মঙ্গলবার লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘প্রয়াগরাজে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘মহাকুম্ভ’ ভারতের ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ, গান্ধীজির ডান্ডি অভিযান (১৯৩০), ভগৎ সিংয়ের আত্মবলিদান (১৯৩১) এবং নেতাজির ‘দিল্লি চলো’র (১৯৪৩) মতোই একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। শিকাগো ধর্মমহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দের একটি ভাষণই হয়ে উঠেছে ভারতীয় অধ্যাত্ম চেতনার বিশ্বজয়ের মুহূর্ত। এগুলির মতোই প্রয়াগরাজ মহাকুম্ভ থেকে আমরা একটি জাগ্রত জাতির প্রতিফলন দেখতে পেলাম।’ প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, এসবের সঙ্গেই একাসনে বসার মতো এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হল এবারে প্রয়াগরাজের পূর্ণকুম্ভ। মোদি এই আশ্চর্য মন্তব্য করেছেন সংসদে দাঁড়িয়ে।
আমরা জানি, প্রয়াগ, হরিদ্বার, নাসিক ও উজ্জয়িনীতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কুম্ভ হয়। প্রতি ১২ বছর অন্তর একবার হয় ‘পূর্ণকুম্ভ’। তবু প্রয়াগের কুম্ভমেলা ২০২৫ শুরুর আগে থেকেই আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল হাজারো গাওনা বাজনা। তার মধ্যে প্রথম হচ্ছে নামকরণ। লোকে যেটাকে ‘পূর্ণকুম্ভ’ বলে জানে, তার নাম দেওয়া হল ‘মহাকুম্ভ’। অন্যবার যে বিশেষ স্নানকে ‘শাহিস্নান’ বলা হয়, তা এবার ‘অমৃতস্নান’। গেরুয়া মহল থেকে দাবি করা হল—পুণ্যার্থীর সমাগমে এবং বাণিজ্যে সর্বকালীন রেকর্ড গড়বে ‘মহাকুম্ভ’! দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের দামামা তখন বেজে গিয়েছে। এবছরের শেষদিকে ভোট বিহারে। ২০২৬-এ নির্বাচন পশ্চিমবঙ্গ, অসম, তামিলনাড়ু, কেরলের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলিতে। তাই রাজনৈতিক বাণিজ্য-ভাবনাতেও মহাকুম্ভের স্থান এবার বিরাট। টানা তিনবার কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় বিজেপি। আর এখানেই সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হল, দিল্লির ক্ষমতা তাদের অধরা ছিল দীর্ঘকাল। দেশের রাজধানীর বুকে দীর্ঘদিন যাবৎ গদা ঘুরিয়ে যাচ্ছিলেন ‘প্রান্তিক দল’ আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এই হিসেব এবার উল্টে দেওয়ার পণ নিয়ে গেরুয়া শিবির যত কৌশল নিয়েছিল তারই একটি ছিল ‘মহাকুম্ভ’। ত্রিবেণীসঙ্গমে অসংখ্য পুণ্যার্থীর সমাগম হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ কোনও নতুন প্রবণতা নয়, স্মরণাতীতকালের ঐতিহ্য। তবু এবারের কুম্ভমেলাকে এক নবরূপ দিতে মরিয়া ছিল মোদি বাহিনী। তার উদ্দেশ্য পুরোটাই রাজনৈতিক। মোদি এতদিন নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ প্রজেক্ট করেছেন। সেই ‘ভারতেশ্বর’ যদি এবারের কুম্ভে ‘অলৌকিক’ না হয়ে উঠতে পারেন তবে তো গেরুয়া শিবিরের যাবতীয় কসরতের ষোলো আনাই মাটি! তাই মেলা শুরুর আগে থেকেই আরম্ভ হয়েছিল ‘সাফল্য’ তুলে ধরার ঢক্কানিনাদ। মোদি-শাহ-যোগীর ম্যাজিকে সিলমোহর দিতেই তৎপর ছিল স্বার্থান্বেষী মহল। এই ‘ত্রিরত্ন’-এর ভিতরে আবার নরেন্দ্র মোদি যে একেবারে আলাদা, গোটাটাই যে তাঁর ভাবনারই প্রতিচ্ছবি, সেই বার্তাও রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল সংগঠিতভাবে এবং সুকৌশলে। মিডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যোগী বলেন, ‘ভারতের ঐতিহ্যের যথাযথ সম্মান পাওয়া উচিত। