Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

নতুন বইয়ের পাতা ওলটানোর ফাঁকে চোখ মোবাইলের স্ক্রিনে

দৃশ্য এক: বইমেলার দুপুর। চড়া রোদে ভিড় কিছু নিস্তেজ। মোবাইলে চোখ রেখে এক যুগল হাঁটছেন। ফোন স্ক্রল করেই চলেছেন। হঠাৎ হুঁশ ফিরল দু’জনের।

নতুন বইয়ের পাতা ওলটানোর ফাঁকে চোখ মোবাইলের স্ক্রিনে
  • ২৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শুভজিৎ অধিকারী, কলকাতা: দৃশ্য এক: বইমেলার দুপুর। চড়া রোদে ভিড় কিছু নিস্তেজ। মোবাইলে চোখ রেখে এক যুগল হাঁটছেন। ফোন স্ক্রল করেই চলেছেন। হঠাৎ হুঁশ ফিরল দু’জনের। এদিক ওদিক তাকিয়ে কিছু খোঁজার চেষ্টা করলেন। ‘আরে কতবার বললাম, পত্রভারতীর স্টলে যাব’, চেঁচিয়ে উঠলেন তরুণী। আবার দু’জনে উলটো পথ ধরলেন। ফিরে যেতে যেতেও ফোনের স্ক্রিনে চোখ।

Advertisement

দৃশ্য দুই: বুধবার বিকেলে ভিড় তখন বেড়েছে। পছন্দের লেখকের বইয়ের সন্ধানে স্টলগুলিতে উঁকিঝুঁকি। কেউ কাঁধের ঝোলাব্যাগ ভরিয়ে ফেলেছেন ততক্ষণে। প্রতিভাসের স্টলের সামনে এক চিলতে বসার জায়গা। অনেকে বসে আছেন। বেশিরভাগের হাতেই নতুন কেনা বইয়ের বদলে মোবাইল। কেউ ভিডিয়ো কলে মেলায় আসার খবর দিতে ব্যস্ত। কেউ স্ক্রিনে হাত বুলিয়েই চলেছেন।

মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এসে বইয়ের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে কি? এই নিয়ে বহুদিনের বিতর্ক। সেই বিতর্ক মেটার নয়। মেলার ভিড় অবশ্য বলছে বইপ্রেমীদের সংখ্যা কিছুমাত্র কমেনি। কিন্তু নতুন বই নিয়ে উন্মাদনা? নতুন বইয়ের পাতার গন্ধ নেওয়া? সেই সব কি আগের মতোই আছে? বুক ফার্মের স্টল থেকে ‘আতঙ্ক সমগ্র’ কিনে বেরচ্ছিলেন বারুইপুরের তমালিকা দেবনাথ। বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে মেলায় এসেছেন। স্টলের সামনে দু’জনে বই হাতে সেলফি তুলছিলেন। কয়েক ঘণ্টা শুধু বই নিয়ে থাকা কি খুব অসম্ভব? তমালিকা বললেন, ‘বই তো বাড়িতে গিয়ে পড়বই। মেলায় এসে ছবি না তুললে কী করে হবে! কী বই কিনছি, সেটাও তো সকলকে জানাতে হবে।’ মনোবিদরা বলেন, ‘ডিজিটাল ডিটক্স’য়ের জন্য বইয়ের জুড়ি নেই। কিন্তু দু’সপ্তাহের বইমেলায় কি আদৌ তা হয়? ডিজিটাল ডিটক্সের বিষয়টিকেই মানতে নারাজ আন্দুলের ঋক প্রামাণিক। তাঁর মতে, মোবাইল ছাড়া থাকা সম্ভব নয়। বই ভালোবাসি, তাই আসি। টালিগঞ্জের সময়িতা রায়ের বক্তব্য, ‘মেলায় এলে কয়েক ঘণ্টা হলেও মানুষ ফোন ছেড়ে বই নিয়ে ভাবেন। তা কম কী?’

পত্রভারতীর স্টলে বই দেখতে দেখতে ফোনে চোখ কসবার অমৃতা সামন্তর। ফোনে কি বইয়ের নাম দেখছেন? প্রশ্ন শুনে বিব্রত। বললেন, ‘আসলে এটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছে। বই তো কিনব নিশ্চয়।’ অন্য একটি স্টলে বিক্রেতাদের মধ্যেই তখন তুমুল তর্ক, কোন মডেলের ফোনের ব্যাটারি বেশি ভালো তা নিয়ে। বুধবার মেলায় ভিড় কম নয়। গরমে নাজেহাল অনেকেই। তবুও মেলামাঠে ঘোরাঘুরিতে ক্লান্তি নেই।

এবছরও তন্ত্র সংক্রান্ত থ্রিলারের চাহিদা তুঙ্গে। তবে প্রচলিত বইয়ের বাইরে গিয়ে নজর কাড়ছে প্রতিক্ষণ। সেখানে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবির প্রতিরূপ কিনতে অনেকে ঢুঁ মারছেন। আছে অন্য শিল্পীদের আঁকা ছবিও। নজর কাড়ছে জীবনানন্দ দাশের অপ্রকাশিত ইংরেজি কবিতার খাতা ও প্রতিলিপি। ১০০ বছরের পুরানো খাতাটি দেখতে কেমন ছিল, মিলছে তার আন্দাজ।

পাঠক তাঁরা। দেখছেন। কিনছেন। বগলদাবা করছেন। কিন্তু তারপরই নজর সেই ফোনের স্ক্রিনে। জীবনটাই যে ডিজিটাল! তার ফাঁকেই নাকে আসছে নতুন বইয়ের গন্ধ। ওটাই আশা। একমাত্র ওষুধ। বিশল্যকরণী।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