Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিফল চক্রান্ত, চাকরিহারাদের পাশে মমতাই

বিরোধীরা ভেবেছিল, আদালতে বিষয়টি উত্থাপন করলেই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘনের দায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। সেটা করতে পারলেই ছাব্বিশের নির্বাচনে বিপুল ফায়দা তুলতে পারবে বিরোধীরা। তাই যে কোনও মূল্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া বানচাল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল বিরোধীরা। তারজন্য তারা আদালতকে ‘ঢাল’ বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে।

বিফল চক্রান্ত, চাকরিহারাদের পাশে মমতাই
  • ২৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: লেবু বেশি কচলালে তেতো হয়ে যায়। সব কিছুরই একটা শেষ আছে। এই কথাগুলি বিরোধীরা মনে রাখলে নিয়োগ দুর্নীতি ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে এমন বেইজ্জতি হতে হতো না। ছাব্বিশে বাংলার বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে বাংলার বেকার যুবক-যুবতীদের চাকরি আটকে সরকারকে বিপাকে ফেলতে চেয়েছিল বিরোধীরা। কিন্তু, সেই চেষ্টায় জল ঢেলে দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বিরোধীরা কর্মপ্রার্থীদের রাজনৈতিক দাবার বোড়ে বানাতে চাইলেও আদালত চাইছে, বাংলার বেকারদের চাকরি হোক। 

Advertisement

দুর্নীতি হলে দোষীকে শাস্তি দেওয়াটাই দস্তুর। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগে দুর্নীতি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত। তাই রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় আজও জেলে। নিয়োগ দুর্নীতির বিষয়টিকে অসীম উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব অবশ্যই সিপিএম সাংসদ তথা বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের। তিনি উদাহরণ তুলে ধরে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, কীভাবে অযোগ্যদের চাকরি দেওয়া হয়েছে। শাসকঘনিষ্ঠ যত অযোগ্য চাকরি প্রাপকের নাম সামনে এনেছিলেন ততই উল্লসিত হয়েছিলেন প্যানেলের ওয়েটিং লিস্টে থাকা চাকরি প্রার্থীরা। তাঁরা মনে করেছিলেন, অযোগ্যদের ছেঁটে তাঁদের চাকরি পাওয়ার পথ প্রশস্ত করার জন্য লড়ছেন বিকাশরঞ্জনবাবু। কিন্তু তিনি যেদিন গোটা প্যানেল বাতিলের দাবিতে সওয়াল করলেন, সেদিনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তাঁর আসল উদ্দেশ্য। চাকরি প্রার্থীরা চেয়েছিলেন ন্যায়বিচার। কিন্তু তাঁরা হয়ে গেলেন রাজনীতির দাবার বোড়ে। রাজনীতির বিষয়টি আসার কারণ বিকাশরঞ্জনবাবু শুধু একজন আইনজীবীই নন, তিনি সিপিএমের প্রথম সারির নেতা। 
বিকাশরঞ্জনবাবু প্রথম থেকেই প্যালেন বাতিলের দাবিতে সরব ছিলেন। তিনি হয়তো মনে করেছিলেন, প্যানেল বাতিল হলে এটাকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি’ হিসেবে প্রমাণ করা যাবে। তাতে সিপিএমের সুবিধে হবে। তাঁর সেই আইনি লড়াইকে স্বীকৃতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। পাশাপাশি রাজ্যের ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে বলা হয়েছিল। 
লড়াইটা এখানে থেমে গেলে তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধীদের বড়জোর ‘চাকরি খেকো’ বলে কটাক্ষ করতে পারত, কিন্তু ‘নিয়োগ বিরোধী’ বলতে পারত না। অভিজ্ঞতার জন্য ১০ নম্বর দেওয়ার সরকারি বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানোয় রাজ্যের শাসক দল সেই সুযোগটা পেয়ে গেল। পাশাপাশি চাকরিহারা শিক্ষকদেরও তিনি বিরাগভাজন হলেন। কারণ রায় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে গেলে ক্ষতি হতো চাকরিহারাদেরই। তবে, যোগ্য শিক্ষকদের চাকরি যাওয়ার দায় অবশ্যই এসএসসি কর্তৃপক্ষ এবং রাজ্যের শিক্ষাদপ্তরের। তাতে সরকারের উপর ক্ষোভ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নতুন বিজ্ঞপ্তিতে চাকরিহারা যোগ্যরা বেশ কিছুটা সুবিধে পাবেন। 
