দৃশ্য এক, ২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিট। চাঁদের মাটিতে সফল অবতরণ ভারতীয় চন্দ্রযানের। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে তিনি তখন দক্ষিণ আফ্রিকায়। তাতে কি? চন্দ্রযান-৩ চাঁদের মাটি ছোঁয়ার মিনিট দশেক আগেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরাসরি সম্প্রচার স্ক্রিনে অবতীর্ণ হন। তারপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসতেই চিত্রনাট্য মেনে পর্দাজুড়ে তাঁর মুখ। স্বস্তি ও গর্বের হাসি নিয়ে জাতীয় পতাকা নেড়ে চলেছেন। এমন এক গর্বের দিনে ইসরোর বিজ্ঞানীরা কার্যত পিছনের সারিতে চলে গেলেন! আর বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা বললেন, ‘ভারত নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে মোদির নেতৃত্বে।’ ভারতের মহাকাশ বিজ্ঞানীদের এই সাফল্যকে গেরুয়াবাহিনী যে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের প্রচারে মোদির ‘কৃতিত্ব’ হিসেবে দেখাতে চাইবে, নাড্ডার পর সেদিন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের এক টুইট বার্তায় তা স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সফররত জয়শঙ্করের টুইটে দেখা যায়, জোহানেসবার্গ থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্র হাতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি। কাগজের প্রথম পাতায় শিরোনাম, ‘ইন্ডিয়াজ মোদি আউট অফ দিস ওয়ার্ল্ড।’
দৃশ্য দুই, ২০২৫-এর ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গিদের নির্বিচার হত্যালীলার পর জঙ্গিঘাঁটি ও তাদের মদতদাতা পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে পরপর চারদিন অভিযান চালায় ভারতীয় সেনা। প্রায় একতরফা দাপটের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রতিটি লক্ষ্যস্থল গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর পাকিস্তানের প্রস্তাব মেনে দু’দেশ সংঘর্ষ বিরতি মেনে নেয়। ভারতীয় সেনার এই চোখ ধাঁধানো সাফল্যকে যে চলতি ও আগামী বছরের একাধিক রাজ্য বিধানসভার ভোটে ‘মোদির কৃতিত্ব’ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইবে গেরুয়াবাহিনী, সেই ধারণা ছিল প্রায় সব মহলে। তার প্রমাণও মিলছে প্রতিদিন। ইতিমধ্যে ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’ প্রচার শুরু হয়েছে। কয়েকটি রাজ্যে ‘সাফল্য’ দাবি করে মোদি-শাহের হোর্ডিং দেখা গিয়েছে, দেশজুড়ে ‘তিরঙ্গা’ যাত্রা শুরু করেছে বিজেপি। এখানেই না থেমে এবার মোদির ছবি ও ‘বাণী’ দিয়ে প্রচার শুরু করেছে খোদ কেন্দ্রীয় সরকার। এখন থেকে অনলাইনে রেলের টিকিট কাটলেই মোদির ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন চোখে পড়বে। বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে, মোদির ছবির সঙ্গে ১২ মে দেশবাসীর উদ্দেশে বলা প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার অংশবিশেষ। সেখানে যা লেখা হয়েছে তার মর্মার্থ হল, ‘অপারেশন সিন্দুর’ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক নতুন পদক্ষেপের সূচনা করেছে। একটি নতুন যুগ, নিউ নর্মাল শুরু করা হয়েছে। সরকারি বিজ্ঞাপনে অপারেশন সিন্দুরের সাফল্যকে তুলে ধরতে হলে সেনাবাহিনী, সমরাস্ত্রের ছবি দেওয়া যেত, সংঘর্ষ চলাকালীন সেনাকর্তারা দেশবাসীকে যা বলেছেন, সাফল্য হিসেবে তার অংশ বিশেষ তুলে ধরা যেত। কারণ সেনার সাফল্যে প্রতিটি ভারতবাসী উজ্জীবিত হয়েছে, গর্ব অনুভব করেছে। কিন্তু তা না করে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কেরিয়ার উজ্জ্বল করতে সেখানে সেনার সাফল্যকে সেভাবে প্রচারে না রেখে যেভাবে মোদি ভজনা করা হয়েছে, তাতে রেলকর্তাদের একাংশকে বশংবদ তোষামোদকারী ছাড়া অন্য কিছু ভাবা সম্ভব নয়। ঘটনা হল, ২০১৬ সালে উরির ঘটনার পর সেনা অভিযান কিংবা ২০১৯-এর পুলওয়ামা কাণ্ডের পর বালাকোটে ভারতীয় সেনার সফল অভিযানকেও ভোটের ময়দানে উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রচার হিসেবে কাজে লাগিয়েছে মোদির দল। এবারেও যে তার ব্যতিক্রম হবে না, এখন থেকেই তা বোঝা যাচ্ছে।
আসলে ভারতের যে কোনও সাফল্য বা সরকারি প্রকল্পকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারের কাজে লাগাতে বেপরোয়া পদ্মশিবির। সরকারি অর্থে এমন নির্লজ্জ ব্যক্তি প্রচার অতীতের কোনও প্রধানমন্ত্রীর আমলে দেখতে পাওয়া যায়নি। সরকারের ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ প্রকল্প, সারের বস্তা বা রেশনের প্লাস্টিক ব্যাগ—সবেতেই প্রধানমন্ত্রীর ছবি জ্বলজ্বল করেছে। এমনকী করোনাকালেও ভ্যাকসিনের শংসাপত্রেও প্রধানমন্ত্রীর ছবি নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। কিন্তু কোনও বিতর্ক বা সমালোচনাতেই যে তাঁর কিছু যায় আসে না, অপারেশন সিন্দুর নিয়ে রেলের বিজ্ঞাপনে তাঁর মুখের ছবি সেটাই ফের বুঝিয়ে দিল। অথচ পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার ঘটনা রুখতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ব্যর্থতা নিয়ে তাঁর মুখে কোনও কথা নেই! ঘটনার একমাস পরেও কেন হামলাকারী জঙ্গিরা ধরা পড়ল না, কেন বারবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট সংঘর্ষ বিরতির জন্য কৃতিত্ব দাবি করা সত্ত্বেও তার প্রতিবাদ বা সমালোচনা তিনি করছেন না, কেন সর্বদলীয় বৈঠকে তিনি নিজে অংশ নেননি, বিরোধীদের দাবি মেনে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকছেন না কেন— সেইসব জরুরি ও সঙ্গত প্রশ্নের উত্তরে মৌনতা অবলম্বন করে চলেছেন মোদি! এসব প্রশ্ন উঠছেই। আসলে সাফল্যের দাবিতে তিনি আছেন, জবাবদিহিতে নেই।