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে সরকার যে সম্মান করে এটা তারই অনন্য উদাহরণ। প্রয়াগরাজে মহাকুম্ভের অনুষ্ঠানে গোটা বিশ্ব যা দেখছে তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাবনারই প্রতিচ্ছবি।’ ইউপির মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই মহাকুম্ভ আয়োজনের মাধ্যমে উত্তরপ্রদেশ তথা গোটা দেশের কাছে যে ঐক্যের বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছি তার জন্য গর্বিত আমরা।’ ১৯ জানুয়ারি, ২০২৫ সালের প্রথম ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে মহাকুম্ভের ভূয়সী স্তুতি শোনা গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীরও কণ্ঠে। তাঁর কথায়, ‘এই মেগা ইভেন্ট ‘অবিস্মরণীয়’। জনসমাগমের যে ‘অকল্পনীয় দৃশ্য’ ফুটে উঠছে তাতে পরিপূর্ণ সাম্য এবং সম্প্রীতির এক ‘অসাধারণ’ সঙ্গম হয়ে উঠেছে প্রয়াগরাজ।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এবার, বিপুল সংখ্যক যুবক কুম্ভে অংশগ্রহণ করছেন। তাঁরা যখন এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎই নিশ্চিত হয়। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় কুম্ভ সমস্ত ভারতীয়ের জন্য একটি গর্বের মুহূর্ত!’
এতক্ষণ পর্যন্ত যে বর্ণনা পাওয়া গেল, তা নিতান্তই প্রচারসর্বস্ব, শুধু ‘আমাকে দেখো’—তার ভিতরে কোটি কোটি মানুষের ভিড় নিয়ন্ত্রণের, সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে সাঙ্গ করার কোনও বার্তা ছিল না। প্রধানমনন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীসহ হাতেগোনা কয়েকজন ভিভিআইপিকে কেন্দ্র করে নানাবিধ আদিখ্যেতাও সামনে আসে। আর এসবের নীচেই চাপা পড়ে যায় সাধারণ ভক্তদের নিরাপত্তা। সরকারি প্রশাসনের এই অদূরদর্শিতা, ব্যর্থতা কী মারাত্মক হতে পারে, সেটাই দেখিয়ে দিয়েছিল ত্রিবেণীসঙ্গম আর নিউদিল্লি স্টেশনে মৃত্যুর মিছিল, অগণিত মানুষের হাহাকার, আর খবর চেপে দেওয়ার দুর্মর চেষ্টা। ‘মহাকুম্ভ’ যাদের কারণে ‘মহাবিপর্যয়’ হয়ে ওঠে দেশ তাদের কাঠগড়ায় দেখতে চেয়েছিল। তাই মহাকুম্ভের শ্রেষ্ঠত্ব শতমুখে প্রচারের পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল, মহাবিপর্যয়ের দায় মেনে নিয়ে দেশবাসী, পুণ্যার্থীদের কাছে দুঃখপ্রকাশ এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা। কিন্তু তিনি সে পথে না হেঁটে মহাবিপর্যয়ের দিকগুলি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেলেন, যেভাবে বছরের পর বছর দেশবাসীর দুর্দশার দিকগুলি তিনি উপেক্ষা করেন সযত্নে। তাই আমরা দুঃখিত, প্রধানমন্ত্রীর এই অমানবিক মুখকে কোনোভাবেই উজ্জ্বল বলতে পারলাম না।