ইন্টারন্যাশনাল মনিটারিং ফান্ড বা আইএমএফ-কে শিখণ্ডী করে চলতি অর্থবর্ষ শেষ হওয়ার প্রায় দশ মাস আগে গত মে-তে ভারতকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হিসাবে ঘোষণা করে বিস্তর বিদ্রুপের মুখে পড়েছিল নীতি আয়োগ। এখন দেখা যাচ্ছে, দেশের আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে যতই গলাবাজি করুক মোদি সরকার, ২০২৪-২৫-এর অর্থবর্ষে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হার কোভিড পরবর্তী চার বছরে সর্বনিম্ন! প্রধানমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে কার্যত নস্যাৎ করে কেন্দ্রের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর গত ৩০ মে জানিয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে দেশের অর্থনীতি বৃদ্ধি পেয়েছিল ৯.২ শতাংশ হারে। গতবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে বৃদ্ধির হার কমে হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস, অত্যাশ্চর্য কোনও ঘটনা না ঘটলে চলতি অর্থবর্ষেও আর্থিক বৃদ্ধির হার কম-বেশি গতবারের মতোই হবে। প্রশ্ন উঠেছে, আর্থিক বৃদ্ধির গতি এই হারে হলে ২০৪৭-এ প্রধানমন্ত্রী উবাচ ‘বিকশিত ভারত’ বা ‘উন্নত অর্থনীতি’-র লক্ষ্য কী করে পূরণ হবে? কারণ গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাজেট পেশের আগে আর্থিক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে আগামী দু’দশক টানা ৮ শতাংশ হারে আর্থিক বৃদ্ধি প্রয়োজন। এই একই প্রশ্নে নীতি আয়োগ বলেছে, আর্থিক বৃদ্ধির হার ৭.৫ শতাংশ হতে হবে। বলাই বাহুল্য, বৃদ্ধির বর্তমান হারে সেই লক্ষ্যে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তবু প্রধানমন্ত্রী মোদির নিরন্তর প্রচারে ‘বিকশিত ভারত’-এর অলীক স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে!
এই আর্থিক বৃদ্ধি কমে যাওয়া আরও একটা বাস্তব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে গোটা দেশকে। সেই সত্যটা হল, মূলত উৎপাদন ক্ষেত্র বা কলকারখানার উৎপাদনের শ্লথ গতির জেরেই আর্থিক বৃদ্ধি ধাক্কা খেয়েছে। বস্তুত, মোদি জমানায় দেশের শিল্প পরিস্থিতি যে ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে, সরকারি-বেসরকারি উভয়ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থানের সুযোগ মার খাচ্ছে, সেই বাস্তবটা উঠে এসেছে তথ্য ও পরিসংখ্যানে। দেখা যাচ্ছে, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে যেখানে উৎপাদন ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ছিল ১২.৩ শতাংশ, ২০২৪-২৫-এ তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৫ শতাংশে! গৃহস্থের খরচ আগের বছরের ৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭.২ শতাংশ। উৎপাদন ক্ষেত্রের মতো নির্মাণ ক্ষেত্রেও বৃদ্ধির হার ১০.৪ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৯.৪ শতাংশ। সব মিলিয়ে গত এপ্রিলে শিল্পবৃদ্ধির হার থেকে গিয়েছে ২.৭ শতাংশে। তার আগের বছরের এপ্রিলেও এই হার ছিল ৫.২ শতাংশ। পরিসংখ্যান দপ্তরই জানিয়েছে, কারখানা, খনন ও বিদ্যুৎক্ষেত্রে মন্থর উৎপাদনই শিল্পবৃদ্ধি কমার মূল কারণ। অথচ নীতি আয়োগের মতে, ২০৪৭-এ ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে দেশের জিডিপি ৩০ লক্ষ কোটি ডলার হতে হবে (যা এখন ৩.৯ লক্ষ কোটি ডলার), কারখানার উৎপাদন ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি হওয়া প্রয়োজন (যা এখন ৪.৫ শতাংশ) এবং দেশের জিডিপি-র ২৫ শতাংশ (যা এখন ১৭ শতাংশ) আসতে হবে উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে। নরেন্দ্র মোদি, নির্মলা সীতারামনরা এই পরিসংখ্যান ও বাস্তব সত্যটা জানেন না, তা নয়। তবু কুনাট্যের অভিনয় চলছে!
মোদি সরকারের তৈরি করা এই অলীক চিত্রনাট্যে আস্থা রাখছেন না দেশের শিল্পপতিদের একাংশও। দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় সংস্থাগুলি বিদেশে লগ্নিতে উৎসাহ দেখালেও দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগে তাঁদের অনেকেরই প্রবল অনীহা। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, কারখানার উৎপাদন বাড়ে-কমে মূলত পণ্যের চাহিদার উপর নির্ভর করে। ভারতে সেই চাহিদার গতি শ্লথ। কলকারখানা, খনন ও বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির হার কম। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তিনবার সুদের হার কমালেও এখনও চাহিদা বাড়ার কোনও লক্ষণ নেই। কংগ্রেসের মতে, মানুষের হাতে ইচ্ছেমতো খরচের টাকা নেই। সাধারণের অভিজ্ঞতাও সেই একই কথা বলে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির গড় আয় মাসে ২২ হাজার টাকার কাছাকাছি। গোটা ভারতের যত পরিবার আছে তাদের সব মিলিয়ে সঞ্চয় ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ছিল ১১.৬১ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ এ তা কমে হয়েছে ৬.৫২ লক্ষ কোটি টাকা। আসলে আর্থিক বৃদ্ধির ফানুস ওড়াতে যে চাতুরির আশ্রয় নিয়েছে মোদিবাহিনী তা ধরা পড়ে যেতেই আশঙ্কিত দেশীয় শিল্পমহল সতর্ক হয়ে পা ফেলছে। বিজেপি-র নির্বাচনী বন্ডে তারা সবচেয়ে বেশি টাকা দিলেও, বিদেশে লগ্নির বহর বাড়ালেও দেশের মধ্যে বিনিয়োগের প্রশ্নে তারা ভরসা করতে পারছে না এই সরকারকে। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। বাস্তব আর অলীক কুনাট্যের এই বিতর্ক যে জারি থাকবে আরও বহুদিন—তা সহজেই অনুমেয়।