সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ‘তোলাবাজি চলবে না!’ ভোট প্রচারে বঙ্গে এসে গর্জে উঠেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। কিন্তু রাজ্যে পালাবদলের পর দু’মাস কাটতে না কাটতে দিকে দিকে বিজেপির নেতাদের বিরুদ্ধেই উঠতে শুরু করেছে তোলাবাজির অভিযোগ। ইতিমধ্যে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকারের মন্ত্রী থেকে বিধায়ক সকলে এব্যাপারে সতর্ক করেছেন। কিন্তু বুধবার বর্ধমানে রীতিমতো সাংবাদিক বৈঠক করে দলের নেতাদের তোলাবাজির বিরুদ্ধে একজোটে সরব হলেন বিজেপিরই কয়েকজন নেতা-কর্মী। তাঁদের অভিযোগ, শুধু বালিখাদ নয়, বর্ধমান শহরের তেলিপুকুর এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পর্যন্ত তোলাবাজি চলছে। তোলাবাজির প্রতিবাদ করায় বিজেপিরই এক নেতার বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়েছে। অথচ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরঅস্ত, ওই নেতাকেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ওই নেতা-কর্মীদের সাফ বক্তব্য—তোলাবাজির বিষয়ে নেতৃত্বকে জানিয়েও লাভ হচ্ছে না। উলটে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাকেই সমর্থন করছেন শীর্ষ নেতারা।
বর্ধমান শহরের আদি বিজেপি নেতা মনোজকুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘যা চলছে সেটা বিজেপির সংস্কৃতি নয়। ৪ নম্বর মণ্ডলের এক নেতার নেতৃত্বে তোলাবাজি চলছে। বালিখাদ থেকে তোলা তুলছে। আবার লোকজনদের ডেকে নিয়ে এসে বলছে, ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হবে। কারও কারও কাছে থেকে আরও বেশি টাকা দাবি করছে। কোটি কোটি টাকা তোলা হচ্ছে। প্রতিবাদ করেছি বলে আমার বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়েছে। এসব নেতার মাথার উপর নিশ্চয়ই কারও হাত রয়েছে। তাছাড়া তো এসব চলতে পারে না।’ দলের নেতাদের এমন কাজে তিনি যারপরনাই হতাশ। তাঁর সাফ কথা, ‘বিজেপি করতে গিয়ে জেল খেটেছি। তৃণমূলের আমলে জরিমানা দিতে হয়েছে। বাড়িতে হামলা হয়েছে। রাজ্যে সরকার বদলের পরেও একই অবস্থা চলছে। ভাবতে অবাক লাগে শহরের একটি পানশালায় দলের প্রশিক্ষণ শিবির করা হচ্ছে। আমি ৪ নম্বর মণ্ডলের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। প্রতিবাদ করায় আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’ মনোজবাবুর গলায় আক্ষেপের সুর, ‘ ভেবেছিলাম বিজেপি এলে অবস্থার পরিবর্তন হবে। কিন্তু, এখন কেউ কেউ শেখ শাহাজাহান হতে চাইছে।’ অপর এক নেতা বুদ্ধদেব দাসের অভিযোগ, ‘প্রতিবাদ করায় দলের নেতা আমাকে হুমকি দিচ্ছে। যারা তোলাবাজি করছে, তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।’
কয়েকদিন আগে রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল, দুর্গাপুরের বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়, পাণ্ডবেশ্বরের বিধায়ক জিতেন্দ্র তেওয়ারি তোলাবাজি নিয়ে দলীয় কর্মীদের সতর্ক করেছিলেন। জিতেন্দ্র তো একথাও বলেছেন, ‘১৫ বছর শাসন করার পর তৃণমূল নেতারা যেমন গুন্ডা হয়েছিল, দু’মাসের মধ্যে আমাদের লোকজন তার থেকেও বড়ো গুন্ডা হওয়ার চেষ্টা করছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দিনে ডিম থেরাপি ব্যুমেরাং হয়ে আসবে।’ সেকথা যে অক্ষরে অক্ষরে সত্য, তার প্রমাণ মিলল এদিন। এপ্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানতে যোগাযোগ করা হলেও বিজেপির জেলা সভাপতি অভিজিৎ তা ফোন ধরেননি। তবে দলের এক নেতা জানিয়েছেন, যাঁরা সাংবাদিক বৈঠক করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। একজনকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন তৃণমূল নেতা দেবু টুডু। তিনি বলেন, ‘বিজেপির তোলাবাজি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের এক নেতাকে ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছিল। তিনি দিতে না পারায় আত্মহত্যা করেছেন।’ এই পরিবর্তনই কি মানুষ চেয়েছিল? প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস নেতা গৌরব সমাদ্দার।