ক্লাস থ্রিতে পড়ে সৌমক। একটা সময় পর্যন্ত ভালোই ফল করছিল ক্লাসে। কিন্তু মাস তিনেক ধরেই তার মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করছে। ক্লাসে অন্যমনস্ক থাকে। বাড়িতেও পড়তে বসলেই শুরু হয় নানা বায়নাক্কা। মাঝেমধ্যই আকাশপাতাল ভাবতে থাকে অন্যদিকে তাকিয়ে। ইদানীং ধরেছে ফোনের নেশা। বকে-ধমকে এমনকী বিরক্তিতে মাঝেমধ্যে গায়ে হাত উঠলেও লাভ কিছুই হচ্ছে না।
ক্লাস নাইনের তিথির সমস্যা আবার অন্য। এক বছর বাদেই বোর্ড এগজাম। তিথি ক্লাসে র্যাঙ্ক করে। বোর্ডে ভালো রেজাল্ট করার বাড়তি চাপ আছে। কিন্তু ইদানীং পড়তে বসলেই ওর প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে। খালি মনে হচ্ছে, ভালো রেজাল্ট হয়তো হবে না। তখন বাড়ির লোকজন, স্কুল, আত্মীয় সবাই কী ভাববে! এসব টেনশনেই বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে সে। নানা ভুলভাল চিন্তা ঘিরে ধরছে। ফলে প্রস্তুতিতে খামতি থেকে যাচ্ছে। মনোযোগ কমে যাওয়ার কারণে স্মৃতিশক্তিও ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। জানা ফর্মুলাও গত ইউনিট টেস্টে কিছুতেই মনে করতে পারেনি সে।
উপরের ঘটনাগুলো কাল্পনিক নয়। বরং ঘরে ঘরে উঁকি দিলে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের ক্ষেত্রে এর চেয়েও বড়সড় জটিলতা জানতে পারবেন। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ অমিতাভ মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘মনোযোগের সঙ্গে স্মৃতিশক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। মনঃসংযোগ কমে গেলে বকে-ধমকে তা ফেরত আনা যায় না। বরং মনোযোগ কেন কমছে সেটা খুঁজে বের করে সন্তানকে নির্দিষ্ট রুটিনে ফেলে তার মনকে একাত্ম করতে সহযোগিতা করতে হবে। মনোযোগ বৃদ্ধি পেলে পড়া মনে রাখা অনেক সহজ হবে।’
শিশুর চাঞ্চল্য
কিছু শিশু স্বভাবগতভাবেই চঞ্চল। চাঞ্চল্য শিশুদের সৌন্দর্য। কিন্তু সেই অস্থিরতা যদি তার পড়াশোনা বা যে কোনও আর্ট শিখতে বাধা দেয়, তাহলে তা নিয়ে যত্নবান হতে হবে বাবা-মাকে। অনেকেই চঞ্চলতা দেখলেই শাসন শুরু করেন। কড়া শাসনের ভয়ে শিশু হয়তো একটু স্থির হল, তাকেই নিজেদের ‘সাফল্য’ বলে মনে করেন অনেক অভিভাবক। এতে অনেক সময় লাভও হয়, শিশু মনও বসাতে চেষ্টা করে কিন্তু বাস্তবে ঠিক যে কারণে তার অন্যমনস্কতা, তা গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা যায় না। তাই শাসনের চেয়েও দরকার তাকে বোঝা।
বোঝার উপায়
শিশুকে বোঝার অর্থই তার মনকে বুঝতে চেষ্টা করা। ঠিক কোন ধরনের জিনিস বা ঘটনা তার মনোযোগ বেশি আকর্ষণ করে এটা বুঝলেই তার অন্যমনস্কতার কারণও বোঝা যায়। বাইরের প্রকৃতি, নিছকই একটা মোবাইল ফোন, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময় নাকি অন্য কোনও গল্পের বই বা কার্টুন তার মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, সেটা আগে বুঝতে চেষ্টা করুন। তবেই সমাধান মিলবে।
যে বিষয়টি তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে, পড়ার সময় তা থেকে তাকে দূরে রাখুন। মোবাইল ব্যবহারে ছোট থেকেই রাশ টানুন। নিজেরাও কাজের বাইরে শিশুর সামনে অকারণে মোবাইল ঘাঁটবেন না। অনেক বাবা-মা শিশুকে শান্ত রাখতে ও সহজে খাইয়ে নিতে মোবাইল হাতে ধরিয়ে দেন। এই ভুল একেবারে নয়। মোবাইলের গেমস, রিলস এসব বাস্তবিকই নেশার জিনিস। মানুষের মস্তিষ্ককে উদ্দীপ্ত করে। ফলে তার স্বাদ পেলে সেই আকর্ষণ ভোলা সহজ নয়। তাই প্রথম থেকেই সচেতন হোন। শিশুর মোবাইলের নেশা একান্তই হাতের বাইরে বেরিয়ে গেলে পেশাদার মনোবিদের সাহায্য নিন।
সন্তান যদি পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়ে তাহলে ভুলেও বাইরের বই পড়া বন্ধ করে দেবেন না। বরং এর জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ করুন। ভালোভাবে হোমটাস্ক ও পড়া শেষ করতে পারলে সেইদিন সে বাইরের বই পড়ারও বাড়তি সময় পাবে, সেকথাই বুঝিয়ে বলুন। এমনকী, মাঝেসাঝে পড়াশোনার একটু শৈথিল্য এলেও বাইরের বই পড়া বন্ধ করে দেবেন না। রুটিন ভাগ করে দিন পাঠ্যবই ও সিলেবাসের বাইরের বইয়ের জন্য।
টিভি দেখা বা কার্টুন দেখার লোভ শিশুদের সহজাত। একেবারে বন্ধ করে দিলে ফল হিতে বিপরীত হতে পারে। ঠিক সময়ে পড়া শেষ করলে তবেই কিছুক্ষণ কার্টুন দেখতে পারবে, এই শর্তে বেঁধে দিন। পড়ার সঙ্গে আপস নয়, বোঝাতে হবে।
মনোযোগ বাড়বে কীভাবে?
