Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ফিফা সভাপতির ট্রাম্প-প্রীতি!

প্রায় সাত বছর আগের কথা। ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন প্রথম মেয়াদে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে হাজির জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

ফিফা সভাপতির ট্রাম্প-প্রীতি!
  • ২৮ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: প্রায় সাত বছর আগের কথা। ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন প্রথম মেয়াদে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে হাজির জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। সেদিন ট্রাম্পকে ফুটবলের লাল ও হলুদ কার্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ফিফা প্রেসিডেন্ট। ইনফান্তিনো তত দিনে ফিফা প্রেসিডেন্ট হলেও আন্তর্জাতিকভাবে তেমন পরিচিতি পাননি।

Advertisement

২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব আমেরিকার পাওয়ার পিছনে ইনফান্তিনো যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, প্রকাশ্যে তার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন ট্রাম্প। তবে এই বলে অনুযোগও করেছিলেন, আমেরিকায় যখন বিশ্বকাপ আয়োজিত হবে, তখন তিনি হয়তো প্রেসিডেন্ট অফিসে থাকবেন না। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের লগ্নে ট্রাম্প যদি প্রেসিডেন্ট না থাকেন, তাহলে হোয়াইট হাউসকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যমের কাজ কী হবে? উত্তরে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘খুব বিরক্তিকর। ওদের হয়তো কোনও কাজই থাকবে না।’ ট্রাম্পের এই কথাগুলির ফাঁকেই ইনফান্তিনো তাঁর কাজ সেরে নেওয়ার চেষ্টা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে আসা লাল ও হলুদ কার্ড দেখিয়ে ফিফা সভাপতি বলেন, ‘হলুদ কার্ড হল 
সতর্ক করে দেওয়ার জন্য। আর যখন আপনি কাউকে বের করে দিতে চাইবেন... এভাবে’— বলে লাল কার্ড উঁচিয়ে ধরেন ইনফান্তিনো। বেশ মজাই পেয়েছিলেন ট্রাম্প। ইনফান্তিনোর হাত থেকে লাল কার্ডটি নিয়ে তিনি সেটা উপস্থিত সাংবাদিকদের দেখান। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের সঙ্গে সেই বৈঠক থেকে একটি বিষয় শিখে নিয়েছিলেন ইনফান্তিনো— ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে এবং জনসমক্ষে কীভাবে সামলাতে হয়। সেই কৌশল এখনও কাজে লাগাচ্ছেন ফিফা সভাপতি।
ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত সুইস আইনজীবী জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর আন্তর্জাতিক ফুটবলে উত্থান এক অসাধারণ গল্প। নিজেও জানেন, তাঁর ভিত তৈরি হয়েছে ট্রাম্পের পৃষ্ঠপোষকতায়। আমেরিকায় দু’টি বিশ্বকাপ আয়োজন এবং সৌদি আরবকে ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব দেওয়ার মাধ্যমে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মহম্মদ বিন সলমনের বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব পাওয়ার পথটা ট্রাম্পই সুগম করে দিয়েছেন বলে জল্পনা। দু’জনের সাক্ষাৎ হয় ২০২০ সালে সুইজারল্যান্ডে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামেও। ওই সময় ইনফান্তিনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশংসা করলে জবাবে ইনফান্তিনোকে ‘গ্রেট ফ্রেন্ড’ বলে অভিহিত করেন ট্রাম্প। সুইস সাংবাদিকরা ইনফান্তিনোর নাম দিয়েছেন ‘সূর্য রাজা’— ফ্রান্সের দাম্ভিক রাজা চতুর্দশ লুই-এর মতো। নতুন ক্লাব বিশ্বকাপ ট্রফিতে তাঁর নাম খোদাই করা হয়েছে (দু’বার!)। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ক্যামেরাবন্দি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হয়। এই প্রসঙ্গে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার সেফেরিন একদিন ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘কোনও ফুটবল প্রশাসকেরই ভাবা উচিত নয় যে, আমরাই খেলার নায়ক।’
