Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিদেশিরা আজও ভারতের অর্থ লুণ্ঠন করে চলেছে

ভারত আজও সোনার ডিম দেওয়া একটি হাঁস। বিশ্বজগতের কাছে। যে ভারত খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ থেকে মোগল সাম্রাজ্যের প্রথম ১০০ বছর পর্যন্ত দুনিয়ার সবথেকে ধনী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হত, যাদের পণ্য কিনতে গোটা বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলির জাহাজে ভর্তি থাকত ভারতের বন্দরগুলি, সেই ভারত এখন রপ্তানির তুলনায় আমদানি করে বেশি। অর্থাৎ ভারতের টাকা বিদেশি রাষ্ট্র নিয়ে চলে যাচ্ছে।

বিদেশিরা আজও ভারতের অর্থ লুণ্ঠন করে চলেছে
  • ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: মিশরের ফারাও দ্বিতীয় রেমেসিসের মৃত্যু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১২১৩ অব্দে। তাঁর মমি কায়রো মিউজিয়মে সংরক্ষিত রয়েছে। সেই মমির অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পরীক্ষা করে জানা গিয়েছে যে, মৃত্যুর পর মমি করার সময় এই ফারাওয়ের নাসারন্ধ্র গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে বন্ধ করা হয়েছিল। সম্ভবত যাতে পচন না ছড়ায় মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে। মিশরে গোলমরিচ চাষ হত না। কোথা থেকে আসত? দক্ষিণ ভারত থেকে। 

Advertisement

ইতিহাসবিদদের কাছে এটি অন্যতম প্রমাণ যে, আজ থেকে সাড়ে ৩ হাজার বছর আগে 
থেকেই আফ্রিকার সঙ্গে ছিল ভারতের বাণিজ্য যোগাযোগ। এরপর সেটি সম্প্রসারিত হয় ইওরোপে। মিশরের বিখ্যাত রানি ক্লিওপেট্রা যখন আশঙ্কা করছেন যে, তাঁকে ও অ্যান্টনিকে রোমের 
শাসক অক্টাভিয়ান যে কোনো সময় হত্যা করবে, তখন তিনি নিজের পুত্র সিজারিয়ানকে সরিয়ে দিয়ে পাঠাতে চেয়েছিলেন ভারতে। তার অর্থ হল, নিশ্চিত তাঁর সঙ্গে ভারতের কোনো গভীর সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্ক হল বাণিজ্যের।
খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দে ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর পর যখন রোম মিশরকে নিজেদের সাম্রাজ্যের অঙ্গ করে নিল, তারপর থেকে রোমান ও ভারতের বাণিজ্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ভারতের একঝাঁক পণ্যের চাহিদা ছিল গোটা বিশ্বে। মধু থেকে মশলা। সুতো অথবা আদা। ভারত এতটা‌ই আধিপত্য কায়েম করেছিল এই বাণিজ্যে যে, একমাত্র বিনিময় মূল্য ছিল সোনা। অর্থাৎ সোনা দাও পণ্য নাও।  সোনা ছাড়া কোনো মুদ্রা অথবা অন্য পণ্য নেওয়া হবে না। সাফ কথা ছিল ভারতের। 
১৪৯৮ সালের ২০ মে পর্তুগিজ ব্যবসায়ী  ভাস্কো দা গামা মালাবার উপকূলে কয়েকটি জাহাজ নিয়ে এসেছিলেন। কালিকটে এসে তিনি দেখেছিলেন 
আগে থেকেই বিভিন্ন দেশের জাহাজ সেখানে রয়েছে। সকলেই ভারতে যাতায়াত করে বাণিজ্যের জন্য। ঠিক ২ বছর পর পর্তুগিজ বাহিনী ওই তাবৎ জাহাজ ধ্বংস করে দেয়। অবাধে গণহত্যা করে। কারণ 
মশলার দখলদারি। সেই শুরু।   একের পর এক কারখানা তৈরি করে পর্তুগিজরা। ভারতের মাটিতে ভারতের চাষবাসের দখল নিয়ে  নেয় তারা। এবং শাসক হয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকায়। লুণ্ঠন চলে ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণে। 