রুটিন নাহয় হল। বোঝাও গেল কেন শিশুর মনঃসংযোগের অভাব হচ্ছিল, এবার এই সমস্যা কাটাতে কিছু বিষয় খেয়াল রাখুন। অনেক শিশুর অভিভাবক আলাদা করে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির দিকে জোর দেন, কিন্তু মজার বিষয়, মনোযোগ বাড়লেই স্মৃতিশক্তি বাড়ে। তাই মনঃসংযোগই প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত।
মনোযোগের উন্নতি ঘটায় নানা ব্যায়াম ও মেডিটেশন। সন্তানকে ছোট থেকেই সাঁতারে বা যোগাসনে রপ্ত করতে পারেন। এতে স্থিরতা বাড়ে। মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন ক্ষরিত হয় ও মনঃসংযোগ বাড়ে।
শিশুর পড়ার বিষয় ও অধ্যায়ে বৈচিত্র্য আনুন। প্রতিদিন প্রতিটি বিষয় পড়ার জন্য নির্দিষ্ট
রুটিন থাক। দু’টি ভারী বিষয়ের মধ্যে একটি ওর পছন্দের বা হালকা বিষয় রাখতে পারলে ভালো হয়।
প্রত্যেক ৪৫ মিনিট বা ১ ঘণ্টা অন্তর একটা ছোট ব্রেক দিন। নানা গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই গ্যাপই পড়া মনে রাখতে বেশি সাহায্য করে। এই সময় একটু হেঁটে আসা বা বাড়ির অন্য সদস্যের সঙ্গে দুটো কথা বলে আসা এগুলি প্রয়োজন। সেই সময় কিছু পাজল সলভের মতো মজাদার খেলাও খেলতে পারে।
যে বিষয়ে সন্তান একটু পিছিয়ে থাকে, সেই বিষয়ে বেশি জোর দিতে গিয়ে তাকে জোর করে পড়াতে থাকেন অনেকে। এতে লাভ কিছু হয় না। তার চেয়ে সেই বিষয়কে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করুন। নির্দিষ্ট গোল সেট করে সিলেবাস শেষ করান ও পুনর্বার পড়ার (রিভিশন) সুযোগ দিন। যতবার রিভিশন দেওয়া যাবে, পড়া ততই মনে থাকবে।
ইতিহাসের সাল-তারিখ, ভূগোলের ম্যাপ, অঙ্কের ফর্মুলা বড় বড় চার্টে লিখে ঘরের নির্দিষ্ট একটি জায়গায় টাঙিয়ে রাখুন। অহরহ ঘুরতে-ফিরতে জায়গাটি যেন সন্তানের চোখে পড়ে। এতে মনে রাখা সহজ হবে।
শিশুর অবসরে পড়াশোনার কথা তুলবেন না। বরং ওই সময় ওর স্কুল ও বন্ধুদের খোঁজ, নানা মেমরি গেমস, অন্যান্য বই, খেলা, গান ইত্যাদি নিয়ে কথা বলুন।
পড়াশোনার সঙ্গে অবশ্যই আঁকা, নাচ, সাঁতার, গানবাজনা, আবৃত্তি, নাটক ইত্যাদির মধ্যে শিশু যাতে সহজ ও সাবলীল তা শেখান। অনেকে ভাবেন, এতে সময় নষ্ট হয়। আদতে তা নয়। বরং শিল্পকলার চর্চায় মস্তিষ্কের দক্ষতা বাড়ে। ম্যাচিওরিটি তৈরি হয়।
খেলাধুলা করতে দিতেই হবে। মস্তিষ্ককে ক্ষুরধার করে তুলতে চাইলে শারীরিক করসত খুবই প্রয়োজন। মাঠে গিয়ে খেলাই বাঞ্ছনীয়। মাঠ কাছাকাছি না থাকলে স্থানীয় ক্লাবে নিয়ে যান বা এলাকার কোনও জায়গায় আউটডোর গেমস খেলুক। অনেক শিশুর মা-বাবা বাড়িতেই খেলতে বলেন। ওভাবে মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে না। খেলতে হলে মাঠে গিয়ে মুক্ত হাওয়ায় খেলতে হবে।
কিছু সামুদ্রিক মাছ, ব্রাহ্মী শাক, বাদাম, ডার্ক চকোলেট, গোটা শস্য, নানারকম সিড, ডিম, ভিটামিন বি যুক্ত খাবার স্মৃতিশক্তি বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। নানা রকমের মরশুমি ফল ও সব্জি শিশুকে খাওয়ান। এতে তার মস্তিষ্কের ধার বাড়বে।
মনীষা মুখোপাধ্যায়