Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পদ্মপালের পরিণতি ও ভয়ঙ্কর বিজেপি!

পদ্মপালের পরিণতি ও ভয়ঙ্কর বিজেপি!
  • ২৭ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শুধু একটা ঐকিক অঙ্কের উত্তর কিছুতেই মিলছে না গত সোমবার থেকে। উপ রাষ্ট্রপতিকে সরাতে যদি তিন ঘণ্টা লাগে তাহলে রাষ্ট্রপতিকে সরাতে কত সময় লাগবে? জানি না পাটিগণিতেই এর উত্তর নিহিত আছে, না সংবিধানে অন্য কোনও ফর্মুলা নির্দিষ্ট করা আছে! 

Advertisement

তবে এটাই প্রথম নয়। বিগত দশ বছরে বিজেপি সরকারের দেওয়া একটার পর একটা প্রতিশ্রুতি রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে দেখে পেশাদার সাংবিধানিক পদাধিকারীদের একটা বিরাট অংশ অপমানে, অবহেলায় নীরবে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই তালিকায় যেমন আছেন নোটবন্দির সময় সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর উর্জিত প্যাটেল, তেমনি আছেন তৎকালীন দুই নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা ও অরুণ গোয়েল। দু’জনই স্বয়ংশাসিত নির্বাচন কমিশনকে বিজেপির শাখা অফিসে পরিণত করার বিরোধিতা করেই বিদায় নেন। আজ একথা বলতে দ্বিধা নেই, অশোক লাভাসা ও গোয়েলজি কমিশনের মাথায় থাকলে বিহার ও বাংলার ভোটের আগে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন কিছুতেই করতে দিতেন না। বড় সংঘাতের জায়গা তৈরি হতো। মোদিজির সঙ্গে নীতিগত বিরোধে সরতে হয়েছে সরকারের একাধিক আর্থিক উপদেষ্টাকেও। এঁরা ষোলোআনা পেশাদার ও দুঁদে অভিজ্ঞ আমলা। অনেক চেষ্টা করেও মোদি সরকারের একশো শতাংশ ‘ভৃত্য’ হতে পারেননি। দোষটা এখানেই।
নিঃসন্দেহে এই তালিকার সর্বশেষ চমকপ্রদ সংযোজন, একদা বিজেপি ও সঙ্ঘের অতি ঘনিষ্ঠ উপ রাষ্ট্রপতির অতিনাটকীয় বিদায়! এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল গেরুয়া আহ্লাদ ও আদর কতটা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে! পান থেকে চুন খসলেই গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে কেউ দু’বার ভাববে না। যাঁরা রাজ্যে রাজ্যে গেরুয়া দলের মুখিয়া সেজে লম্ফঝম্প করেন, লোককে শাসান, উপড়ে ফেলার হুমকি দেন, এই ঘটনা তাঁদের কাছে যেমন শিক্ষার, তেমনি গড় ভোটারের কাছেও আত্মোপলব্ধির! কথায় কথায় এই দলই গণতন্ত্রের কথা বলে, হিন্দু ‘সোচ’ নিয়ে নানা উপদেশ দেয় এবং তা সাধারণকে বিশ্বাস করাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখে না। কিন্তু নেপথ্যে ধ্রুবপদ একটাই, যতদিন তুমি তালে তাল ঠুকে অনুগত থাকবে, ততদিনই নিঃশ্বাস নিতে পারবে। সামান্য ভুলচুক হলেই সারাজীবনের বিশ্বাস মিলিয়ে যেতে কয়েক সেকেন্ডও লাগবে না। ব্যাস খেল খতম! 
একটু বেশি এগিয়ে খেলা যাঁর স্বভাব তিনি ভেবেছিলেন উপ রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক ইমিউনিটির জোরে উতরে যাবেন। বাংলায় বিজেপি’র অপারেটরের ভূমিকা পালনের পর নিজেকে একটু বেশিই সিরিয়াসলি নিচ্ছিলেন। যেন যা খুশি করেও রেহাই মিলবে, উপ রাষ্ট্রপতিকে তো আর ভৃত্য বলা যায় না! কিন্তু ২১ জুলাই দেড়টা থেকে সাড়ে ৪টে, তিন ঘণ্টা বিদায়ী উপ রাষ্ট্রপতির জীবনে কয়েক যুগের চেয়েও দীর্ঘ কালখণ্ড। এই শিক্ষাটার তাঁর খুব দরকার ছিল। কী হয়েছিল শেষ তিন ঘণ্টায়, তার কাটাছেঁড়া করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। কারও দুঃসময়ে শুকনো সহানুভূতি জানানোও লক্ষ্য নয়। কিন্তু রহস্য যেখানে তা হচ্ছে, দীর্ঘ ৬ বছর বিজেপি’র তালে তাল দিয়ে শেষে সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে কেন বিচারপতি ভার্মার বিরুদ্ধে বিরোধীদের আনা ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেন। ভিতরে ভিতরে কী চলছিল? কেন তাঁর উপর রুষ্ট হয়ে নাড্ডাজি গলা সপ্তমে চড়িয়ে বললেন, ‘এবার আমি যা চাইব শুধু তাই হবে।’ বলেই দাঁতে দাঁত চেপে ছুটলেন অমিত শাহের কাছে। বিকেল ৪টের রাজ্যসভার বিজনেস অ্যাডভাইজারি কমিটির বৈঠক সরকার পক্ষের মাথারা বয়কট করতেই উপ রাষ্ট্রপতি বুঝে যান নাটকের যবনিকা আসন্ন। ঠিক এই সময় কার ফোন এসেছিল তাঁর কাছে। সকালে বাদল অধিবেশনের শুরুতে যিনি সাংসদদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে দীর্ঘ ভাষণ দিলেন, তিনি কোন চাপের মুখে মুহূর্তে বুঝে গেলেন ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে আর এক মুহূর্তও ওই পদে থাকা উচিত নয়। আসলে এটাই আরএসএস ও বিজেপি’র স্বরূপ, তুমি একচুল লাইনের বাইরে গেলেই ফিনিশ!
