সনাতন ধর্মের অন্যতম প্রধান অনুষ্ঠান পিতৃপূজা। প্রত্যহ কর্ত্তব্য পঞ্চ মহাযজ্ঞের অন্তর্গত পিতৃযজ্ঞ বা তর্পণাদি এই পিতৃপূজারই নামান্তর। শ্রুতির আদেশ ‘মাতৃদেবা ভব, পিতৃদেবো ভব’। মনু বলিয়াছেন পিতা প্রজাপতির মূর্ত্তি এবং মাতা পৃথিবীর মূর্ত্তি। পিতা মাতা সন্তানের অকৃত্রিম সুহৃৎ। তাঁহাদের নিকট হইতে উৎপন্ন এবং তাঁহাদের যত্নে লালিত পালিত এই পঞ্চভৌতিক নরদেহ নশ্বর হইলেও পরমার্থপ্রদ। ‘অধ্রুবমর্থদম্’। এই দেহে অধিষ্ঠিত থাকিয়াই জীবাত্মা জ্ঞান ভক্তির অনুশীলনে পরামগতি লাভ করিতে সমর্থ হন। এই জন্যই শাস্ত্রকারগণ সকলেই একবাক্যে বলিয়াছেন যে মানব জন্ম লাভ করিয়া পিতৃঋণ, ঋষিঋণ ও দেবঋণ পরিশোধ করা প্রত্যেকেরই কর্ত্তব্য। যাঁহারা পরবৈরাগ্যলাভ করিয়া প্রবজ্যাগ্রহণ করেন অথবা যাঁহারা ভগবানের একান্তী ভক্ত তাঁহাদের কাহারও নিকট ঋণ থাকে না। কিন্তু সাধারণ স্তরের অসংখ্য গৃহস্থ মনুষ্য উক্ত ত্রিবিধ ঋণ পরিশোধ না করিলে অধঃপতিত হইতে থাকেন। গৃহাশ্রম অন্যান্য আশ্রমের উপজীব্য এবং সাধনার দ্বারা ক্রমিক আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভের নিরাপদ দুর্গ বলিয়া উচ্চ প্রশংসা আছে। গৃহস্থের অনুষ্ঠেয় ধর্মসমূহকেও শ্রীভাগবত মোক্ষধর্ম নামে অভিহিত করিয়াছেন। কারণ এই সকল ধর্মানুষ্ঠান করিতে করিতে ক্রমে চিত্তশুদ্ধির দ্বারা মোক্ষলাভ হইতে পারে। বিবাহের দ্বারা গৃহস্থের বংশরক্ষা হইলে বংশধরগণ পিতা পিতামহ প্রভৃতি পিতৃকুলও মাতা মাতামহ প্রভৃতি মাতৃকূলের শ্রাদ্ধতর্পণাদি কার্য এবং অন্যান্য আশ্রমোচিত ধর্মের অনুষ্ঠান করিয়া কৃতজ্ঞতাপূর্ণ বিশুদ্ধ জীবন যাপনে মনুষ্যজন্ম সার্থক করিবেন-এই মহান উদ্দেশ্যে আর্য ঋষিগণ বেদমূলক বিবিধ ধর্মশাস্ত্র প্রণয়ন করিয়াছেন। বায়ুপুরাণের একটী শ্লোকে পিতামাতার প্রতি পুত্রের কর্তব্য সংক্ষেপে উপদিষ্ট হইয়াছে। “জীবতোর্বাক্যকরণাৎ প্রত্যব্দং ভুরিভোজনাৎ। গয়ায়াং পিণ্ডদানাচ্চ ত্রিভিঃ পুত্রস্য পুত্রতা।” পুত্র যদি পিতামাতার জীবদ্দশায় তাঁহাদের আজ্ঞাপালন করে এবং তাঁহাদের পরলোক গমনের পর প্রতি সাম্বৎসরিক মৃত্যুতিথিতে যথাশক্তি ব্রাহ্মণাদি ভোজন করায় ও গয়াধামে শ্রীবিষ্ণুপাদপদ্মে পিণ্ডদান করে তবেই তাহার পুত্রত্ব সিদ্ধ হয়। উপনিষদের মতে পিতার অপূর্ণ কার্য পূরণ করিতে পারিলেই পুত্র হওয়া যায়। “পূরণাৎ পুত্রঃ”। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ ও মনীষিগণের জীবনে পিতামাতার প্রতি প্রগাঢ় ভক্তির কথা আছে। এমনকি ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরামচন্দ্রের অতুলনীয় পিতৃভক্তি ও মাতৃভক্তির সংবাদ সকলেই অবগত আছেন। করুণাবতার শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য সন্ন্যাসী হইয়াও নীলাচলে জননী শচীদেবীর নামে বিহ্বল হইতেন।