১৫৯৪ সালে ডাচ ব্যবসায়ীদের একটি গোষ্ঠী জাভা থেকে গোলমরিচ কিনে নিয়ে ফিরেছিল। কিন্তু শুনেছিল দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে এর থেকেও ভালো গোলমরিচ পাওয়া যায়। সকলে মিলে একটি কোম্পানি চালু করে। তার নাম ভিওসি। তারা মালাবার উপকূলে হাজির হয়। দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় পর্তুগিজদের সঙ্গে। ডাচেরা অনেকটা ব্যবসা দখল করে নিতে সমর্থ হয়। কিন্তু কালিকটের রাজার সঙ্গে মতান্তর হওয়ায় তিনি অন্য একটি দেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীদের গোলমরিচ বিক্রি করতে শুরু করলেন। সেই দেশের নাম ব্রিটেন। আর সেই দেশের কোম্পানির নাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এসবের মাঝেই হাজির হয়ে ডেনমার্কের ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এবং  ফরাসি বাহিনী। 
আর এই সব দেশ নিজেদের মধ্যে লড়াই করে চলছিল একটাই উদ্দেশ্যে। সোনার দেশ ভারতকে কারা সবথেকে ভালো করে লুণ্ঠন করতে পারবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বাকিরা যে পরাজিত হয় বাণিজ্য ও রাজনীতির সম্প্রসারণে সেকথা ইতিহাস পড়ুয়া সকলেই জানে। 
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কী করেছিল? ভারতের বস্ত্র শিল্পের উপর বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স চাপিয়েছিল। বিশেষ করে বাংলা। কটন ও সিল্কের বস্ত্র, সুতো উৎপাদনকারীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত কর আরোপ করে পরিস্থিতি এমন করা হয় যে বাংলার তৈরি বস্ত্রের দাম বহুগুণ বেড়ে যায় ব্রিটিশকে ট্যাক্স দিতে 
গিয়ে। এমনকি এমন কিছু চুক্তিভিত্তিক উৎপাদনে বাংলা ও ভারতের কৃষক, শিল্পীদের বাধ্য করা হয়, যা চরম সংকট নিয়ে আসে। আর সেই সুযোগে ইংল্যান্ডে তৈরি হওয়া সস্তা সুতো, বস্ত্র ও পণ্য ভারতে 
রপ্তানি করে প্রভূত মুনাফা করে ব্রিটিশ সরকার। ১ লক্ষ কোটি পাউন্ড মুনাফা করেছিল ব্রিটিশ এই ব্যবসায়! আরও একবার মনে করা যাক। ভারতের পণ্যের উপর কর বসিয়ে, ব্রিটেনের পণ্য ভারতে আসার রাস্তা করা হয়। আর ভারতবাসীর থেকে খাজনা আদায় করে সেই টাকায় ভারতীয় পণ্য ক্রয় করে বিদেশে অন্তত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মুনাফায় বিক্রি করা হয়। এই ছিল লুণ্ঠনের মডেল। 
এই জানা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির কারণ হল, ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হয়েছে। ৮০ বছর 
কেটে গিয়েছে স্বাধীন হওয়ার। প্রধানমন্ত্রী মাঝেমধ্যেই বলেন ভারতকে উপনিবেশবাদের ঘোর থেকে থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দাসত্ব মনোভাব পরিত্যাগ করতে হবে। ভারত স্বদেশিয়ানার মন্ত্রে দীক্ষিত হবে। ভারত হবে আত্মনির্ভর। 
কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে? স্বাধীন ভারতকে এখনও লুণ্ঠন করছে একঝাঁক বিদেশি রাষ্ট্র। আমেরিকার সঙ্গে ভারতের যে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হল, সেটির অন্যতম বিপজ্জনক শর্ত কী? সেই টেক্সটাইল। যা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি করেছিল। ভারত যদি আমেরিকায় তাদের পণ্য বিক্রি করে, তাহলে, ১৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। কিন্তু আমেরিকার বহু পণ্যের ক্ষেত্রে ভারত এক পয়সাও ট্যাক্স আরোপ করতে পারবে না। অর্থাৎ জিরো ট্যাক্স। আবার বাংলাদেশ যদি তাদের বস্ত্র ও বস্ত্রজাত পণ্য আমেরিকায় পাঠায়, তাহলে তাদের কোনো শুল্ক দিতে হবে না। জিরো ট্যাক্স। অথচ ভারত পাঠালে ১৮ শতাংশ ট্যাক্স। আমেরিকার বাণিজ্য সংস্থাগুলি তাহলে কোথা থেকে বেশি আনবে বস্ত্র ও বস্ত্রজাত পণ্য? বাংলাদেশে থেকে। এই চুক্তিতে কী বলা হয়েছে? বলা হয়েছে, ভারত ৫ বছরের জন্য ৫০ হাজার কোটি ডলারের অসংখ্য পণ্য আমেরিকা থেকে কিনবে। ভারতবাসীর টাকা যাবে আমেরিকায়। 