প্রথমত, তাঁরা ‘ফ্রেস কান্ডিডেট’দের থেকে ১০ নম্বর এগিয়ে থেকে পরীক্ষায় বসবেন। দ্বিতীয়ত, ‘ক্লাসরুম টিচিং’ টেস্টেও তাঁরা এগিয়ে থাকবেন। কারণ তাঁরা কয়েক বছর ধরে ছাত্রছাত্রীদের পড়াচ্ছেন। তৃতীয়ত, নিয়মিত চর্চার মধ্যে থাকায় যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকারা ইন্টারভিউয়ের সময় যথাযথ উত্তর দেবেন বলেই আশা করা যায়। ফলে তাঁরা ‘ফ্রেসার্স’দের থেকে অনেকটা এগিয়ে থেকে দৌড় শুরু করবেন। এতদিন যাঁরা নেতাজি ইন্ডোরে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ নিয়ে কটাক্ষ করছিলেন তাঁরা এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্ল্যান এ, বি, সি, ডি আসলে কী।
চাকরিহারা আন্দোলনকারী যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অনেকেই দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় বসবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ১৫ হাজার যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যে মাত্র ১৭০০ জন আবেদন করেননি। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে চারশো জন তাঁদের পুরনো চাকরিতে ফিরে গিয়েছেন। এবার উচ্চ মাধ্যমিকে আবেদনকারীর ন্যূনতম নম্বর ৪৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। তাতে অনেকেই আবেদন করার অধিকার হারিয়েছেন। কেউ কেউ হয়তো নীতিগত কারণে দ্বিতীয়বার চাকরির পরীক্ষায় বসতে চাইছেন না।
তবে, এছাড়াও আবেদনকারী কম হওয়ার একটি কারণ উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কী সেই কারণ? অনেকে বলছেন, সিবিআই এবং এসএসসি কিছু পদ্ধতি মেনে ‘অযোগ্য’ বাছাই করেছে। সেই ছাঁকনি গলে হয়তো কেউ কেউ ‘যোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। কিন্তু, আসলে তাঁরা ‘অযোগ্য’। সেটা তাঁরা নিজেরা খুব ভালোই জানেন। তাই অপদস্থ হওয়ার ঝুঁকি নেননি। আবেদন না করার কারণ যাই হোক, বাস্তব হল অধিকাংশ চাকরিহারা শিক্ষক ফের পরীক্ষায় বসছেন। তাতে সরকারি নয়া নির্দেশিকায় তাঁরা সুবিধে পেলেও ফ্রেসার্সদের ক্ষতি হবে না। যদি সমস্ত চাকরিহারা নতুন প্রক্রিয়ায় চাকরি পান তাহলেও ফ্রেসার্সদের জন্য থাকছে ৩০ হাজারেরও বেশি পদ। সংখ্যাটা কম নয়।
 সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ খুব স্পষ্ট করে বলেছে, ‘আমাদের রায় ছিল নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে। কিন্তু সেখানে কীভাবে নিয়োগ হবে, সেটা নির্ধারণের দায়িত্ব এসএসসির।’ সওয়াল জবাব পর্বেই মামলার কী পরিণতি হতে চলেছে, সেটা অভিজ্ঞ বিকাশরঞ্জনবাবু বুঝে যান। তাই মাঝপথে মামলা প্রত্যাহার করে মুখরক্ষা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিচারপতিরা তাঁকে সেই সুযোগ দেননি। উল্টে এমন সব কথা শুনিয়ে তাঁরা মামলা খারিজ করে দিয়েছেন, যা অনেকের মতেই নজিরবিহীন।
বিচারপতিরা নিয়োগ দুর্নীতি ইস্যুতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিলেও রাজ্যের ছাত্রছাত্রীদের বিপাকে ফেলতে চাননি। তাঁরা জানতেন, দীর্ঘদিন এ রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। বহু স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ চলছে অতিথি শিক্ষক দিয়ে। তার উপর একলপ্তে হাজার হাজার শিক্ষকের চাকরি যাওয়ায় স্কুলগুলির পঠনপাঠন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার মুখে। তাই 
চাকরিহারা শিক্ষকদের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বহাল রাখার পাশাপাশি তারই মধ্যে নতুন নিয়োগ 
প্রক্রিয়া শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা যেটা উপলব্ধি করলেন, বাঙালি হয়েও বিকাশবাবুরা সেটা বুঝতে পারলেন না কেন?
