Bartaman Logo
২৫ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পিতৃপূজা

সনাতন ধর্মের অন্যতম প্রধান অনুষ্ঠান পিতৃপূজা। প্রত্যহ কর্ত্তব্য পঞ্চ মহাযজ্ঞের অন্তর্গত পিতৃযজ্ঞ বা তর্পণাদি এই পিতৃপূজারই নামান্তর। শ্রুতির আদেশ ‘মাতৃদেবা ভব, পিতৃদেবো ভব’।

পিতৃপূজা
  • ৪ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সনাতন ধর্মের অন্যতম প্রধান অনুষ্ঠান পিতৃপূজা। প্রত্যহ কর্ত্তব্য পঞ্চ মহাযজ্ঞের অন্তর্গত পিতৃযজ্ঞ বা তর্পণাদি এই পিতৃপূজারই নামান্তর। শ্রুতির আদেশ ‘মাতৃদেবা ভব, পিতৃদেবো ভব’। মনু বলিয়াছেন পিতা প্রজাপতির মূর্ত্তি এবং মাতা পৃথিবীর মূর্ত্তি। পিতা মাতা সন্তানের অকৃত্রিম সুহৃৎ। তাঁহাদের নিকট হইতে উৎপন্ন এবং তাঁহাদের যত্নে লালিত পালিত এই পঞ্চভৌতিক নরদেহ নশ্বর হইলেও পরমার্থপ্রদ। ‘অধ্রুবমর্থদম্’। এই দেহে অধিষ্ঠিত থাকিয়াই জীবাত্মা জ্ঞান ভক্তির অনুশীলনে পরামগতি লাভ করিতে সমর্থ হন। এই জন্যই শাস্ত্রকারগণ সকলেই একবাক্যে বলিয়াছেন যে মানব জন্ম লাভ করিয়া পিতৃঋণ, ঋষিঋণ ও দেবঋণ পরিশোধ করা প্রত্যেকেরই কর্ত্তব্য। যাঁহারা পরবৈরাগ্যলাভ করিয়া প্রবজ্যাগ্রহণ করেন অথবা যাঁহারা ভগবানের একান্তী ভক্ত তাঁহাদের কাহারও নিকট ঋণ থাকে না। কিন্তু সাধারণ স্তরের অসংখ্য গৃহস্থ মনুষ্য উক্ত ত্রিবিধ ঋণ পরিশোধ না করিলে অধঃপতিত হইতে থাকেন। গৃহাশ্রম অন্যান্য আশ্রমের উপজীব্য এবং সাধনার দ্বারা ক্রমিক আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভের নিরাপদ দুর্গ বলিয়া উচ্চ প্রশংসা আছে। গৃহস্থের অনুষ্ঠেয় ধর্মসমূহকেও শ্রীভাগবত মোক্ষধর্ম নামে অভিহিত করিয়াছেন। কারণ এই সকল ধর্মানুষ্ঠান করিতে করিতে ক্রমে চিত্তশুদ্ধির দ্বারা মোক্ষলাভ হইতে পারে। বিবাহের দ্বারা গৃহস্থের বংশরক্ষা হইলে বংশধরগণ পিতা পিতামহ প্রভৃতি পিতৃকুলও মাতা মাতামহ প্রভৃতি মাতৃকূলের শ্রাদ্ধতর্পণাদি কার্য এবং অন্যান্য আশ্রমোচিত ধর্মের অনুষ্ঠান করিয়া কৃতজ্ঞতাপূর্ণ বিশুদ্ধ জীবন যাপনে মনুষ্যজন্ম সার্থক করিবেন-এই মহান উদ্দেশ্যে আর্য ঋষিগণ বেদমূলক বিবিধ ধর্মশাস্ত্র প্রণয়ন করিয়াছেন। বায়ুপুরাণের একটী শ্লোকে পিতামাতার প্রতি পুত্রের কর্তব্য সংক্ষেপে উপদিষ্ট হইয়াছে। “জীবতোর্বাক্যকরণাৎ প্রত্যব্দং ভুরিভোজনাৎ। গয়ায়াং পিণ্ডদানাচ্চ ত্রিভিঃ পুত্রস্য পুত্রতা।” পুত্র যদি পিতামাতার জীবদ্দশায় তাঁহাদের আজ্ঞাপালন করে এবং তাঁহাদের পরলোক গমনের পর প্রতি সাম্বৎসরিক মৃত্যুতিথিতে যথাশক্তি ব্রাহ্মণাদি ভোজন করায় ও গয়াধামে শ্রীবিষ্ণুপাদপদ্মে পিণ্ডদান করে তবেই তাহার পুত্রত্ব সিদ্ধ হয়। উপনিষদের মতে পিতার অপূর্ণ কার্য পূরণ করিতে পারিলেই পুত্র হওয়া যায়। “পূরণাৎ পুত্রঃ”। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ ও মনীষিগণের জীবনে পিতামাতার প্রতি প্রগাঢ় ভক্তির কথা আছে। এমনকি ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরামচন্দ্রের অতুলনীয় পিতৃভক্তি ও মাতৃভক্তির সংবাদ সকলেই অবগত আছেন। করুণাবতার শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য সন্ন্যাসী হইয়াও নীলাচলে জননী শচীদেবীর নামে বিহ্বল হইতেন।

