সংবাদদাতা, বিষ্ণুপুর: সেঁদরা উৎসবের আড়াই মাস পর বন্য পশু শিকারের অভিযোগে জয়পুর থানায় এফআইআর দায়ের করল বনদপ্তর। শুধু তাই নয়, হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে পুলিসের তরফেও ওই ঘটনায় পৃথক একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হতেই এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়। এতে আদিবাসী সমাজের কর্মকর্তারা ভীষণ অসন্তুষ্ট। চিরাচরিত প্রথার উপর আঘাত হানা হচ্ছে বলে তাঁরা মন্তব্য করেছেন।
বনদপ্তরের বিষ্ণুপুর পাঞ্চেত ডিভিশনের আধিকারিক রাজু সরকার বলেন, চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল জয়পুরে আদিবাসীদের সেঁদরা উৎসব ছিল। ওইদিন বাইরে থেকে বহু মানুষ জয়পুরের জঙ্গলে এসেছিলেন। তাতে হিউম্যান অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট এলিয়েন্স লিগের তরফে পশু শিকারের ছবি এবং শিকারিদের ব্যবহার করা গাড়ির নম্বর উল্লেখ করে একটি রিপোর্ট পেশ করা হয়েছে। তাতে হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। তার ভিত্তিতেই আমরা জয়পুর থানায় অভিযোগ জানিয়েছি। তবে নির্দিষ্ট কারও নামে এফআইআর করা হয়নি। বিষ্ণুপুরের এসডিপিও সুপ্রকাশ দাস বলেন, জয়পুরে অবৈধভাবে পশু শিকারের অভিযোগে পুলিসের তরফে বনপ্রাণ আইনে পৃথকভাবে একটি মামলা রুজু করা হয়েছে।
বাঁকুড়া জেলার ভারত জাকাত মাঝি পারগানার এক পদাধিকারী শ্যাম মাণ্ডি বলেন, বনদপ্তরের উদাসীনতার জন্য দুষ্কৃতীরা জঙ্গলের গাছ কেটে শেষ করে ফেলছে। সেদিকে কোনও গুরুত্ব নেই। মহামান্য আদালতের নির্দেশকে ঢাল করে আমাদের সমাজের প্রাচীন প্রথার উপর অন্যায়ভাবে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সমাজের অবক্ষয় বাড়বে। সেঁদরার মূল প্রথা অক্ষুণ্ণ রেখে আমরা উৎসবের আঙ্গিক সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছি। বনদপ্তর ও প্রশাসনের সঙ্গে আমরা সম্পূর্ণ সহযোগিতা করে উৎসব করেছি। তা সত্ত্বেও মামলা করা হয়েছে। বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতি বছর প্রাচীন প্রথা মেনে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন জঙ্গলে সেঁদরা উৎসব পালন করেন। অনেকেই ওই উৎসবকে শিকার উৎসব বললেও তাঁরা তা মানতে নারাজ। তাঁদের মতে সেঁদরা মানে অনুসন্ধান। আগেকার দিনে ভেষজ ওষুধ অথবা বনের ফল মূলের খোঁজে মানুষ গভীর জঙ্গলে যেতেন। জঙ্গলে বন্য হিংস্র জন্তুর ভয় থাকে। তাই আত্মরক্ষার জন্য তির-ধনুক সহ অন্যান্য ঘরোয়া সরঞ্জাম নিয়ে যেতেন। সেই পরম্পরা মেনে এখনও প্রতিবছর সেঁদরা উৎসব পালিত হয়। একইভাবে জয়পুর ও লাগোয়া বাসুদেবপুরের জঙ্গলে চলতি বছরের ১৯এপ্রিল ওই উৎসব হয়। তাতে বাঁকুড়া ছাড়াও জঙ্গলমহলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রচুর মানুষ যোগ দেন। ওই উপলক্ষ্যে স্থানীয় নতুনগ্রামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। স্বাস্থ্য শিবিরেরও আয়োজন করা হয়। আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষজনের দাবি, সেঁদরা উৎসবের অঙ্গ হিসেবে তাঁরা জঙ্গলে দল বেঁধে ঢোকেন। কিন্তু, প্রশাসন ও বনদপ্তরের সহযোগিতায় মূল প্রথাকে অক্ষুণ্ণ রেখে উৎসবের আঙ্গিক সম্পূর্ণ বদলে ফেলা হয়েছে। তা সত্ত্বেও সরকারি তরফে মামলা হওয়ায় তাঁরা ভীষণ হতাশ।