শিবাজী চক্রবর্তী, কলকাতা: কাকভোর। কনকনে ঠান্ডায় লেপ, কম্বলে সেঁধিয়ে গোটা গ্রাম। ঠিক তখনই অ্যালার্ম বেজে ওঠে নবকুমারের মোবাইল ফোনে। আলস্য কাটানোর সময় নেই। স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে বিছানা ছাড়ে। গোয়ালে ডাঁই করে রাখা খড়ের আঁটি। নিপুণ হাতে খড় কোঁচানোর পর চটজলদি সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয় নবকুমার। এটাই রুটিন। কিটব্যাগে যত্নে সাজানো বুট, হোস, জার্সি, গ্লাভস। বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রাম শ্রীধরপুর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে মেমারি স্টেশন। প্রথম ট্রেন না পেলেই চিত্তির। প্র্যাকটিসে পৌঁছাতে দেরি হবে। বাঁইবাঁই করে সাইকেল ছোটায় নব। পূবের আকাশ তখন সদ্য ফর্সা হচ্ছে। প্রথম ট্রায়ালেই সন্দীপ নন্দীর নজর কাড়তে সফল শ্রীধরপুরের তরুণ। বাকিটা গল্পের মতো। চলতি বেঙ্গল সুপার লিগে অন্যতম সেরা গোলকিপার বর্ধমান ব্লাস্টার্সের নবকুমার ঘোষ। কোচ সন্দীপ নন্দীর বিশ্লেষণ, ‘নজর রাখুন। ছেলেটা লম্বা রেসের ঘোড়া।’ নব সত্যিই খাটতে জানে। চোয়ালচাপা জীবনসংগ্রাম সেটাই শিখিয়েছে। করোনার সময় পারিবারিক ছানার ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড়। বাজারে দেনা প্রচুর। খেলার টাকায় ধীরে ধীরে লোন মেটাচ্ছে ছেলে।
রুদ্র টুডুর বাবা ভাগচাষী। অন্যের জমিতে ফসল ফলান। অভাবের তাড়নায় কলকাতা মাঠে খেলার স্বপ্ন অকালেই শেষ। টাকা জোগাড় করে অনেক কষ্টে বুট কিনে দিয়েছিলেন ছেলে রুদ্রকে। অফুরন্ত দম, রকেটের গতি ছেলেটার সম্পদ। বেঙ্গল সুপার লিগে নর্থ বেঙ্গল ইউনাইটেডের হয়ে ফুল ফোটাচ্ছে উইং হাফ রুদ্র টুডু। অবসরে ওকে পাবেন হুগলির প্রত্যন্ত গ্রাম দিঘানেশ্বরে। মাটি কোপানো, চাষের কাজ, ধান রোয়ায় ব্যস্ত। চড়া গরমে গাছের ছায়ায় জিরিয়ে নেয় বাপ-বেটা। পেঁয়াজ, লঙ্কা, পান্তাভাতেই পেট ভরানো। বেঙ্গল সুপার লিগ রুদ্রকে দিয়েছে প্রমাণের মঞ্চ। দিঘানেশ্বরের ভাঙা ঘরে রুদ্র টুডুই চাঁদের আলো।
সতীর্থ মিডফিল্ডার সুদীপ হাঁসদাও কম নয়। ঘরোয়া লিগে তৃতীয় ডিভিশনে চ্যাম্পিয়ন পেয়ারাবাগান। সেখানেই নজর কাড়ে সুদীপ। কর্তাদের উদ্যোগেই বেঙ্গল সুপার লিগে যাত্রা। প্রতিভা দেখে সই করাতে দেরি করেনি নর্থ বেঙ্গল। সুদীপের বাবা রাজমিস্ত্রি। খেতে কাজ করেন মা। ছেলে ফুটবলার হোক, এটুকুই চাওয়া। সুদীপের পেয়ে নর্থ বেঙ্গল কোচ বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যের চোখ চকচকে। বললেন, ‘জেলা ফুটবলে সোনার খনি লুকিয়ে। বড় ক্লাবের উচিত মাঠে স্পটার পাঠানো।’