আগামী শুক্রবার দোলযাত্রা। এবার রঙের উৎসব কীভাবে কাটাবে জানাল বরানগর রাজকুমারী মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুলের ছাত্রীরা। সেইসঙ্গে ছবিও আঁকল তারা।
আগামী শুক্রবার দোলযাত্রা। এবার রঙের উৎসব কীভাবে কাটাবে জানাল বরানগর রাজকুমারী মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুলের ছাত্রীরা। সেইসঙ্গে ছবিও আঁকল তারা।
বেলুন ছোড়া
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। আর এই উৎসবের জন্যই থাকি অপেক্ষা করে। দোল। সে তো রঙের উৎসব। দিগ-দিগন্তে ফুলের শোভায় মুখরিত বনানী। তার মধ্যেই নিজেরা রঙিন হয়ে ওঠার দিন দোল। আমরা বন্ধুরা ভেষজ আবির আর রং নিয়ে দোল খেলি। ঘটনাটি বছর তিনেক আগের। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। বেলুনে রং ভর্তি করে পথচলতি মানুষকে ছুড়তাম। একবার এক ভদ্রলোককে বেগুনি রং ভরে বেলুন ছুড়লাম। অব্যর্থ নিশানা। ভদ্রলোক রেগে গিয়ে এমন তাকালেন, শেষে ছুটে পালিয়ে বাঁচলাম। এখন অবশ্য অচেনা কারও গায়ে রং দিই না।
—অন্বেষা বটব্যাল, অষ্টম শ্রেণি
ঘরবন্দি থাকি
আমার রঙে অ্যালার্জি। তাই রংকে খুব ভয় পাই। কোনও দিন দোল খেলি না। বাবা-মা এবং গুরুজনদের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করি। ব্যস, ওইটুকুই আমার দোল খেলা। দু’বছর আগে পাড়ার বন্ধুরা দোল খেলার জবরদস্ত প্ল্যান করেছিল। আমাকেও অংশ নিতে বলেছিল। আমি সেদিন চুপচাপ ছিলাম। দোলের দিন বাড়ির দরজায় তালা ঝুলিয়ে লুকিয়ে বসেছিলাম। ওরা যথাসময়ে আমাকে বাড়িতে ডাকতে এল। কিন্তু কোনওরকম সাড়া শব্দ না পেয়ে, বাড়িতে কেউ নেই ভেবে চলে গেল। আসলে ওরা সবাই ঘাপটি মেরে লুকিয়ে বসেছিল। বিপদ কেটে গিয়েছে ভেবে যেই দরজার তালা খুলেছি। অমনি সকলে আমাকে রং মাখিয়ে ভূত করে দিল।
—অহনা ঘোষ, অষ্টম শ্রেণি
আলাদা অনুভূতি
ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় দোলযাত্রা। আর পরের দিন অবাঙালিরা পালন করেন হোলি উৎসব। দোল বা হোলির আনন্দে গোটা দেশ মেতে ওঠে। বসন্তে সেজে ওঠে প্রকৃতিও। তাই ছ’টি ঋতুর মধ্যে বসন্তই রাজা। তাকে আমরা আদর করে ডাকি ঋতুরাজ বলে। তাই এই রঙের উৎসব ঘিরে আমাদের আলাদা অনুভূতি। দোলের দিন আমাদের পাড়ায় ‘প্রভাত ফেরি’ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর আমি প্রভাত ফেরিতে অংশগ্রহণ করি। গানের তালে তালে মুখরিত হয়ে ওঠে দোলের সকাল। পাশাপাশি পাড়া পরিক্রমা করা হয়। মনে আছে, ক্লাস টু-এ পড়ার সময় একবার এই প্রভাতফেরিতে রাধা সেজে নেচেছিলাম। প্রভাতফেরি শেষে বন্ধুদের সঙ্গে আবির খেলি। তাই দোলযাত্রা আমার কাছে একটা আলাদা অনুভূতি।
—সৌমিয়া অধিকারী, অষ্টম শ্রেণি
ন্যাড়া পোড়ার হুল্লোড়
ঋতুরাজ বসন্ত। সেই বসন্ত ঘিরে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক আনন্দবাসর তৈরি করেছিলেন। পলাশ, শিমুল ভরা প্রকৃতির বুকে নাচ, গান, আবির দিয়ে দোলের উৎসবকে এক অন্যমাত্রা দিয়েছিলেন তিনি। সেই পরম্পরাই ছড়িয়ে আছে চর্তুদিকে। গত বছর দোলের ছুটিতে আমরা গিয়েছিলাম দেশের বাড়ি। আত্মীয়স্বজনরা এক জায়গায় হয়ে একেবারে হইহই ব্যাপার। দোলের আগের দিন আমরা ভাই-বোনেরা শুকনো গাছের ডাল, পাতা জোগাড় করতে বেরলাম। বানানো হল বুড়ির ঘর। মেতে উঠলাম ন্যাড়া পোড়ার আনন্দে। ‘আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া, কাল আমাদের দোল...’ চিৎকারে আকাশ বাতাস ধ্বনিত হল। ন্যাড়া পোড়ার আগুনে আলু পোড়ানো হল। আনন্দ করে তা খাওয়া হল। গ্রামের বাড়ির ন্যাড়া পোড়ার আনন্দ কখনও ভুলব না।
—রূপসা ঘোষ, দশম শ্রেণি
মন যেন রামধনু
