নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ভারত থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন বিদেশি লগ্নিকারীরা। গত দু’মাসে শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন তাঁরা। বর্তমানে পরিস্থিতি সামান্য ভালো হলেও চলতি ২০২৬ সালের হিসাব ধরলে অঙ্কটা তিন লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত বছরের প্রায় দ্বিগুণ। লাগাতার এই টাকা তোলার কারণে চাপে পড়েছে টাকা, রিজার্ভ ব্যাংক এবং সামগ্রিক বাজার। তার ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে সাধারণ খুচরো লগ্নিকারীদের।
ক্রেডিট রেটিং সংস্থা কেয়ারএজের অক্টোবরের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সামান্য ইতিবাচক পরিস্থিতি থাকার পর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফের বড়ো মাপের টাকা বেরিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় ডিপোজিটরি ও জাতীয় সিকিউরিটিজ ডিপোজিটরির তথ্য বলছে, জুলাই মাসে বিদেশিরা প্রায় ২০ হাজার ২০০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছিলেন। অগাস্টে কিনেছিলেন ২৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকার। কিন্তু সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি বদলে যায়। ওই মাসে তাঁরা তুলে নেন ৩৫ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত হিসাব বলছে, এই মাসে আরও ৫২ হাজার ১০০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট ৩ লক্ষ ১২ হাজার কোটি টাকা বেরিয়ে গিয়েছে দেশীয় বাজার থেকে। গত বছর অঙ্কটা ছিল ১ লক্ষ ৬৬ হাজার কোটি টাকা।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিদেশি মুদ্রা ভাঁড়ারে। রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের গোড়ায় এই ভাণ্ডারে ছিল প্রায় ৭৪ লক্ষ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। ১৬ অক্টোবর তা নেমে এসেছে প্রায় ৬৮ লক্ষ ৭১ হাজার কোটি টাকায়। মাত্র দেড় মাসে প্রায় ৬ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকার পতনের অন্যতম বড়ো কারণ বিদেশি পোর্টফোলিয়ো লগ্নির দেশত্যাগ। কেন এভাবে টাকা তুলছেন বিদেশিরা? বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমত, আমেরিকায় সুদের হার বর্তমানে বেশি। দশ বছরের সরকারি বন্ডে সুদ ৫.৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। সেখানে নিরাপদে বেশি সুদ মেলায় ভারতীয় বাজারে লগ্নিকারীদের আগ্রহ কমছে। দ্বিতীয়ত, ডলার শক্তিশালী হওয়ায় টাকার দাম পড়ছে। টাকা দুর্বল হলে বিদেশিদের মুনাফা কমে যায়। তৃতীয়ত, বিশ্বের লগ্নির স্রোত এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে। এআই নির্ভর লগ্নি বাড়ছে। ভারতে এআই খাতে বড়ো সুযোগ কম। তাই লগ্নি ও রিটার্ন নেই। তাই টাকা চলে যাচ্ছে আমেরিকার বাজারে। সঙ্গে ভারতের শেয়ার বাজারের দামও অকারণে চড়ে আছে বলে মনে করছেন অনেকে। টাকার উপর চাপ সামলাতে রিজার্ভ ব্যাংক গত মাসে রেপো রেট বাড়িয়ে ৫.৫ শতাংশ করেছে। প্রশ্ন হল, এর শেষ কোথায়? বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি লগ্নি ফেরাতে হলে ভারতকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উৎপাদন খাতে বড়ো বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সহজ করতে হবে বিদেশি লগ্নির শর্ত। তবেই মিলবে সুফল।



