নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও আসানসোল: এসআইআরের মাধ্যমে এক কোটি রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দিয়ে সাফসুতরো ভোটার তালিকা বানানোর ‘শপথ’ নেওয়া পদ্মপার্টি এখন বেশ বেকায়দায়। কোথায় রোহিঙ্গা? আর কোথায়ই বা ভোটার তালিকায় অনুপ্রবেশকারীদের আধিক্য? উলটে এসআইআর পর্বে এখনও পর্যন্ত যত সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাতে শঙ্কিত বিজেপি। আর তাই ‘মহারাষ্ট্র-দিল্লি মডেলে’ ভিন রাজ্যের মানুষকে বাংলার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করিয়ে পালে হাওয়া তোলার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে গেরুয়া শিবির। বিশেষ করে রাজ্যের শিল্পাঞ্চল এলাকা আসানসোল-দুর্গাপুর, বারাকপুর এবং হুগলির বিভিন্ন কেন্দ্রে যেখানে বড় সংখ্যক হিন্দিভাষী মানুষ রয়েছেন, সেখানেই এই ছক রূপায়ণে জোর দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, এমনকি হরিয়ানার বাসিন্দাদের ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করিয়ে জমা দিচ্ছে পদ্মপার্টি। যদিও ভিন রাজ্যের মানুষের বাংলায় ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে কোনও ‘অন্যায়’ দেখছে না বিজেপি। দলের আসানসোল সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি প্রশান্ত চক্রবর্তী বলেছেন, ‘সব কিছুতেই বিজেপির ভূত দেখছে তৃণমূল। যে কোনও ভারতীয় ইচ্ছে করলেই বাংলার ভোটার হওয়ার আবেদন করতে পারেন। এতে অন্যায় কী আছে!’
এই কাজে গেরুয়া শিবির যে কতটা মরিয়া, তা প্রমাণিত বিজেপির অভ্যন্তরীণ নির্দেশে। গত ১১ জানুয়ারি নির্দেশ আসে, আগামী ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সমস্ত সভা, সমিতি এবং পদযাত্রা বাতিল করে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে ৬ নম্বর এবং ৭ নম্বর ফর্ম নিয়ে। তা পূরণ করতে হবে। আর সঙ্গে সঙ্গে জমাও দিতে হবে। কারণ কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, এসআইআর পর্বে চূড়ান্ত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি (৬ নম্বর) এবং নাম নিয়ে আপত্তি ও বাদ দেওয়ার (৭ নম্বর) ফর্ম জমা দেওয়ার শেষ দিন আজ। মরিয়া গেরুয়া শিবির নাম অন্তর্ভুক্তি এবং ‘বিরোধী’ ভোটারের নাম বাদ দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বলেই আশঙ্কা তৃণমূলের। সঙ্গে রয়েছে ৮ নম্বর ফর্ম। হরিয়ানায় ভোট দিয়ে কোনও ‘বহিরাগত’ যদি বাংলাতেও ইভিএমের সামনে দাঁড়াতে চান, তাহলে স্থানান্তরিত ভোটার হিসাবে তাঁকে এই ফর্ম পূরণ করতে হবে। সেটাও পুরোদমে চলছে বলে দাবি তৃণমূলের। মঙ্গলবার স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বহিরাগত’দের বাংলার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ এনেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে। আর সে কারণেই বুধবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিকের দপ্তরে ৬ নম্বর এবং ৭ নম্বর ফর্ম নিয়ে বিজেপির ‘অপকৌশল’এর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে তৃণমূল প্রতিনিধি দল। দলের সদস্য রাজ্যের মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া, শশী পাঁজা, সাংসদ পার্থ ভৌমিক ও সায়নী ঘোষদের অভিযোগ, ভিন রাজ্যের বাসিন্দাদের নাম ভোটার তালিকায় তুলে, এখানে মহারাষ্ট্র-দিল্লি মডেলের কায়দায় ভোট চুরি করতে চাইছে বিজেপি। কমিশনকে আমরা জানিয়েছি, এই প্রক্রিয়া বন্ধ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের।
এই পর্বে বুধবার বিকেল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন থেকে মেলা তথ্য অনুযায়ী, বাংলায় এসআইআর ঘোষণার দিন যখন ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ হয়, তখন পর্যন্ত নতুন ভোটারের আবেদন বকেয়া ছিল ৩ লক্ষ ৩১ হাজার ৭৫টি। ১৬ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর বুধবার, ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলায় ভোটার হতে আরও ৩ লক্ষ ৭৮ হাজার ১৬৩টি আবেদন জমা পড়েছে। এক মাসে। শাসকদলের অভিযোগ, এই আবেদনের একটা বড় সংখ্যা ভিন রাজ্যের। গত কয়েক বছরে যেখানে নতুন ভোটারের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে, সেখানে এক মাসে এই ‘লাফ’ মোটেই ‘শুদ্ধকরণে’র ইঙ্গিত নয়।