দূরত্বটা বাড়ছিল চলতি বছরের শুরু থেকেই। সরকারকে অন্ধকারে রেখে আপ সাংসদ রাঘব চাড্ডার সাসপেনশন আচমকা তুলে নিতেই অশান্তি শুরু। উপ রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্তে সরকার প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়। হঠাৎই তিনি একাধিক ক্ষেত্রে ‘স্বাধীনচেতা’ হয়ে গিয়েছিলেন। রাঘব চাড্ডাকে এমন একটি সরকারি বাংলো দেওয়া হয়েছে, যা কি না প্রথম বারের সাংসদের পাওয়ারই কথা নয়। কৃষক বিক্ষোভ নিয়েও তাঁর অবস্থান অস্বস্তিতে ফেলে মোদিজিকে। প্রকাশ্যেই তিনি প্রশ্ন তোলেন, কৃষকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ হল না কেন? সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধেও বেফাঁস মন্তব্য করেন। মার্কিন উপ রাষ্ট্রপতি জে ডি ভান্স ভারত সফরে এলে তাঁর সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বসতে চেয়েছিলেন। সরকার অনুমোদন দেয়নি। তাঁর কনভয়ের সব গাড়িকে মার্সিডিজে বদলে ফেলার আব্দারও কল্কে পায়নি। সেই থেকে কড়াই গরমই ছিল। বাদল অধিবেশনের শুরুতে বিরোধীদের থেকে বিচারপতি যশবন্ত ভার্মার অপসারণের প্রস্তাব গ্রহণ ও অপারেশন সিন্দুর নিয়ে মল্লিকার্জুন খাড়্গেকে সরকার পক্ষের আগে বলার সুযোগ দিতেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। বিদায় নিশ্চিত হয়ে যায় আর এক সাংবিধানিক পদাধিকারীর।
আসলে ‘রাজার চেয়ে বড় রাজভক্ত হতে নেই’, অনুগত সাজতে রাজার কথায় কারও বিরুদ্ধে চক্রান্তেও যুক্ত হতে নেই। কথাটার মর্মার্থ নিশ্চয়ই আজ হাড়ে হাড়ে বুঝছেন সদ্য প্রাক্তন উপ রাষ্ট্রপতি। যিনি রাজ্যপাল থাকাকালীন বাংলার রাজভবনকে বঙ্গ বিজেপির শাখা অফিস বানিয়েছিলেন, তাঁর বোঝা উচিত নিকৃষ্ট পলিটিক্যাল অপারেটরদের শেষে এমন পরিণতিই হয়। তাঁর এই ট্র্যাজেডি দপ করে জ্বলে উঠে নিভে যাওয়ারই বিয়োগান্ত কাহিনি। এ রাজ্যের রাজ্যপাল থাকার সময় রাজ্য সরকারের সঙ্গে নজিরবিহীন সংঘাতে জড়িয়েছিলেন। প্রবল উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকেই রাজভবনে বসেই গেরুয়া দলের বঙ্গ শিবির চালানোর বিরল ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তিনি। রাজ্য সরকারের শীর্ষে বসেও সেই সরকারের বিরুদ্ধেই তোপ দেগে সর্বাধিক সাংবাদিক সম্মেলন করার ঈর্ষণীয় রেকর্ড এখনও তাঁরই দখলে। বাংলায় নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে ৩৫৫ এবং ৩৫৬ নিয়ে অতিসক্রিয়তা খুব অল্প সময়েই তাঁকে দিল্লিতে বিজেপির চিন্তকদের নেকনজরে নিয়ে আসে। সেই আস্থা ও বিশ্বাসকে পাকাপোক্ত করতেই দিল্লিতে নেমেই ছুটতেন বিজেপির শীর্ষ নেতা বি এল সন্তোষের বাড়ি। সেখান থেকে হাওয়া মেপে অমিত শাহের অফিস কিংবা বাড়ি। বাংলা ও বাংলার সরকারকে কীভাবে পর্যুদস্ত করা যায়, তা নিয়ে দিল্লির নেতৃত্বকে নানা ইনপুট তুলে দেওয়াই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু এত করেও শেষরক্ষা হল না। বঙ্গের রাজ্যপাল (পড়ুন, পদ্মপাল) ও দেশের উপ রাষ্ট্রপতি, দুই পদ থেকেই তাঁকে বিদায় নিতে হল মেয়াদ ফুরনোর অনেক আগেই। মমতা সরকারকে নানাভাবে ডিস্টার্ব করায় খুশ হয়েই ‘মোগাম্বো’ তাঁকে নাটকীয়ভাবে দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ঠিক পরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আসনটিতে বসিয়েছিলেন। পদলেহন করে অর্জিত গুরুত্ব কখনও চিরস্থায়ী হতে পারে না। অদৃষ্টের এমনই পরিহাস, মাত্র গত ডিসেম্বরে কংগ্রেসসহ একাধিক দলের সদস্যদের সংসদে কথা বলতে দেওয়া হয় না বলে যাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে আসর গরম করেছিল, তাঁরাই আজ পাশে দাঁড়িয়েছে। বিরোধীদের দাবি, এভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদের কাউকে বিদায় দেওয়াটা মোটেই ঠিক কাজ হল না। অন্তত বিদায়ী উপ রাষ্ট্রপতিকে ফেয়ারওয়েল ভাষণটা দিতে দেওয়া হোক। এরই নাম রাজনীতির উলটপুরাণ ও এক নিকৃষ্ট অপারেটরের অপমৃত্যু!
