


রাজু চক্রবর্তী, কলকাতা: কবি সুভাষ থেকে দক্ষিণেশ্বর মেট্রো যাত্রা নিয়েই কি এবার আশঙ্কার আবহ? কারণ, ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেট্রো ট্র্যাকের ‘স্বাস্থ্য’ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ৪০ বছর ধরে কোটি কোটি যাত্রীর বোঝা বয়ে ভঙ্গুর হয়ে গিয়েছে কলকাতার এই লাইফ লাইন। আর তাতেই মেট্রো চালকদের তরফে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে ভারতীয় রেলকে। জানা গিয়েছে, যাত্রীবোঝাই রেক নর্থ-সাউথ করিডরে চলাচলের সময় প্রায়ই কম্পন ও প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে। রেল বোর্ডের অনুমোদনক্রমে কলকাতা মেট্রো ঘণ্টায় ৮০ কিমি বেগে রেক চালাতে সক্ষম। কিন্তু রেল লাইনের ভগ্নদশার জেরে ব্লু-লাইন ক্রমেই গতি হারাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেট্রোর এক চালক বলেন, ‘বোর্ডের নির্দেশে অনুমোদিত গতিবেগে লাগাম টানা হয়েছে। ৪০ থেকে ৫০ কিমি বেগে রেক চালাতে হচ্ছে। কয়েকটি সেকশনে তো স্পিড আরও কমিয়ে দিতে হচ্ছে।’ এর জেরে প্রতিদিন আপ-ডাউনে গন্তব্যে পৌঁছতে ধারাবাহিকভাবে লেট করছে মেট্রো।
সূত্রের দাবি, সমীক্ষক সংস্থা রাইটসকে দিয়ে গোটা রুটের বাস্তব চিত্র জানার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রেল। প্রথম দফার রিপোর্টে সংস্থা জানিয়েছে, গোটা রুটের সার্বিক খোলনলচে বদলানো একান্ত জরুরি। সেক্ষেত্রে শহরের ব্যস্ততম এই মেট্রো করিডর সম্পূর্ণ বন্ধ করে সামগ্রিক সংস্কার করার পরমর্শ দেওয়া হয়েছে। আনুমানিক ব্যয় ৬০০ থেকে ৬৫০ কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে মেট্রো ভবনের এক কর্তা বলেন, ‘টালিগঞ্জ (মহানায়ক উত্তকুমার) থেকে দমদম প্রায় সাড়ে ১৬ কিলোমিটার মেট্রো পথের হাল অত্যন্ত খারাপ। ১৯৯৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এই সেকশনে যাত্রী পরিষেবা শুরু হয়েছিল। কালের নিয়মে মাটির নীচে পাতা মেট্রো ট্র্যাক ক্রমাগত ভার বইতে বইতে রীতিমতো ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি কংক্রিটের পিলারগুলির উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণও অত্যন্ত জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শহরের নিকাশি ব্যবস্থা সেই ব্রিটিশ আমলের হওয়ায়, মাটির তলার অংশ আরও বেশি ক্ষয় হচ্ছে। একইসঙ্গে বর্ষায় কলকাতার বহু অংশে জল জমে। এই জল পাতালের নির্মাণ অংশের ক্ষতি করছে। রুটের বিভিন্ন স্টেশনে ছাদ বা পাঁচিল দিয়ে নাগাড়ে ঢুকছে জল। ফলে সাম্প্রতিক অতীতে সামনে এসেছে পার্ক স্ট্রিট, ময়দান, এসপ্লানেড, গিরিশ পার্ক সহ একাধিক স্টেশনে জল থইথই ছবি। গত বছর বর্ষায় পার্ক স্ট্রিট স্টেশন ও প্ল্যাটফর্ম জলে ডুবে যায়। ৫ ঘণ্টার বেশি সময় নর্থ-সাউথ মেট্রো লাইনে যাত্রী পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।’
বিষয়টি কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন আইএনটিটিইউসি অনুমোদিত মেট্রো রেলওয়ে প্রগতিশীল শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সহ-সভাপতি শুভাশিস সেনগুপ্ত। তাঁর কথায়, ‘আমরা ইউনিয়নের তরফে দীর্ঘদিন ধরে মেট্রো লাইনের উপযুক্ত মেরামতির দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করেনি।’ এই বেহাল দশার জন্য কর্মীদের অভাবকে দুষেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ‘মেট্রো ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বেসরকারি এজেন্সির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণই নেই। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন মেট্রোয় নিয়োগ বন্ধ। প্রায় সমস্ত বিভাগ কর্মী-শূন্যতায় ভুগছে। এই লাইন থেকে কর্মী এবং মেট্রো চালকদের সরিয়ে শহরের অন্য রুটে কাজে লাগানো হচ্ছে। তাই মেট্রোর এই কঙ্কালসার চেহারা আরও প্রকট হচ্ছে।’