সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ সিনেমায় ছোট্ট মুন্নির গল্প নজর কেড়েছিল দেশবাসীর। পাকিস্তান থেকে ভারতে এসে হারিয়ে যায় মুন্নি। বহু যুদ্ধ করে বজরঙ্গি (সলমন খান) তাকে পরিবারের হাতে তুলে দেন। ২০১৫ সালের ঈদের মরশুমে বক্স অফিসে মারকাটারি সাফল্য পায় এই সিনেমা।
দশ বছর পর সেই ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ যেন রিমেক দেখল বাংলা! তবে এক্ষেত্রে বজরঙ্গি কোনও একক সুপার হিরো নন। প্রশাসনের যৌথ প্রয়াস বজরঙ্গির ভূমিকায় ছিল। ঈদের ঠিক আগেই বাংলাদেশের মুন্নিকে ফিরিয়ে দিল তার পরিবারের হাতে। এবং এমন একটা সন্ধিক্ষণে যখন ভারত বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তলানিতে।
বনগাঁর পেট্রোপল সীমান্ত। সেখানেই পশ্চিম বর্ধমান জেলা প্রশাসনের কর্তারা মুন্নিকে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কর্তাদের হাতে তুলে দিয়ে ঈদের তোফা দিয়ে এসেছেন। বাস্তবের এই মুন্নির জীবন কাহিনির চিত্রনাট্য অনেকটা ভয়ঙ্কর। জানা গিয়েছে, বাংলাদেশের মুন্নি (নাম পরিবর্তিত) এক ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারের মেয়ে। বয়স মাত্র ১৩ বছর। বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো। কোনও কারণে গ্রামেরই এক গোরুপাচারকারির খপ্পরে পড়ে যায় সে। তাকে বলা হয়, সীমান্ত পার করে ভারতে গেলেই বিপুল টাকা রোজগারের সুযোগ রয়েছে। বিস্কুট কারখানায় লোক নিয়োগ হচ্ছে। মোটা মাইনে। অল্প বয়সী বালিকা টাকার টোপ গিলে তার সঙ্গে যেতে রাজি হয়ে যায়। অভিযোগ, বনগাঁ সীমান্ত এলাকা দিয়েই তাকে ভারতে বিক্রি করে দেয় সেই গোরু পাচারকারি। এরপর বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে একের পর এক হাত বদল হতে হতে সে এসে পৌঁছয় দুর্গাপুরে। ততদিনে সে বুঝে গিয়েছে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ফেরার রাস্তাও সব বন্ধ। মুন্নি পড়ে যায় ওড়িশার এক দম্পতির হাতে। হোটেলে দেহ ব্যবসায় নামিয়ে দেওয়া হয় তাকে। কাঁকসার একটি হোটেলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। গোপন সূত্রে বিষয়টি জানতে পারে দুর্গাপুর থানার পুলিস। ওই দম্পতিকে গ্রেপ্তার করে কাঁকসার হোটেল থেকে মুন্নিকে উদ্ধার করে পুলিস। তাকে পশ্চিম বর্ধমান চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির সামনে নিয়ম মেনে হাজির করানো হয়। তাকে পুরুলিয়ার হোমে পাঠানোর নির্দেশ দেয় কমিটি।
এখানেই কাহিনিটি শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু, মুন্নিকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফেরানোর মধ্যেই চিত্রনাট্যের সমাপ্তি চেয়েছে ডিস্ট্রিক্ট চাইল্ড প্রোটেকশন ইউনিট। মেয়েটির কাছে বিভিন্ন ভাবে জানতে চাওয়া হয় বাড়ির ঠিকানা। প্রথমের দিকে বলতে পারেনি। আতঙ্ক কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে সে। বেশ কিছু সময় পর বাংলাদেশের কথা বলে সে। সঙ্গে সঙ্গেই জেলা প্রশাসনের তরফে রাজ্য প্রশাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করা হয়। ক্রমেই নিজের জেলার নামও বলতে পারে মুন্নি। ফলে, আরও নির্দিষ্ট ভাবে বাংলাদেশে খবর পাঠানো হয়। সে দেশের প্রশাসন খুঁজে বের করে বাংলাদেশে থাকা মেয়েটির বাবা ও মাকে। মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁরা সেখানকার থানাতে নিখোঁজ ডায়েরি করেছিলেন। মুন্নির পরিবারের খোঁজ মিললেও তাকে ফেরানো খুব একটা সহজ ছিল না। শুরু হয় দু’দেশের মধ্যে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তারপরই আসে সুখবর। ঈদের আগেই মুন্নিকে বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠানোর দিন ঠিক হয়। সেই মতো জেলা প্রশাসনের টিম পুলিস এসকর্ট করে মুন্নিকে নিয়ে যায় বনগাঁ সীমান্তে। এপারের পুলিস প্রশাসনের কর্তাদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে মুন্নি ফিরে যায় নিজের দেশে। অতিরিক্ত জেলাশাসক সঞ্জয় পাল বলেন, ‘মেয়েটিকে পরিবারের কাছে ফেরাতে পেরে আমরা অনেকটাই স্বস্তিবোধ করছি।’