আবার বলছি, এই লেখা কোনও ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। কারও গুণকীর্তনের জন্য কিংবা কারও অসময়ে শুকনো সহানুভূতি দেখানোর জন্যও নয়। একান্তভাবেই সাংবিধানিক পদের অপমান ও মর্যাদার অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে। সম্ভবত ১৯৫০ থেকে ২০২৫, ভারতীয় সংসদীয় ব্যবস্থা ও সংবিধানের পথচলার গৌরবময় অধ্যায়ে উপ রাষ্ট্রপতি পদের এমন অবমাননা আর হয়নি। রহস্য যতই গভীর হোক বাদল অধিবেশন শুরুর দিনে এমন ঘটনা মোটেই কাম্য ছিল না। সরকারের শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে মতপার্থক্য ও নীতিগত দ্বন্দ্ব যতই চরমে পৌঁছে থাক, সাংবিধানিক পদের গুরুত্ব বিবেচনা করে আর একটু সতর্ক হয়ে পা ফেলা উচিত ছিল মোদি সরকারের। এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হল যাতে ২১ জুলাই রাতে ইস্তফা দেওয়ার পর থেকে তিনি কার্যত লোকচক্ষুর আড়ালে। গড়পড়তা হরিপদ কেরানির চেয়েও উপ রাষ্ট্রপতির এমন অতর্কিতে সাদামাটা বিদায় একমাত্র একনায়কতন্ত্রেই সম্ভব। অনেকটা রাশিয়া, উত্তর কোরিয়ার কায়দায়। উপ রাষ্ট্রপতি পদে আসীন একজনকে বাক্সবন্দি করে রাতারাতি ক্ষমতার অলিন্দ থেকে ছুড়ে ফেলার দায় মোদি-অমিত শাহরা এড়াতে পারেন কি? এখন তিনি দ্রুত বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে সরকারি বাংলো ছাড়ার অপেক্ষায়। এমনকী, শারদ পাওয়ারসহ একঝাঁক বিরোধী নেতা দেখা করতে চাইলেও তাতে সম্মতি জানানোর ক্ষমতাটুকুও নেই। তবে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু হয় না। দিল্লির রাজনীতির অলিন্দে কানাঘুষো চলছে, শুধু ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব নিয়েই নয়, হালে এক কংগ্রেস এমপির উপদেশেই নাকি বিদায়ী উপ রাষ্ট্রপতি  চলছিলেন। এমনও শোনা যাচ্ছে, ২১ জুলাই রাতে রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার আগে রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ আলোচনা হয়। এসব নেহাতই জল্পনা, সত্যি-মিথ্যা কেউ জানে না।। আসল সত্যিটার উন্মোচন হতেও পারে, নাও হতে পারে। কিন্তু যে দল ও সরকার উঠতে বসতে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, চাপমুক্ত পরিবেশের কথা বলে, কংগ্রেসকে এবং পরিবারতন্ত্রকে দুয়ো দেয়,  তাদের আমলে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে বলতেই হবে সংবিধানের অন্তরাত্মা খুব স্বস্তিতে নেই। সেও দেশবাসীর মতোই নীরবে নিভৃতে কাঁদছে! কাজ ফুরলে নিকৃষ্ট অপারেটরদের ‘পাজি’ বানিয়ে কাদায় ছুড়ে ফেলা যে কোনও শাসকেরই দস্তুর, আবার তা প্রমাণ হল! ক্ষমতার ইঁদুর দৌড়ে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে কোনও ফারাক নেই। ক্ষমতার দম্ভে এই জমানাতেও একনায়কদেরই রমরমা!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