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মাঝেমধ্যেই ভারতে যাতায়াত করেন কেন আজকাল? নিছক একটি আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স সম্মেলনে যোগ দিতে? মোটেই না। ভারত আবার ১১৪টি রাফাল এয়ারক্র্যাফট কিনছে। এর আগে ৫৯ হাজার কোটি টাকা দিয়ে এই রাফাল কেনা হয়েছিল। এবার পুনরায় সাড়ে ৩ লক্ষ কোটি টাকার সামরিক চুক্তি হচ্ছে। অর্থাৎ এই বিপুল অঙ্কের অর্থ ফ্রান্স পাবে ভারতকে সামরিক উপকরণ বিক্রি করে। কাদের টাকা? জনগণের। 
ভারতে কি বুলেট ট্রেন দরকার? সিংহভাগ মানুষ বলবে নিছক বিনোদন ছাড়া কিছুই দরকার নয়। কারণ কেউ প্রয়োজনের জন্য বুলেট ট্রেন ব্যবহার করবে না। বিলাসিতার জন্য চড়বে। কিন্তু সেই বুলেট ট্রেন নির্মাণের জন্য জাপান থেকে দেড় লক্ষ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। ৫০ বছর ধরে মেটাতে হবে ঋণ। ভারতবাসীর টাকা। কতগুলি হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ হত এই টাকায়?
ইজরায়েল ভারতকে এত ভালোবাসে কেন? কারণ ভারত সামরিক অস্ত্র ক্রয় করে। স্নান করার মগ থেকে চায়ের কাপ। গাড়ির টায়ার থেকে দেবদেবীর মূর্তি। ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল তো আছেই। সব 
চীনের পণ্য কেন? চীনের সবথেকে বড়ো বাজার কী? ভারত। আমেরিকার সবথেকে বড়ো বাজার কী? ভারত। ফ্রান্সের অস্ত্র বিক্রির সবথেকে বড়ো বাজার কী? ভারত। 
ভারত আজও সোনার ডিম দেওয়া একটি হাঁস। বিশ্বজগতের কাছে। যে ভারত খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দ থেকে মোগল সাম্রাজ্যের প্রথম ১০০ বছর পর্যন্ত দুনিয়ার সবথেকে ধনী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হত, যাদের পণ্য কিনতে গোটা বিশ্বের প্রথম 
সারির দেশগুলির জাহাজে ভর্তি থাকত ভারতের বন্দরগুলি, সেই ভারত এখন রপ্তানির তুলনায় আমদানি করে বেশি। অর্থাৎ ভারতের টাকা বিদেশি রাষ্ট্র নিয়ে চলে যাচ্ছে। ভারত আগে পেত বাণিজ্যের বিনিময়ে সোনা। এখন ভারতকে সারা বছর ধরে নানাবিধ ধমক দিয়ে চুক্তি করাচ্ছে কে? আমেরিকা। মাত্র ৫০০ বছরের একটি দেশ। 
 ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১০টি বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। ইওয়া‌ই কনসালটেন্সি সার্ভিসের সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের সময়সীমায় যত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ভারত করেছে, তার জেরে ভারতের রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৩১ শতাংশ। কিন্তু আমদানি বেড়েছে ৮২ শতাংশ! 
বাণিজ্য ঘাটতি কাকে বলে? কেন বাণিজ্য ঘাটতি হচ্ছে? আমরা আত্মনির্ভর হতে পারছি না কেন? কেন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পসংস্থায় আর নিয়োগ হয় না, কর্মী সংকোচন হয়ে চলে? কেন মানুষের গড় আয় 
কমে যাচ্ছে? গড় সঞ্চয়ও কমে যাচ্ছে? আমরা ট্যাক্স দিচ্ছি, অথচ সরকার থেকে কোনো সুবিধা পাই না কেন? মাঝেমধ্যেই কেন নিজের নাগরিক হওয়ার প্রমাণ দিতে হবে এই সেদিন আসা একটা সরকারকে? বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা আমাদের সাধ্যের বাইরে 
কেন হয়ে যাচ্ছে? কারা ঠিক করছে টিউশন ফি এবং চিকিৎসার প্যাকেজ? আজেবাজে ইস্যু নিয়ে 
সারা বছর মাথা না ঘামিয়ে এসব নিয়ে ভাবা 
দরকার নয় কি?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