বিহারের বিধানসভা ভোটের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষায় এনডিএ জোটের সঙ্গে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিলেও মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে নীতীশকুমারকে অনেকটা পিছনে ফেলে দিয়েছেন লালুপুত্র তেজস্বী যাদব। এটা চিরসত্য যে, অনেকক্ষেত্রেই জনমত সমীক্ষার অনুমান মেলে না। সেই সম্ভাবনা বিহারের ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে। কিন্তু যা নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই তা হল, তেজস্বী যাদবের নাম মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করে মোদি-নীতীশের এনডিএ জোটকে প্রথম গোলটা দিয়ে দিয়েছে বিরোধীরা। এনডিএ জোট এখনও পর্যন্ত (এই লেখা পর্যন্ত) মুখ্যমন্ত্রী পদে তাদের কোনও প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। ৬ নভেম্বর প্রথম দফার ভোটের আগে কোনও নাম ঘোষণা হবে— এমন সম্ভাবনাও কম। এমন নয় যে ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা না করলে সেই দল বা জোটের নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা কমে যায় বা থাকে না। বরং ভোটের জেতার পর নাম ঠিক হয়েছে, এদেশে এমন নজির অনেক। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে, কোনও মুখ সামনে রেখে ভোটের লড়াইয়ে গেলে অন্তত একশ্রেণির ভোটারের মধ্যে তার প্রভাব পড়ে। অনেক অবাঞ্ছিত প্রশ্নের মোকাবিলা সহজ হয়, কোনও ধোঁয়াশাও থাকে না। বঙ্গে বাম আমলে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা তৃণমূল জমানায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমে বামফ্রন্ট কিংবা তৃণমূল বাড়তি সুবিধা পেয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ। বিহারের বিরোধী জোট মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তেজস্বীর নাম আগে ঘোষণা করে এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে এগিয়ে থাকার প্রচার করবে সন্দেহ নেই।
আর এখানেই শুধু পিছিয়ে থাকা নয়, আর এক ঘোর সংকটের মুখে পড়েছে শাসক জোট। এনডিএ-র প্রধান শরিফ জেডিইউ নেতা নীতীশকুমার কুড়ি বছরের বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। এবার শেষবারের মতো ভোটে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার বড়ো সাধের কথা নিজেই জানিয়েছিলেন নীতীশ। নেতার কর্মী-সমর্থকরাও তাই চেয়েছিলেন। কিন্তু বিজেপির এতে ঘোর আপত্তি। দলের দুই শীর্ষ মাথা নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিহারে নীতীশকুমারের নেতৃত্বে এনডিএ ভোটের লড়াইয়ে নামলেও মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঠিক হবে ফলাফল ঘোষণার পরেই। মুখে না বললেও এতে চটেছেন নীতীশ। ক্ষুব্ধ জেডিইউ সমর্থকরা নাকি বিজেপি প্রার্থীদের ভোট না দেওয়ার কথাও ভাবছেন। আবার বিজেপি সমর্থকেরাও নীতীশের দলের প্রার্থীদের জেতাতে কতটা সক্রিয় হবে— তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, এ হল ‘মহারাষ্ট্র মডেল।’ সে রাজ্যে একনাথ সিন্ধেকে সামনে রেখে এনডিএ ভোটে গেলেও ফলাফল ঘোষণার পর বিজেপি-র দেবেন্দ্র ফড়নবিশকে মুখ্যমন্ত্রী করে দেওয়া হয়। বিহারের ক্ষেত্রেও মোদি-শাহের সেই কৌশল দেখছেন অনেকে। তেমনটা হলে নীতীশ হবেন বিহারের ‘একনাথ সিন্ধে।’ অতএব মুখ্যমন্ত্রী নাম নিয়ে এনডিএ জোটের প্রধান দুই শরিকের ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। তেজস্বীর নাম ঘোষণা সেই লড়াইয়ে যেন ঘি ঢেলেছে।
অথচ বিহারে ভোটে জেতাটা বিজেপির কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সে রাজ্যের জন্য নয়, পশ্চিমবঙ্গের জন্যও। সব নিয়ম নেমে চললে পশ্চিমবঙ্গে এপ্রিল মাসের মধ্যে ভোট শেষ করতে হবে। তার মানে, হাতে আর ছ’মাস সময়। এমনিতে এ রাজ্যে বিজেপির নাম সকলে জানে, তাঁদের কিছু ভোটও আছে। কিন্তু রাজ্যের অর্ধেক বুথ এলাকার সংগঠন বলে তাদের কিছু নেই। দলের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্বের কথাবার্তা, চিন্তাভাবনার মধ্যে বিস্তর ফারাক। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, দলীয় কোন্দল, নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব যে কোনও শাসক দলকেও লজ্জা দেবে। তার উপর রাজ্যের একাংশের মানুষের মধ্যে বিজেপির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। বিশেষত বিজেপির সর্বভারতীয় নেতৃত্ব আদৌ এ রাজ্য নিয়ে ভাবিত কি না সেই প্রশ্ন উঠেছে। গত দেড়-দুই দশক ধরে সিবিআই-ইডির একের পর এক তদন্ত কোনও রহস্যে অন্ধকারে হারিয়ে যায়, সেই প্রশ্নেও বিজেপি নেতৃত্বের ক্ষমতা দখলের সদিচ্ছা নিয়ে সংশয় জাগিয়েছে। এই প্রেক্ষিতে বিহার রাজ্য হাতছাড়া হলে বঙ্গের বিজেপি নেতারা যে মুখ দেখানোর জায়গা পাবেন না তা বলাই যায়। এমনিতেই বাংলাকে কেন্দ্রীয় বঞ্চনার বিষয়ে তাঁদের বলার মতো কোনও সন্তোষজনক উত্তর নেই। অতএব বিহার শুধু একটি রাজ্যের মসনদ দখল নয়, বিজেপি নেতৃত্বের কাছে ‘অ্যাসিড টেস্ট’। দেখা যাক, বিহারের সংশোধিত ভোটার তালিকা এবং ধর্ম ও বিভাজনের রাজনীতির প্রচারে ভর করে মোদি-শাহরা বাজিমাত করতে পারেন কি না।