নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি। শারদীয়ার মরশুমে অমিতাভ বুদ্ধতেই শরণ নিয়েছেন হুগলির একাধিক পুজো উদ্যোক্তা। প্রায় অপরিচিত বৌদ্ধধর্মের একাধিক মোটিফ থেকে ধ্যানরত বুদ্ধের আদলের মূর্তি গড়ে চমকের চাকচিক্য তৈরি করা হয়েছে। আছে বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম কেন্দ্রিক নানা বিষয়ের অবতারণা। যা মণ্ডপ থেকে প্রতিমাসজ্জার সৌন্দর্যকে বাড়িয়েছে যেমন, তেমনই নানা বৈশিষ্ট্য আমদানি করেছে। হুগলির শ্রীরামপুর ও উত্তরপাড়ার দু’টি বিগ বাজেটের পুজো কমিটি এভাবেই থিম সাজিয়েছে।
উত্তরপাড়ার মাখলার বন্ধুমহল ক্লাবের এবারের আয়োজন ‘বুদ্ধ-যাপন’। মণ্ডপ থেকে প্রতিমাসজ্জা এমনকী, আলোকসজ্জাও বুদ্ধময়। থাকছে বৌদ্ধ মুদ্রা থেকে যন্ত্রের ব্যবহার। অনবদ্য প্রতিমাসজ্জাও হাজির করেছেন উদ্যোক্তারা। মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে বুদ্ধদেবের ধ্যান, অভয়, বরদ, ভূমিস্পর্শ, ব্যাখ্যান, বজ্রহুংকার সহ নানা মুদ্রা। রয়েছেন স্বয়ং অমিতাভ বুদ্ধ, দণ্ডায়মান। বৌদ্ধগুম্ফার আদলে বাতিস্তম্ভ আছে। দেওয়ালে আছে বৌদ্ধজাতকের নানা চিত্র। তবে সবচেয়ে চমকদার দেবী প্রতিমার গঠন। মাটি দিয়ে তৈরি দেবী এখানে কৃষ্ণ ও শ্বেত দু’রকম রংয়ে সেজেছেন। প্রতিমা নির্মাণে বৌদ্ধমূর্তি শিল্পের ছাঁচ অনুসরণ করা হয়েছে। দেবী দুর্গার দৈহিক ভঙ্গিমা বা ঠাম-এ দেখা যাবে গান্ধার শিল্পকলা। দ্বিভঙ্গ ও অতিভঙ্গ ঠামের সঙ্গে ললিতাসন ভঙ্গিমার মেলবন্ধনে এক অপরূপ মূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে। মণ্ডপসজ্জার সঙ্গে প্রতিমা ও আলোকসজ্জার মিলিত তান এক অনিন্দ্য সুর তুলেছে। পুজো উদ্যোক্তা অনুপ রায় বলেন, দর্শকদের মাতিয়ে দিতে চেষ্টার ত্রুটি করা হয়নি। নিবিড় সুন্দরের নির্মাণে যাবতীয় প্রয়াস করা হয়েছে।
বন্ধুমহল যেখানে বুদ্ধকে সরাসরি ধরেছে, সেখানে শ্রীরামপুরের ৮-এর পল্লি বুদ্ধকে ধরেছে দার্শনিক চৈতন্যে। তাদের থিম, ‘অন্তরায়ে অন্তর্জ্ঞান’। বৌদ্ধ দর্শনে যে বোধ থেকে বোধিপ্রাপ্তির পর বোধিসত্ত্ব হওয়ার পথ দেখানো হয়েছে, সেই পথের অনুসরণেই থিমের চলন। তাতে ছোঁয়াচ থাকছে বৃহস্পতি থেকে চার্বাকের মতো হিন্দু দর্শনেরও। গতিমত চেতনার মধ্যে লুকিয়ে থাকে শয়তান, বিপথে চালিত করে। আত্মবোধ উন্মোচনেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়। অন্তরশায়িত শয়তানকে পরাস্ত করতে সাহায্য করে বৌদ্ধধর্মের ড্রাগন। এই ভাবের বিকাশে মণ্ডপসজ্জায় এসেছে ঘোড়া, রাক্ষস, গুচ্ছগুচ্ছ ড্রাগন এবং বোধিসত্ত্ব। মণ্ডপসজ্জার অন্দর, বাহিরে সেসবেরই নানা রূপ দেখা যাবে। এখানেও বৌদ্ধধর্মের নানা মোটিফ, বিভিন্ন বৌদ্ধযন্ত্র, গুম্ফার আদল ও আলোকসজ্জায় তার প্রতিফলন দেখা যাবে। আছে প্রতিমা নির্মাণে বিশিষ্ট শৈলী আনার চেষ্টা। বৌদ্ধধর্মে পদ্মের বিশেষ ভূমিকা আছে। শান্ত, সৌম্য, ধ্যানাসনে আছেন সপরিবারে দুর্গা। পদ্মাসনে সকলেই অর্ধধ্যানস্থ। হাতে কোনও অস্ত্র নেই, আছে পদ্মের বাহারি সজ্জা। পুজো উদ্যোক্তা সুমন্ত আশ বলেন, সবটাই বোধ ও বোধির সুরে বাঁধা হয়েছে।
কারও থিম সরাসরি বুদ্ধআশ্রিত, অন্যজন ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে বৌদ্ধ আঙ্গিকের মেলবদ্ধন ঘটিয়ে ভিন্ন ভাব তৈরি করেছে। ভাব বা ভঙ্গি যাই হোক, মনোমুগ্ধকর হয়েছে আয়োজন। এখন শুধু দর্শকের করতালির অপেক্ষায় কান পাতছেন আয়োজকরা।