সংবাদদাতা, কাটোয়া: বাবা-মা মোবাইলে সময় বেশি দিচ্ছেন। নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। ছেলেমেয়েদের সময় কম দিচ্ছেন। সেই প্রভাব পড়ছে তাঁদের সন্তানদের উপরেও। ব্যস্ততার যুগে নানা কারণে শৈশব ভুগছে মানসিক অবসাদে। এদিকে স্কুলে বাড়ছে ড্রপআউট। মনের মতো বন্ধু না পেয়ে রিলসে আসক্ত হচ্ছে খুদে পড়ুয়ারাও।
তাই শিশু মনে মেঘ জমার কারণ খুঁজতে এবার পদক্ষেপ নিল কাটোয়া পশ্চিম চক্রের শিক্ষাদপ্তর। প্রতিটি হাইস্কুলেই চালু করা হচ্ছে ‘মনের ঠিকানা’ ড্রপবক্স। সেখানেই স্কুল পড়ুয়ারা গোপনে তাদের মনের কথা, উদ্বেগ বা যেকোনও মানসিক সমস্যা চিঠির আকারে জানাতে পারবে স্কুলকে। প্রয়োজনে করা হবে কাউন্সেলিং।
নানা কারণে বয়ঃসন্ধিকালীন অবস্থায় মানসিক অবসাদে ভোগার প্রবণতা এখন বাড়ছে। কোনও শারীরিক বা আবেগজনিত জোরালো আঘাত বা পরিবারের প্রিয়জনের কাছ থেকে হেনস্তার কারণে শিশুমনে অবসাদ আসছে। বহুক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বাবা ও মা দু’জনেই চাকুরিজীবী। পরিবারের সঙ্গে সময় কম কাটছে তাঁদের। মনের কষ্ট খুলে বলার কেউ নেই শিশুদের। সংসারের দারিদ্র্যও শিশুর মনের উপর চাপ ফেলছে। সেখান থেকেই স্কুলে ড্রপ আউটের সংখ্যা বাড়ছিল। কাটোয়া ড্রপ আউট বন্ধ করতে বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা করেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। সেখান থেকেই তাঁরা এমন সব তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
মোবাইল আসক্তি থেকেও অবসাদ আসছে। তাতে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে, পরীক্ষায় ফল খারাপ হচ্ছে। বাবা-মাকে ভয়ে অনেক মনের কথা তারা খুলে বলতে পারছে না। সেই কারণে কাটোয়ার পশ্চিম চক্রের প্রতিটি হাইস্কুলে ‘মনের ঠিকানা’ নামে ড্রপবক্স চালু করছে শিক্ষাদপ্তর। কাটোয়ার কাশীশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ে প্রথম ড্রপবক্স বসানো হয়েছে। এরপর বাকি স্কুলগুলিতেও তা বসানো হবে।
কাটোয়া পশ্চিম চক্রের স্কুল পরিদর্শক ফ্যান্সি মুখোপাধ্যায় বলেন, নানা কারণে কিশোর বয়সেই মানসিক অবসাদ আসছে। সেখান থেকে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। পড়াশুনা থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে তারা। তাতে স্কুলে ড্রপ আউটের সংখ্যা বাড়ছে। আমরা পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলে অবসাদের বিষয়ে জানতে পারি। তাই তাদের মনের কথা বুঝতে ‘মনের ঠিকানা’ ড্রপবক্স চালু করা হল। প্রতিটি স্কুলেই সেটা বসানো হবে। পড়ুয়াদের প্রয়োজনমতো কাউন্সেলিং করানো হবে।
সম্প্রতি কাটোয়া পশ্চিম চক্রের অধীনে থাকা নবম-দশম শ্রেণির ৫১ জন পড়ুয়াকে স্কুলে ফেরানো হয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ২৫-৩০ জন মেয়ে রয়েছে। পরিবারের আর্থিক কষ্টের জন্য বেশ কিছু নাবালক মানসিক অবসাদ নিয়ে কেরল, বেঙ্গালুরুতে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে পাড়ি দিয়েছিল। এদের সবাইকে আবার স্কুলমুখী করা গিয়েছে।
কাশীশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা টিউলিপ দাস নন্দী বলেন, পড়ুয়াদের মানসিক অবসাদে কমাতেই ড্রপবক্স চালু করা হয়েছে৷ এই ড্রপবক্স আমাদের ওদের মনের কথা বুঝতে সাহায্য করবে।
শিশু মনে জমে থাকা উদ্বেগ কিংবা দুঃখ, মোবাইল ও রিলসে আসক্তি— এ সবই শৈশব কাড়ছে। তাদের মানসিক জগতে তৈরি করছে এক অদৃশ্য ঝড়। সেই ঝড় থামিয়ে ওদের মনকে শান্ত করতেই ‘মনের ঠিকানা’ চালু করা হল। -নিজস্ব চিত্র