Advertisement

জগতের ঈশ্বরবিশ্বাসী সকল জাতিই মৃত পিতামাতা প্রভৃতির আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে প্রার্থনার সহিত কোনও না কোনও অনুষ্ঠান নিজ নিজ শাস্ত্রানুসারে করিয়া থাকেন। সনাতনী হিন্দুগণের পারলৌকিক অনুষ্ঠানসমূহ বিবিধ ও বহুদিনসাধ্য। শ্মশানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হইতে আরম্ভ করিয়া পুরকপিণ্ডদান, আদ্যশ্রাদ্ধ, প্রতিমাসিক শ্রাদ্ধ, সপিণ্ডীকরণ ও বৃষোৎসর্গাদি মরণ বৎসর ধরিয়া শাস্ত্রনির্দিষ্টকালে অনুষ্ঠিত হয়। পিতা পিতামহ প্রভৃতি পিতৃপুরুষের তৃপ্তির জন্য মৃত্যুতিথি এবং ভিন্ন ভিন্ন মাসের কোনও কোনও পুণ্যতিথিতে শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা স্মৃতিশাস্ত্রে আছে। এমনকি ভক্তিশাস্ত্রশিরোমণি শ্রীমদ্ভাগবতও গৃহীকে পিতৃশ্রাদ্ধে উৎসাহিত করিয়াছেন।
“কুর্য্যাদপরপক্ষীয়ং মাসি প্রৌষ্ঠপদে দ্বিজঃ।
 শ্রাদ্ধং পিত্রোর্যখাবিত্তং তদ্বন্ধুনাঞ্চ বিত্তবান্।।
 অয়নে বিষুবে কুর্য্যাদ্ব্যতীপাতে দিনক্ষয়ে। 
 চন্দ্রাদিত্যোপরাগে চ দ্বাদশ্যাং শ্রবণেষু চ৷৷
ইত্যাদি। গৃহী যদি যথাশক্তি পিতামাতার বার্ষিক শ্রাদ্ধ না করে বিষ্ণু বা শিব তাহার পূজা গ্রহণ করেন না। মুখ্যচান্দ্র ভাদ্র বা গৌণচান্দ্র আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষকে পিতৃপক্ষ বা অপরপক্ষ বলে। এই পক্ষে পরলোকগত পিতৃপুরুষগণ বংশজগণের নিকট তিলতর্পণ ও পার্বণ শ্রাদ্ধ পাওয়ার আশা করেন।
জ্যোতির্ময় নন্দের ‘উপাসনা-বিজ্ঞান’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