অথচ, এক দশক আগেও ইনফান্তিনো ছিলেন উয়েফার এক নিরীহ আইনজীবী। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ড্রয়ে গৎবাঁধা বক্তৃতা দেওয়া লোক। ২০১৫-এ সেপ ব্লাটারের পতনের সময় কেউ ভাবেইনি এই মানুষটিই ফিফার হাল ধরবেন। উয়েফার সহকর্মীরা আজও অবাক। তাঁদের ভাষায়, ‘২০১৬-তে ক্ষমতায় এসে ইনফান্তিনো আমূল বদলে গিয়েছেন। এই রূপান্তরিত মানুষটাকে চিনতে পারছি না।’ ফিফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর জয়ের মূল হাতিয়ার ছিল আর্থিক টোপ। বলেছিলেন, ‘ফিফার টাকা তোমাদের টাকা!’ প্রতিটি সদস্য দেশকে ৪ বছরে ৫০ লাখ ডলার দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। এই টাকা আসবে কোথা থেকে? বিশ্বকাপের দল বাড়িয়ে (৪০ থেকে ৪৮) টেলিভিশন রাইটসের দাম চড়িয়ে। অনেকে ধারণা, ইনফান্তিনোর হাত ধরে ফিফার রাজস্ব চার বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে (২০১৮-এর দ্বিগুণ!)। যদিও সুইস আইন বিশেষজ্ঞ মার্ক পিথের অভিযোগ: ইনফান্তিনো ফিফার সংস্কার চাননি। নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করেছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনে ট্রাম্পের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সাহায্য পেয়েছেন ইনফান্তিনো। এমনকী তাঁর ব্যক্তিগত প্রজেক্টেও। ৩২ দলের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েছেন। অভিযোগ, এই ক্লাব বিশ্বকাপ আসলে উয়েফা ও ইউরোপিয়ান লিগগুলির সূচি এলোমেলো করে দিয়েছে। এই টুর্নামেন্ট কতজন দেখছেন, কতজন স্ট্রিম করছেন, সেসব অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইনফান্তিনো বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর দু’জন মানুষের সঙ্গে নিজের ক্ষমতা একীভূত করতে পেরেছেন, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বকাপ নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছেন। টিফানি অ্যান্ড কোম্পানির ডিজাইন করা ক্লাব বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে পোজ দিয়েছেন। ইনফান্তিনোর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। আর ক্রাউন প্রিন্স বিন সলমন করেছেন আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তিনি গোটা আয়োজনের খরচ মিটিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, ইনফান্তিনো এত দূর আসতে পারলেন কীভাবে?
১০ বছর আগে ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারের দুর্নীতির জঞ্জাল থেকে উত্থান ইনফান্তিনোর। উয়েফার প্রাক্তন সভাপতি মিশেল প্লাতিনি ছিলেন তাঁর ‘বস’। তিনি ফিফার সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হন বিখ্যাত ‘ফিফা ২.০’ স্লোগান তুলে— ফিফাকে অতীতের সব দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। যদিও এখনও তাঁর নাম রয়েছে ‘পানামা পেপার্স’ কেলেঙ্কারিতে!
২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব নিশ্চিত হয়েছিল ২০১০ সালের ভোটাভুটিতে। তখন ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রার্থী হলেও আমেরিকার স্বপ্নপূরণ হয়নি। আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন এবং জুরিখের সেই ভোটাভুটিতে তিনিও উপস্থিত ছিলেন, যেখানে প্রথম রাউন্ডে ফিফার কার্যনির্বাহী কমিটির মাত্র তিনটি ভোট পেয়েছিল আমেরিকা। পাঁচ বছর পর কী দেখা গেল?
২০১৫ সালের ২৭ মে জুরিখের এক হোটেল থেকে ফিফার কর্তাদের গ্রেপ্তার করে সুইস পুলিস। সেটা ছিল এফবিআইয়ের ফিফার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযানের অংশ। এর ফলে ফিফা প্রেসিডেন্ট ব্লাটারের কোমর ভেঙে যায়। সেই ঘটনার পর ফিফা বিল ক্লিনটনের কাছে মাথা নত করে এবং ‘ফিফা ২.০’ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর অংশ ছিলেন ক্লিনটনের কয়েকজন প্রাক্তন উপদেষ্টা। সেই বছরই ভোটের মাধ্যমে ফিফার সংস্কার কমিটিতে জায়গা পান ইনফান্তিনো এবং পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে ফিফার সভাপতি। আট মাস পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট 
নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে ক্ষমতাসীন হন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশকে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল ইনফান্তিনোর। ফিফা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তাঁর জমানায় প্রথম বিশ্বকাপ। বড় বড় বাণিজ্যিক চুক্তি ও আন্তর্জাতিক বড় বড় ব্র্যান্ডগুলিকে ফিফায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন ছিল ইনফান্তিনোর। ফলে ফিফা কংগ্রেসে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে মরক্কোর দ্বিগুণ ভোট পায় আমেরিকা। ট্রাম্পের ইচ্ছাপূরণ করেন ইনফান্তিনো। ট্রাম্প নিজেও সেটা চেয়েছেন। কারণ, ট্রাম্পের কনিষ্ঠ পুত্র ব্যারনের ফুটবল অন্ত প্রাণ। 
ট্রাম্পের আরও কাছে যাওয়া এবং তাঁর ব্যক্তিগত বলয়ে ঢোকার কোনও সুযোগ নষ্ট করেননি ইনফান্তিনো। এমনকী ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য সফরে বেশি সময় কাটানোর কারণে প্যারাগুয়েতে নিজের অনুষ্ঠান ফিফা কংগ্রেসেও সময়মতো উপস্থিত হতে পারেননি। ওভাল অফিসে দাঁড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘ইনফান্তিনো তো যেন ক্রিসমাসের সকালে ঘুম ভেঙে গাছের নীচে খেলনা দেখে মেতে ওঠা এক শিশু! এই উচ্ছ্বাস দেখে মুগ্ধ হতে হয়।’ কেউ কেউ বলেছেন, আগামী কয়েক মাসের জন্য ফিফা আসলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ‘প্রেমবন্ধনে’ আবদ্ধ। ট্রাম্প তাঁর শক্তিশালী মিত্র।
২০২৬ বিশ্বকাপে কোনও স্থানীয় আয়োজক কমিটি নেই, যেটা ১৯৯৪-এর আমেরিকা বিশ্বকাপে ছিল। ২০২৪ সালে ফ্লোরিডার মায়ামিতে একটি অফিস খুলেছে ফিফা। ফুটবলের নিয়ন্ত্রক এই সংস্থার আইনি বিভাগ মায়ামিতে কাজ করছে। নিউ ইয়র্কে ট্রাম্প টাওয়ারেও অফিস খুলে ফেলেছে ফিফা। তবে ট্রাম্প টাওয়ারের সঙ্গে ফিফার অস্বস্তিকর স্মৃতিও আছে। ফিফার প্রাক্তন কর্তা ও আমেরিকার প্রয়াত ফুটবল প্রশাসক চাক ব্লেজার এই ভবনেই থাকতেন। এক দশক আগে মার্কিন প্রশাসনের তথ্যদাতা হিসেবে তাঁর সাক্ষীতে ফিফায় দুর্নীতির সব খবর বেরিয়ে পড়েছিল এবং পতন হয়েছিল ইনফান্তিনোর পূর্বসূরি সেপ ব্ল্যাটারের। ৫৮ তলার এই ভবনে দু’টি অ্যাপার্টমেন্ট ছিল ব্লেজারের। একটিতে তিনি থাকতেন, অন্যটিতে তাঁর পোষা বিড়ালের দল। ফিফায় দুর্নীতিতে জড়ানো শুধু ব্লেজারই নন, ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) প্রাক্তন প্রধান হোসে মারিয়া মারিনের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির তদন্তে তাঁকে এই ভবনে নজরবন্দি করে রাখা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিক জানিয়েছে, ফিফার ১২১ বছরের ইতিহাসে জুরিখ ছাড়া আর কোথাও অফিস গড়ার প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু ইনফান্তিনো সভাপতি হয়ে আসার পর আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ফিফা অফিস খুলেছেন। কেন? এর উত্তর এখনও মেলেনি!
আগামী ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক আমেরিকা, মেক্সিকো এবং কানাডা। ডোনাল্ড ট্র্যাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রতিবেশী দু’দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। বিদেশি পণ্যের উপর চড়া শুল্ক বসিয়েছেন ট্রাম্প। তবে এ জন্য বিশ্বকাপ আয়োজনে সমস্যা হবে বলে মনে করেন না তিনি। বরং তাঁর দাবি, শুল্কযুদ্ধ ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। সত্যিই কি তাই? ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম মূলমন্ত্র ‘বিশ্বকে একসুতায় গাঁথা’। তার উপর ২০২৬ সালেই প্রথম ৪৮টি দেশ বিশ্বকাপে অংশ নেবে, যা আগের যেকোনও আসরের চেয়ে অংশগ্রহণকারী ও ম্যাচের সংখ্যা বিবেচনায় সবচেয়ে বড়। অথচ, ট্রাম্পের আমেরিকার একা চলা আর বিদেশিমুক্ত নীতি ফিফা বিশ্বকাপের মূলমন্ত্রের পুরোপুরি বিপরীতমুখী। এই নীতিগত সংঘাত নিয়ে আগামী কয়েক মাস ফিফা কোন পথে এগবে, সেটা আসলে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর নির্ভর করছে।
সেই সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে নিউ ইয়র্ক টাইমসের ক্রীড়া সংবাদসংস্থা দ্য অ্যাথলেটিক প্রশ্ন তুলেছে, ইনফান্তিনো কি সত্যিই ফুটবল-পাগল শিশু? নাকি সংস্কারের মুখোশ পরে ফিফাকে আবারও রাজনীতির খেলার গুটি বানাচ্ছেন?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