প্রতি বছর এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করে থাকি। শীত সবে বিদায় নিয়েছে। চারদিকে ফুল আর ফুল। শিমুল, পলাশের শোভা আর গাছের কচি পাতায় প্রকৃতি সেজে ওঠে। দোল আর হোলি এই দুটো দিনই চুটিয়ে মজা করে নিই। বেশ কয়েকবার বসন্তোৎসবে শান্তিনিকেতন বেড়াতে গিয়েছি। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে পা মিলিয়েছি। কেউ কাউকে চিনি না। তবুও অবলীলায় একে অপরকে আবির মাখিয়েছি। কবিগুরুর গান গেয়েছি। এবারও বাবাকে ধরেছি শান্তিনিকেতন যাওয়ার জন্য। কিন্তু যাওয়া হবে কি না বলতে পারছি না। তবে, দোলের আগে মনটা রঙিন হয়ে আছে রামধনুর মতো।
—শিঞ্জিনী ভট্টাচার্য, দশম শ্রেণি
আবিরে রাঙা
আমরা যৌথ পরিবারে থাকি। তাই ৩৬৫ দিনই আমাদের বাড়িতে উৎসব। দোল পূর্ণিমায় আমাদের বাড়িতে সত্যনারায়ণ পুজোর আয়োজন করা হয়। খিচুড়ি, পোলাও, ছানার কোপ্তা, চাটনি, পায়েস হরেক রকম রান্না হয়। হইহই করে খাওয়াদাওয়া করা হয়। বাড়ির উঠোনে আবির খেলা হয়। লাল, হলদে, সবুজ, বেগুনি নানা রঙের আবিরে সেজে উঠি আমরা। সন্ধেবেলা ঘরোয়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গান, নাচ যারা যা শেখে তা পরিবেশন করে।
—তিস্তা দাস, সপ্তম শ্রেণি
বরানগর রাজকুমারী মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল
প্রধান শিক্ষিকার কলমে
রাজকুমারী মেমোরিয়াল গার্লস হাই স্কুল বরানগর অঞ্চলের গর্ব ও অহংকার। এর সঙ্গে জড়িয়ে দীর্ঘ ১৬০ বছরের ইতিহাস। সালটা ১৮৬৫। কয়েক বছর আগেই ঘটে গিয়েছে মহাবিদ্রোহ। যার ফলশ্রুতি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে এদেশের শাসনভার চলে গিয়েছে মহারানি ভিক্টোরিয়ার হাতে। সেই সময় বরানগর অঞ্চল জলা-জঙ্গলে ভরা। অন্নসংস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অবস্থা তথৈবচ। সমাজের খবরদারি আর বাল্য বিবাহের জেরে মেয়েদের লেখাপড়া তখন সোনার পাথরবাটি।
সেই সময় বরানগরে শশীপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহ হয় আড়িয়াদহের দ্বাদশবর্ষীয়া রাজকুমারী ঘোষালের। শশীপদবাবু ছিলেন বিচক্ষণ মানুষ। নারী শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। কাজ শুরু করলেন নিজের বাড়ি থেকেই। অবসর সময়ে স্ত্রীকে পড়াতেন তিনি। তা দেখে এগিয়ে এলেন বাড়ির বয়স্কা ও বিধবারা। এমনকী, পাড়ার আশপাশের বাড়ি থেকেও মেয়েরা লেখাপড়া শিখতে আসতে শুরু করল। বাড়তে থাকল ছাত্রী সংখ্যা।
অবশেষে স্থাপিত হল বিদ্যালয়। ১৮৬৫ সালের ১৯ মার্চ বরানগরের দীননাথ নন্দীর ঠাকুর দালানে স্কুল শুরু হল। প্রথম ছাত্রী রাজকুমারী দেবী। এর জেরে তখনকার সমাজপতিরা শশীপদবাবুকে একঘরে করে দেয়। কিন্তু তাতে দমে যাননি তিনি। বহুবার স্কুলের নাম ও স্থান পরিবর্তন হয়েছে। তারপর অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে তৈরি হয় স্কুল ভবন। ১৮৭৬ সালের ২ জানুয়ারি জন ফিয়ারের হাতে হয় এর দ্বারোদ্ঘাটন। স্যার রিচার্ড টেম্পল সহ তৎকালীন ছোটলাটরা আসতেন এই স্কুলে।
১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এটি ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৪৬ সালে জুনিয়র হাই স্কুলের মর্যাদা পায়। ১৯৫১ সালে মেলে প্রবেশিকা পরীক্ষার অনুমতি। পরবর্তীকালে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান দখল করে এই স্কুলের ছাত্রীরা। বর্তমান ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ১১০০। স্কুলের নিজের লাইব্রেরি ছাড়াও আছে শশীপদবাবুর নামাঙ্কিত পাঠাগার। আছে মহামূল্যবান প্রাচীন ‘বাইবেল’। যা স্কুলের একান্ত নিজস্ব সম্পদ। ক্লাসরুমগুলি ছাত্রীদের চিত্রকলায় রঙিন।
প্রাচীন স্কুল ভবনের বেশ কিছু ঘরের আশু সংস্কারের প্রয়োজন। কিছু বিষয়ে শিক্ষিকার অভাব রয়েছে। ঐতিহ্যকে পাথেয় করে এগিয়ে চলেছে এই স্কুল।
—পায়েল দে দত্ত, প্রধান শিক্ষিকা