যাচার চালাত। তাই থানা ভবনের চূড়ায় তেরঙা পতাকা উড়িয়ে ইংরেজের দর্প চূর্ণ করাই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের লক্ষ্য ছিল।সেদিন সুবর্ণরেখার পাড়ের বহু গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ মিছিল করে লাঠি, বল্লম, তীরধনুক নিয়ে ওড়িশা ট্রাঙ্ক রোডের ধারে জড়ো হয়েছিলেন। বিদ্যাধর দিঘির পাড়ে ব্রিটিশ থানা প্রাঙ্গণে ভিড় জমে যায়। দাঁতন আদালতের আইনজীবী থেকে শুরু করে দাঁতন হাইস্কুলের কিশোর পড়ুয়ারাও সেখানে হাজির হয়। অতর্কিত জমায়েতে দাঁতন থানায় কর্মত দারোগা ও পুলিসকর্মীরা হতবাক হয়ে পড়েন। উত্তেজিত জনতা দলে দলে থানার ভিতর ঢুকে পড়ে। শুরু হয় ভাঙচুর। চারদিকে বিশৃঙ্খলার মধ্যেও কয়েকজন থানা ভবনের উপরে উঠে পতাকা লাগিয়ে দেন। নীচে তখন হর্ষধ্বনি ও বন্দেমাতরম স্লোগান।
দাঁতনের স্থানীয় ইতিহাস গবেষক সন্তু জানা বলেন, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে দেশের বহু প্রান্তিক জনপদের মানুষের রোমহর্ষক সংগ্রাম-গাথা নতুন প্রজন্মকে জানানো আমাদের কর্তব্য। ব্রিটিশ শাসকের অপশাসনের বিরুদ্ধে নির্ভীক ভারতবাসীর প্রতিটি প্রতিবাদ, প্রতিরোধকে নতুন করে আলোকিত করতে হবে। ১৯৪২ সালে দাঁতনের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দ্বারা ব্রিটিশ থানা আক্রমণের ঘটনাটি এখনও আমাদের গর্বিত করে।