সংবাদদাতা, পুরুলিয়া: ‘মিস কেস’ বা ‘মিসলেনিয়াস কেস’ বিএলআরও অফিসে একটি চালু লব্জ। এই ‘মিস কেস’-এর জালে পড়ে হয়রানি বাড়ছে মানুষের। যে সব ক্ষেত্রে রেকর্ডে সংশোধন করার প্রয়োজন পড়ে সেই কেসগুলিকেই বলা হয় মিসলেনিয়াস কেস। অফিসের রেকর্ডে হয়তো কারও জমির পরিমাণ কম দেখানো হয়েছে। কারও পৈত্রিক সম্পত্তির দাবিদারের মধ্যে ভূতুড়ে নাম ঢুকে যাচ্ছে— এ সবই ‘মিস কেস’। এইসব সংশোধনের কাজ জমির মালিকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিএলআরও অফিসে এইসব সংশোধনী কাজ করাতে গেলেই হয়রানির একশেষ।
স্থানীয় সূত্রে জানাগিয়েছে, জেলার পুরুলিয়া ১ বিএলআরও অফিস থেকে শুরু করে জেলার অন্যান্য বিএলআরও অফিসেও মিস কেসের নাম করে সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন হয়রান করা হচ্ছে। পুরুলিয়া ১ এবং পুরুলিয়া ২ ব্লক শহর লাগোয়া হওয়ায় এইসব এলাকায় প্রমোটারদের দাপটও বেশি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভূমিদপ্তরে গিয়ে নিত্যদিন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে মানুষকে। পুরুলিয়া ১ ব্লকের এক বাসিন্দা জানান,পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমির মধ্যে হঠাৎ একজনের নাম ঢুকে গিয়েছে। যার সঙ্গে পরিবারের দূর দূরান্তেরকোনও সম্পর্কই নেই। কেউ জমি বিক্রিও করেননি। তারপরেও ভূতুড়ে একটা নাম ঢোকানো হয়েছে। সেই নাম রেকর্ড থেকে বাদ দেওয়ার জন্য বারবার আবেদন করেও কোনও সুরাহা হয়নি। পুরুলিয়া শহরের আমাডিহা এলাকার এক বাসিন্দা জানান, আরএস রেকর্ডে মোট ১ একরের বেশি জায়গার মধ্যে এলআর রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে সামান্য পরিমাণ জমি রয়েছে। ওই এক একর জমি সরকারি নথি থেকে উধাও। কী কারণে ওই জমি উধাও হয়ে গেল তার কেউ বলতে পারছেন না। সংশোধন করাতে একের পর এক অফিসে ছুটতে হচ্ছে। পুরুলিয়া ১ ব্লক এলাকার এক বাসিন্দা আবার জানান, ‘মিস কেস’-এর নামে বিএলআরও অফিসে দিনের পর দিন হয়রান হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কোনও রকম নথি ছাড়াই অন্য লোকের নামে রেকর্ড তুলে দেওয়া হচ্ছে। পুরোটাই হচ্ছে মোটা টাকার বিনিময়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুধুমাত্র পুরুলিয়া ১ নম্বর ব্লক নয়, জেলার অধিকাংশ ব্লক এলাকাতেই বিএলআরও অফিসে গিয়ে মানুষকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। একাধিক জায়গায় বিএলআরও অফিসের আধিকারিক এবং কর্মীদের একাংশের মদতে মিস কেস বা মিসলেনিয়াস কেসের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রান করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। সেই সঙ্গে এজেন্ট মারফত ভুল সংশোধন করে দেওয়ার জন্য মোটা টাকাও চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। কোথাও কোথাও আবার কর্মীরা নিজেরাই টাকা চাইছেন বলে অভিযোগ। এমনকী ফিল্ড ভেরিফিকেশন করতে যাওয়াআধিকারিকদের একাংশকেও দিতে হচ্ছে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা। তা না হলে বিভিন্ন অজুহাতে ফিল্ড ভেরিফিকেশনে যেতে চাইছেন না আধিকারিকদের একাংশ। তৃণমূল কংগ্রেসের পুরুলিয়া জেলার চেয়ারম্যান তথা পুরুলিয়া জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ হংসেশ্বর মাহাত বলেন, বিএলআরও অফিসগুলিতে মানুষকে প্রায়ই হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকী পৈত্রিক সম্পত্তি রেকর্ড করতেও হিমশিম খেতে হয় সাধারণ মানুষকে। শুধুমাত্র একটি বা দু’টি ব্লক নয়, গোটা জেলাজুড়ে বিএলআরও অফিসগুলি কমবেশি একই রোগে আক্রান্ত। অতিরিক্ত জেলাশাসক তথা ভূমি ও ভূমি সংস্কার আধিকারিক রাজেশ রাঠোর বলেন, নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে দ্রুত সে বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, মিস কেসের নামে হয়রানির অভিযোগ ঠিক নয়। জেলাতে অভিযোগ এলে দ্রুত তা নিষ্পত্তি করা হয়। সমস্ত বিএলআরও এবং এসডিএলআরও অফিসগুলিকে সতর্ক করে বলা হয়েছে উপযুক্ত নথি দেখেই সমস্ত কাজ করতে। তিনি আরও বলেন, মিসকেস সংক্রান্ত সব তথ্য রেকর্ড বিভাগে গেলেই বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। অন্যদিকে রেকর্ড বিভাগের দাবি, সব তথ্য একসঙ্গে করে দু’-একদিনের মধ্যেই জানানো হবে।