সংবাদদাতা, ঘাটাল: ঘাটাল মহকুমায় শতাধিক পারিবারিক দুর্গাপুজো হয়। প্রতিটি পুজোর সূচনার একটি ইতিহাস রয়েছে। বিভিন্ন পুজোর রীতিনীতিও নানাধরনের। তবে প্রতিটি জায়গাতেই নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে দেবীর আরাধনা করা হয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি পুজো ঘাটালবাসীর কাছে খুবই পরিচিত।
হরিতকীতলার ১৮হাত দুর্গার পুজো: দাসপুর থানার হরিতকীতলার দেবী দুর্গা অষ্টাদশভুজা। পঞ্চমুণ্ডি আসনে অধিষ্ঠিতা দেবীপ্রতিমা শিউলি ফুলের বৃন্তের রংয়ের। এই পুজোয় দু’টি নবপত্রিকা স্থাপন করা হয়। একটি জীতাষ্টমীর সন্ধ্যায় বেলতলায় দেবীর অধিবাস ও আমন্ত্রণের সময়। অপর নবপত্রিকা মহাষষ্ঠীতে স্থাপিত হয়। আশ্বিনের কৃষ্ণা নবমীতে আদ্রানুশাস্ত্র যোগে দেবীর বোধন হয়। বিজয়া দশমীতেই বিসর্জন হয়।
কর্মকারদের সিংহবাহিনী পুজো: ঘাটাল শহরের কোন্নগরে ১৪০৯সালে জমিদার জিতারাম কর্মকারের প্রতিষ্ঠিত সিংহবাহিনী দুর্গার পুজো হয়ে আসছে। কথিত আছে, বর্ধমানের সিংহ দরজার আদলে সিংহবাহিনী দেবীর মন্দিরের দরজা তৈরি করেছিলেন জিতারাম। এর জেরে বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিরাম মেহতাব তাঁকে আটক করলে দেবী রাজাকে স্বপ্নাদেশে জিতারামকে মুক্তি দিতে বলেন। কোজাগরী পূর্ণিমায় দেবীর ঘট ভাসানোর মাধ্যমে এখানে পুজো শেষ হয়।
পণ্ডিতদের পুজো: দাসপুর থানার বেথুয়াবাটির পণ্ডিতদের পুজো প্রায় ৪৫০ বছরের পুরনো। এই পরিবারের দিয়াসিনী ঠাকুরানি নামে এক মহিলা কালীরপুলের সামনে ঘট সহ সাত দেবীপ্রতিমা কুড়িয়ে পান। কালী, মনসা, শীতলা, বিশালাক্ষী, সিদ্ধেশ্বরী, পার্বতী ও কামিনী-হেমঘটে আসীন এই সাত প্রতিমাই দুর্গারূপে পূজিতা হন। এখানে নবমীর দিন থেকে বলি শুরু হয়।
গোপালপুরের সিংহবাহিনীর পুজো: দাসপুর-২ ব্লকের গোপালপুরে রায়বাড়ির সিংহবাহিনীর পুজো এবার ৩৩১বছরে পড়ল। ওই পরিবারের দুর্গাদাস রায় যাত্রাশিল্পী ছিলেন। তাঁর যাত্রায় মুগ্ধ হয়ে বর্ধমানের রাজা ৩৪বিঘা জমি ও একটি সিংহবাহিনী মূর্তি দান করেন। সেই থেকেই পুজোর সূচনা। রায়বাড়িতে অষ্টধাতুর চতুর্ভুজা দুর্গাপ্রতিমার পুজো হয়। সিংহবাহিনীর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা ও পদ্ম থাকে। প্রতিপদ থেকে ১০দিন চণ্ডীপাঠ হয়।
সিংহবাড়ির পুজো: ১৭২২সাল থেকে দাসপুর থানার শয়লা গ্রামের সিংহবাড়ির পুজো হয়ে আসছে। পরিবারের সদস্য সুকান্ত সিংহ বলেন, গম্ভীরচরণ সিংহ জমিদারের কাজ তদারকির সময় কংসাবতীর পলাশপাই খালে দুর্গাপ্রতিমার কাঠামো পান। সেই থেকে কংসাবতীর মাটি দিয়েই সিংহবাড়ির প্রতিমা তৈরি হয়। এখানে পশুবলির প্রথা বন্ধ হয়েছে।
পুরুষোত্তমপুরে ঘোষ পরিবারের পুজো: পুরুষোত্তমপুরে বর্ধমান রাজার দেওয়া দেবোত্তর সম্পত্তির উপর নির্ভর করে প্রায় ৪৫০বছর আগে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন স্থানীয় জমিদার রঞ্জিত ঘোষ। এখানে শাক্তমতে দেবীর পুজো হয়। নবমীতে ছাগবলি হলেও মায়ের ভোগ রান্না হয় না। পুজোর প্রতিদিন ২০সের শুকনো আতপ চালের নৈবেদ্য দেওয়া হয়। এই পুজোয় তিনটি নবপত্রিকা স্থাপন করা হয়। পুজোর ক’দিন সন্ধ্যায় রামেশ্বর চক্রবর্তী রচিত ‘শিবায়ণ’ অনুষ্ঠিত হয়।
দাসপুরের চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো: দাসপুর গঞ্জের চৌধুরী পরিবারের পুজোও প্রায় ৩৫০বছরের প্রাচীন। রাজা শোভা সিংহের অধীনে জমিদার বঙ্গরাম চৌধুরী এই দুর্গাপুজো প্রচলন করেছিলেন। এখানে রাজরাজেশ্বরী রূপে একচালা কাঠামোয় দেবীর পুজো হয়। ষষ্ঠাদিকল্প অনুসারে হওয়া এই পুজোয় ছাগবলি প্রথা চালু রয়েছে। মাঝে কিছু বছরের জন্য পুজো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চৌধুরী পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম ফের পুরনো রীতি মেনে দুর্গাপুজো আয়োজন করছে।