সুমন তেওয়ারি, চুরুলিয়া: গ্রিনরুম হোক বা অনুষ্ঠান মঞ্চ সর্বত্র অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফুটফুটে ছেলেটা। আর পাঁচটা সাধারণ সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, আট দাগী জেলবন্দি আসামী নৃত্যের মাধ্যমে নজরুলকে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিচ্ছে। পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে পুলিস ও কমব্যাট ফোর্স। সতর্ক নজর রাখছেন কারারক্ষীরা। একে বন্দিদের অনুষ্ঠান তাও আবার হচ্ছে খোদ বিদ্রোহী কবির জন্মভিটে চুরুলিয়ায়। কবির স্ত্রীর নামাঙ্কিত প্রমীলা মঞ্চে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তখন নজরে পড়ল সেই একরত্তি ছেলে পুচুর দস্যিপনা। মা, বাবার হাত ধরে এসেছে, নজরুল মেলায় আনন্দ যেন বাঁধ মানছে না তার। হবে নাই বা কেন, পাঁচ বছর বয়সে প্রথমে মুক্ত আকাশ দেখল সে। বাবা-মা, দু’জনেই আসামী। তাদের সঙ্গেই বর্ধমান কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে ‘বন্দি’ রামকৃষ্ণ দাস ওরফে পুচু। মুক্ত বিহঙ্গের মতো তার এই উড়ে বেড়ানো দেখে অনেকের চোখের জল বাঁধ মানছিল না।
‘কারার ওই লৌহ কপাট, ভেঙে ফেল...’ না কারাগার ভাঙতে হয়নি পুচুকে। তবু কালজয়ী গানের সৃষ্টিকর্তার পরোক্ষ অবদান রয়েছে বইকি। একবারের জন্য হলেও পুচু মুক্ত পরিবেশে খেলে বেড়ানোর সুযোগ পেল। পাঁচ বছরের ছেলেটা জানতই না, কারাগারের বাইরেও একটা সমাজ আছে। আর সেই সমাজে তার প্রথম পদার্পণ হল খোদ নজরুলের স্পর্শ পাওয়া চুরুলিয়ার মাটিতে।
কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে ঘটা করে নজরুল জয়ন্তীতে হচ্ছে সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্বদেশপ্রীতির জন্য নজরুলকে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিক কারাগারের বন্দিরাও চেয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাদের আহ্বানে সাড়া দেয় বর্ধমান কেন্দ্রীয় সংশোধনাগার। খুনের দায়ে বন্দি আট কয়েদিকে এনে নজরুল নৃত্য পরিবেশন করার সিদ্ধান্ত হয়। সেই উপলক্ষে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই নিরাপত্তার কড়াকড়ি। সেখানে গ্রিন রুমে গিয়ে দেখা গেল বন্দি শিল্পীরা মঞ্চে অনুষ্ঠানের জন্য মেকআপ করছে। কারারক্ষীরা তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের উপর নজর রাখছেন। এই প্রথম তাদের নিয়ে বর্ধমানের বাইরে গিয়ে অনুষ্ঠান।
আর এই পরিবেশে একজন যেন সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে। কখনও স্বামীকে খুনের দায়ে বন্দি মনুয়ার সঙ্গে গল্প করছে। আবার কখনও মায়ের পোশাক ঠিক করে দিচ্ছে। কারারক্ষী ‘কাকুদের’ কাছে গিয়ে কখনও আবার আদর খেয়ে আসছে। পুচু জন্ম থেকেই কারাগারে রয়েছে। বীরভূমের দম্পতি বৈশাখী দাস ও উৎপল দাস। উৎপলের বাবাকে খুনের অভিযোগে তারা ২০২০ সালের ২৪ জুন থেকে সিউড়ি জেলে বন্দি হিসাবে রয়েছে। সেই মামলায় পুচুর বাবা-মায়ের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। তাদের আনা হয় বর্ধমান কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে। প্রিজন ভ্যান আর আবদ্ধ কারাগারেই আটকে তাদের জীবন। পারফর্মিং আর্ট থেরাপিস্ট মেহেবুব হাসানের উদ্যোগে বন্দিরা রবীন্দ্র, নজরুল নৃত্য শেখে। বৈশাখী ও উৎপলও সেখানে যোগ দেয়। মায়ের সঙ্গে আসে পুচুও। মেহেবুব হাসান বলেন, পুচু আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। কেউ কোন ভুল স্টেপ করলেই ও তাঁকে ধরিয়ে দেয়। ছোট থেকেই নাচের প্রতি ঝোঁক রয়েছে পুচুর। জেল কন্ট্রোলার কাকলি রায় ঠাকুর বলেন, আমরা চেষ্টা করি জেলের মধ্যেও যতটা ভালো পরিবেশ শিশুটিকে দেওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার চন্দর কোনার, মেলা সম্পাদক সোমনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন, একটি শিশু মুক্ত পরিবেশের স্বাদ পেল এর থেকে বড় সাফল্য কী আছে!