Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মেকি দেশভক্ত

১০০ দিনের কাজ (মনরেগা) অবিলম্বে চালু করতে হবে—কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশই বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে কাজ দ্রুত শুরুর ব্যাপারে আশাবাদী বাংলার মানুষ।

মেকি দেশভক্ত
  • ৩১ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

১০০ দিনের কাজ (মনরেগা) অবিলম্বে চালু করতে হবে—কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশই বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। ফলে কাজ দ্রুত শুরুর ব্যাপারে আশাবাদী বাংলার মানুষ। তবে বকেয়া অর্থ মেটানো নিয়ে ধোঁয়াশা এখনও অব্যাহত। আগামী দিনে উচ্চ আদালত এই বিষয়ে কী নির্দেশ দেয়, সেদিকেই নজর সকলের। কিন্তু এসবের মধ্যেই বাংলার বকেয়া প্রাপ্য নিয়ে গরমিলের অভিযোগ উঠল কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। রাজ্যের অভিযোগ অনুসারে, সেই গরমিলের অঙ্কটা প্রায় হাজার কোটি টাকার! ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে বাংলাকে মনরেগার টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে মোদি সরকার। এমনকি মনরেগা আইনের ২৭ নম্বর ধারা প্রয়োগে ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে নতুন করে শ্রমদিবস অনুমোদনও আটকে রাখা হয়েছে। রাজ্যের তরফে আগাগোড়াই হিসেব পেশ করা হয়েছে কাগজেকলমে। রাজ্য দিল্লিকে জানিয়েছে, কেন্দ্রের অনুমোদিত কাজ বাবদ এখনও বাংলার প্রাপ্য যে অর্থ আটকে আছে তার পরিমাণ ৬,৯১৯ কোটি টাকা। কিন্তু, কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের এনআরইজিএ-সফট পোর্টালে প্রদত্ত হিসেব দেখে অবাক রাজ্য প্রশাসন। কারণ, কেন্দ্রের হিসেবে এই বাবদ বাংলার কাছে তাদের বকেয়া মাত্র ৬ হাজার ২ কোটি টাকা। অর্থাৎ নবান্নের হিসেব মতো, বাংলার গরিব মানুষের ৯১৭ কোটি টাকা উধাও! স্বভাবতই, বিষয়টি নিয়ে রাজ্য প্রশাসন ইতিমধ্যেই সরব হয়েছে।  

Advertisement

সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী প্রদীপ মজুমদার তাঁর স্বাভাবিক ক্ষোভ উগরে দিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না। শ্রমদিবস সৃষ্টি বা এই সংক্রান্ত ইশ্যু নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে কোনও মতপার্থক্য তৈরি হলে, দু-পক্ষের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়াই রীতি। রাজ্য থেকে দিল্লিকে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট তথ্য পরিসংখ্যান রয়েছে পোর্টালেও। বিভিন্ন বৈঠকেও রাজ্যের বকেয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। সবখানেই ৬,৯১৯ কোটি টাকার হিসেব দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রকে। তা সত্ত্বেও এখন শেষবেলায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার হিসেব কম দেখানো হচ্ছে!’ রাজ্যের মানুষ এই অন্যায় মেনে নেবেন কেন? বাংলা নানা খাতে বঞ্চনার শিকার বরাবরই। কারণ স্বাধীনতার পর থেকে বেশিরভাগ সময়ই পশ্চিমবঙ্গে ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন’ (কেন্দ্রের শাসক দলের বিরোধী) সরকার তৈরি হয়েছে। বিধানচন্দ্র রায় এবং সিদ্ধার্থশংকর রায়ের আমল বাদ দিলে বাকি সময়কালে মূলত অকংগ্রেসি কিংবা অবিজেপি সরকার বাংলা শাসন করেছে। এখন চলছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার, যারা বিজেপির বিরুদ্ধে গোড়া থেকেই খড়্গহস্ত এবং আপসহীন প্রতিবাদী। স্বভাবতই মোদি-শাহের কেন্দ্রীয় প্রশাসন এই সরকারকে কোনোভাবেই সহ্য করতে পারে না। রাজনৈতিক লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে বারবার পর্যুদস্ত হয়ে এই সরকার বাংলার মানুষকে নানাভাবে কষ্ট দিচ্ছে। তার আগে জ্যোতি বসু এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সিপিএম সরকারকে ভুগিয়েছেন ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে একাধিক কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী। সব মিলিয়ে ভোগান্তি চলছে বাংলার মানুষের। কেন্দ্রের বিরোধিতা, অসহযোগিতা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি হয়েছে উন্নয়ন এবং জনমুখী কর্মসূচিগুলি। মোদিবাবুরা কংগ্রেসের নীতির মুণ্ডপাত করতে গিয়ে দাবি করেন, তাঁদের বিজেপি নাকি ‘পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স’! 
কী তার নমুনা? বাংলার সঙ্গে বঞ্চনা ও ষড়যন্ত্রমূলক কারবারে কংগ্রেসি জমানাকে বলে বলে দশ গোল দেয় মোদি সরকার। একদিকে, বছরের পর বছর মনরেগার টাকা পায়নি বাংলা। তার জন্য গরিব মানুষের লক্ষ লক্ষ শ্রমদিবস নষ্ট হয়েছে। বাংলাকে বঞ্চনা করা হয়েছে আরও একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকায়। যদিও-বা হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট করে বহুদিন বাদে মনরেগা বিবাদের একটা নিষ্পত্তির রাস্তা খুলল, তখন দেখা যাচ্ছে হিসেবে গরমিল! তাহলে বাংলাকে অন্যভাবেও নিষ্পেষণের কৌশল নিয়েছেন কি দিল্লিওয়ালারা? তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন, এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী এবং এর দ্বারা দিনের শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ। কারণ বাংলার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের উন্নয়ন ব্যাহত হলে দেশের সার্বিক উন্নয়নচিত্রে তার যে প্রভাব পড়ে তা মারাত্মক। এই নীতি আঁকড়ে থাকার একটাই অর্থ, দেশের সঙ্গে শত্রুতা! ভারত মাতার জয়ধ্বনি যাদের রাজনীতির ইউএসপি তারা এই কাণ্ড করে চলেছেন কোন কাণ্ডজ্ঞানে? তাঁদের দেশভক্তি নিছকই একটি রাজনৈতিক স্লোগান মাত্র নয় কি?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