


অচেনা জায়গায় গিয়ে কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ ভয় লাগল! কেন? সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এটি আসলে শব্দ তরঙ্গের খেলা। কারণ ব্যাখ্যা করলেন স্বরূপ কুলভী।
ভূতের গল্প তো আমরা সবাই পড়ি। এসব গল্পে আবহ অর্থাৎ গা ছমছমে একটা পরিবেশ তৈরি করা হয়। বাংলা সাহিত্যে ভৌতিক গল্পের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। বাঙালি পাঠকদের কাছে গা-ছমছমে আবহের রহস্যমোড়া কাহিনি যুগ যুগ ধরে জনপ্রিয়। আর ছোট্ট বন্ধুরা তোমরা পরিবারের কারও না কারও কাছ থেকে এধরনের গল্প নিশ্চয়ই শোনো। বিশেষ করে হানাবাড়ির গল্পের কথা কে না জানে। এই ধরনের পরিত্যক্ত বা হানাবাড়ির রহস্যটা কী? এব্যাপারে একটা বিশেষ ব্যাখ্যা সামনে এনেছেন বিজ্ঞানীরা। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ কেন আমরা ভয় পাই? মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নানা কারণে আমাদের মনের গহিনে এমন অস্বস্তিকর অনুভূতি ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে। তেমন পরিবেশে পৌঁছলে, কোনো কারণ ছাড়াই সেটা আরও জাঁকিয়ে বসে।
কোনো বিশেষ জায়গায়, যেমন হানাবাড়িতে গেলে অজানা আতঙ্ক দানা বাঁধে বা গা ছমছমে অস্বস্তি দেখা দেয়। অথচ এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ থাকে না। এমন ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে একটা রহস্য। আশপাশের পরিবেশে বিশেষ কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ছে কিংবা অদ্ভুত কিছু শব্দ কানে ভেসে আসছে— এমন কিছুই হচ্ছে না। অথচ, একটা গা শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে। এর কারণ কী? এই বিষয়টি নিয়েই নতুন একটা গবেষণা ফ্রন্টিয়ার্স ইন বিহেভিয়ারল নিউরোসায়েন্সেস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কী জানাচ্ছে এই গবেষণা? এই অনুভূতির পুরোটাই হতে পারে ‘ইনফ্রাসাউন্ডে’র খেলা। ইনফ্রাসাউন্ড হল এমন মৃদু শব্দ তরঙ্গ, যা মানুষ শুনতে পায় না। এধরনের শব্দ তরঙ্গই মনে একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি তৈরি করতে পারে। অথচ মানুষ বুঝতেই পারে না, কেন এমন হচ্ছে।
তরঙ্গের আকারে প্রবাহিত হয় শব্দ। আর প্রতি সেকেন্ডে কতগুলো তরঙ্গ তৈরি হয়, তাকে বলে ফ্রিকোয়েন্সি বা কম্পাঙ্ক। এই কম্পাঙ্ক মাপার একক হল হার্ৎজ। মানুষ সাধারণত ২০ হার্ৎজ থেকে ২০ হাজার হার্ৎজের মধ্যে শব্দ শুনতে পায়। অর্থাৎ ইনফ্রাসাউন্ড এই কম্পাঙ্ক সীমার নীচে। অর্থাৎ কম্পাঙ্ক ২০ হার্ৎজের কম হওয়ায় তা কানে শোনা যায় না। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, আমাদের শরীর তা একেবারেই টের পাচ্ছে না।
এমন শব্দ আমরা শুনতে পাই না ঠিকই, কিন্তু এসব কম্পন দেওয়াল বা অন্যান্য বাধা ভেদ করেও বয়ে যেতে পারে। পুরানো বাড়ির ভাঙাচোরা পাইপ, ঘুলঘুলি, যন্ত্রপাতি থেকে এধরনের ইনফ্রাসাউন্ড তৈরি হতে পারে। ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত ও ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক কারণেও তা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ বিভিন্ন জায়গাতেই রয়েছে ইনফ্রাসাউন্ড।
কানাডার ম্যাকইউয়ান ইউনিভার্সিটির গবেষকদল এই ইনফ্রাসাউন্ড নিয়ে ৩৬ জনের উপর একটা পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তাঁদের একটা ঘরে রেখে বিভিন্ন ধরনের গান শোনানো হয়। কাউকে ধীর লয়ের গান আবার কাউকে অস্বস্তিকর গান শোনানো হয়। আর নেপথ্যে কখনো কখনো ইনফ্রাসাউন্ড চালু করা হয়। আবার কখনো বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাতে যে ফল মিলেছে, তা বেশ চমকপ্রদ। দেখা গিয়েছে, যে অংশগ্রহণকারীরা ইনফ্রাসাউন্ডের সংস্পর্শে আসছে, তাদের অনুভূতির চমকপ্রদ পরিবর্তন হচ্ছে। তাঁদের মনে অস্বস্তি, বিরক্তি, ভয়ের মতো অনুভূতি দেখা দিচ্ছে। এর থেকেই গবেষকরা বলছেন, ইনফ্রাসাউন্ড নিজে থেকে মানুষের মনে কোনো বিশেষ আবেগ তৈরি করে না। কিন্তু যখন যে মানসিক অবস্থা থাকে, তা আরও বেশি তীব্র বা প্রকট করে তোলে। অর্থাৎ ধরা যাক, কেউ একটা জনহীন পুরানো বাড়িতে গিয়েছে। তার বিশ্বাস, ওটা ভূতের বাড়ি। সেখানে গিয়ে তার আগে থেকেই ভয়ে খানিক বুক দুরুদুরু করছে। আর সেই সময় যদি সেখানে ইনফ্রাসাউন্ড থাকে, তাহলে ওই ভয়ের মাত্রা অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। ম্যাকইউয়ান ইউনিভার্সিটির মনস্তত্ত্ববিদ তথা অন্যতম গবেষক রডনি স্মালজের গবেষণা থেকে এমনটাই জানা গিয়েছে।