শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: নিমেষে তৈরি হয়ে যাচ্ছে নকল ফিঙ্গারপ্রিন্ট। আর তার সাহায্যে সহজেই হাই-সিকিওরিটি এরিয়ায় ঢুকে পড়ছে নায়ক। সিনেমায় হামেশাই দেখা যায় এই দৃশ্য। আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব এই দৃশ্যই প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ঘোর বাস্তব! মাত্র আট থেকে দশ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে আঙুলের ছাপ। তবে সাধারণ নাগরিকদের নয়, পোস্ট অফিসে আধার পরিষেবা কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ডাকসেবকদের একাংশের। ‘সিলিকন মোল্ড কিটে’র সাহায্যে তাদের ফিঙ্গারপ্রিন্ট চলে আসছে বাইরে। সঙ্গে আধার সেন্টারের কোড, কম্পিউটারের আইপি অ্যাড্রেস, ‘ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অব ইন্ডিয়া’ বা ইউআইডিএআই পোর্টালের ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড। সেগুলির সাহায্যে ওয়েবসাইট খুলে বানানো হচ্ছে অনুপ্রবেশকারীদের আধার কার্ড। আর সেই কার্ড মোটেই নকল নয়, একেবারে আসল। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয়ে যাচ্ছেন ‘ভারতীয়’। কারণ সেই আধার দেখিয়ে পরে তৈরি হয়ে যাচ্ছে প্যান, ভোটার কার্ডও। আর জালিয়াতদের কাছে আঙুলের ছাপ বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা পকেটে ভরছে ডাকসেবকদের একাংশ। আধার সেন্টারের কর্মীদের অনেকেও জড়িয়ে এই চক্রে। সম্প্রতি জাল আধারকাণ্ডে পুলিস গ্রেপ্তার করেছে উত্তর দিনাজপুরের ডাকবিভাগের চুক্তিভিত্তিক কর্মী বিধান মুর্মুকে। সেই ডাকসেবককে জেরা করেই সামনে এসেছে বিস্ফোরক এই তথ্য!
গত এপ্রিলেই উত্তরপ্রদেশের আমরোহায় পর্দাফাঁস হয়েছে ভুয়ো আধার কার্ড তৈরির চক্রের। সেই প্রথম পুলিস জানতে পারে, ইউআইডিএআই পোর্টালের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে আধার তৈরি হচ্ছে। আর সেটা ওই সাইটে ঢুকেই। মাত্র চারমাসের ব্যবধানে বাংলাতেও হদিশ মিলল এই কায়দায় অনুপ্রবেশকারীদের আধার তৈরির চক্রের। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে জাল নথি তৈরির অভিযোগে বীরভূম থেকে দু’জনকে গ্রেপ্তার করে রাজ্য পুলিস। তাদের জেরা করেই খোঁজ মেলে উত্তর দিনাজপুরের একটি পোস্ট অফিসের ডাকসেবক বিধানের। প্রথমে তদন্তকারীরা ভেবেছিলেন, এই ডাকসেবকই জাল নথি দাখিল করে ভুয়ো আধার তৈরি করছে। কিন্তু বিধানকে চাপ দিতেই জানা যায় সত্যিটা! ভুয়ো নথি তৈরি চক্রের পান্ডারা বাইরে বসেই একাজ করছে। তবে সব আধার আসল। ইউআইডিএআই পোর্টালে ঢুকে এগুলি তৈরি করেছে জালিয়াতরা।
ওই ডাকসেবক স্বীকার করেছেন, সংশ্লিষ্ট আধার সেন্টারের ইউজার আইডি, পাসওয়ার্ড এবং নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্ট টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছেন। সেগুলি হাতিয়ার করে পোর্টালের অ্যাক্সেস নিয়ে সব নথি তৈরি করেছে জাল নথি তৈরিতে জড়িতরা। সিলিকন মোল্ড পদ্ধতিতেই তারা সংগ্রহ করেছে বিধানের আঙুলের ছাপ। সিলিকনের ছাপে ফেলা ফিঙ্গারপ্রিন্ট ফেলা হচ্ছে স্ক্যানারে। এমনকী, ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) কাজে লাগিয়ে কম্পিউটারের লোকেশন পর্যন্ত এক রাখা হয়েছে। ফলে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বসে তারা জালিয়াতি চালালেও আইপি অ্যাড্রেস এক থাকায় ইউআইডিএআই কর্তৃপক্ষের কাছে তা ধরা পড়েনি। পুলিস সূত্রে খবর, রাজ্যজুড়ে পোস্ট অফিসে চলা আধার সেন্টারে কর্মরত ডাকসেবকদের অনেকে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত। নিজের আঙুলের ছাপ পিছু কোথাও ৮ হাজার আবার কোথাও ১০ হাজার টাকা নিচ্ছে তারা।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন গোয়েন্দারা। ডাকসেবকদের কারা কারা এই কাজে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি এভাবে কত আধার তৈরি হয়েছে সেই পরিসংখ্যানও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইউআইডিএআই পোর্টালকে সুরক্ষিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো বলেও নবান্ন সূত্রে খবর।