নতুন নিয়োগ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারির সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীরা প্রচার করেছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিক্ষক নিয়োগ করতে চাইছেন না। চাকরিহারাদের বিশেষ সুবিধে দেওয়ার নামে অভিজ্ঞতার জন্য ১০নম্বর ধার্য করে আদালতে যাওয়ার রাস্তা খুলে দিচ্ছেন। বিরোধীরা ভেবেছিল, আদালতে বিষয়টি উত্থাপন করলেই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘনের দায়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে। সেটা করতে পারলেই ছাব্বিশের নির্বাচনে বিপুল ফায়দা তুলতে পারবে বিরোধীরা। অন্যদিকে, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ৪৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শেষ অস্ত্রটিও হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই যে কোনও মূল্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া বানচাল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল বিরোধীরা। তারজন্য তারা আদালতকে ‘ঢাল’ বানাতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। 
এখন বিচার্য বিষয়টি হল, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় বাংলার রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে? নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে মূল লড়াইটা লড়েছেন সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাই দুর্নীতি প্রমাণের কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছিল ‘রেড ব্রিগেড’। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট গোটা প্যানেল বাতিল করার দিকে এগচ্ছে বুঝতে পারা মাত্র সিপিএম ‘ব্যাক গিয়ার’ দিতে শুরু করেছিল। কারণ আলিমুদ্দিনের ম্যানেজাররা বুঝেছিলেন, একলপ্তে হাজার হাজার যুবক-যুবতীর চাকরি গেলে তার পরোক্ষ দায় সিপিএমের উপর চাপবে। তাই তড়িঘড়ি সাংবাদিক সম্মেলন করে এসএফআই নেতৃত্ব জানিয়ে দিয়েছিল, চাকরি বাতিলের দাবি একান্তই ‘আইনজীবী’ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের। তারা গোটা প্যানেল বাতিল চাইছে না। এসএফআই নেতৃত্ব বিকাশবাবুর আইনজীবী ও সিপিএম সত্তাকে আলাদাভাবে দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের দুধ আর জল আলাদা করার ক্ষমতা নেই। তারা বিকাশবাবুর লড়াইকে সিপিএমের স্ট্যান্ড বলেই মনে করে।
সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন বিকাশরঞ্জনবাবু। আবার সেই সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতি সঞ্জয় কুমার বিকাশবাবুকে সতর্ক করে দিলেন, ‘স্পেশাল লিভ পিটিশন কোনও জুয়া নয়। এটা বাজে অভ্যাস। এটা বন্ধ করতে হবে।’
শুধু সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ নয়, দেশের মহামান্য প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাইও রাজনৈতিক স্বার্থে আদালতকে ব্যবহার করার চেষ্টায় যৎপরনাস্তি ক্ষুব্ধ। তাঁর সাফ কথা, ‘রাজনৈতিক লড়াই আদালতে লড়বেন না। আদালতের বাইরে লড়াই করুন।’ প্রধান বিচারপতির কথাটা মনে রাখলে লাভ বিরোধীদের। লাভ বাংলারও।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