Bartaman Logo
৪ জুন, ২০২৬
বর্তমান / হেলথ

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে জানলে বদলে যাবে ব্রেন!

কৃতজ্ঞতার চর্চা মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করে, নতুন গবেষণায় প্রমাণিত। ৩০০ তরুণ-তরুণীর ওপর করা গবেষণার ফলাফল জানুন। বিস্তারিত পড়ুন।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে জানলে বদলে যাবে ব্রেন!
  • ৪ জুন, ২০২৬ ০৪:০০

কৃতজ্ঞতা কি সত্যিই মানসিক স্বাস্থ্য ভালো করে—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন দুই মার্কিন মনোবিজ্ঞানী জোয়েল ওং ও জশুয়া ব্রাউন। তাঁরা কৃতজ্ঞতার অনুশীলন কীভাবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের কার্যপ্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের এই গবেষণার ফলাফল পরে ‘গ্রেটার গুড’ সাময়িকীতে ‘হাউ গ্র্যাটিচিউড চেঞ্জেস ইউ অ্যান্ড ইয়োর ব্রেন’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় অংশ নেন প্রায় ৩০০ তরুণ-তরুণী। অংশগ্রহণকারীরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং সেন্টারে মানসিক সহায়তা নিতে এসেছিলেন এবং বেশিরভাগই ভুগছিলেন বিষণ্ণতা ও উদ্বেগে।

Advertisement

গবেষণাটি কীভাবে করা হয়েছিল
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়। প্রথম দলকে বলা হয়, তিন সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে একজন ব্যক্তিকে একটি করে কৃতজ্ঞতার চিঠি লিখতে। দ্বিতীয় দলকে বলা হয়, নিজেদের জীবনের কষ্ট, হতাশা ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখতে। তৃতীয় দলকে শুধু কাউন্সেলিং দেওয়া হয়। কিছু লিখতে বলা হয়নি। চার ও ১২ সপ্তাহ পর দেখা গেল, যাঁরা কৃতজ্ঞতার চিঠি লিখেছিলেন, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি অন্য দুই দলের তুলনায় স্পষ্টভাবে বেশি। অর্থাৎ শুধু কাউন্সেলিংয়ের চেয়ে কাউন্সেলিংয়ের সঙ্গে কৃতজ্ঞতা চর্চা যুক্ত করলে ফল আরও ভালো হয়।
কৃতজ্ঞতা কীভাবে কাজ করে
১. নেতিবাচক আবেগ থেকে মুক্তি
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কৃতজ্ঞতার চিঠি লেখার সময় অংশগ্রহণকারীরা তুলনামূলকভাবে কম নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল, যাঁরা কম নেতিবাচক অনুভূতির ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি বেশি হয়েছে। অর্থাৎ শুধু ইতিবাচক ভাবনা বাড়ালেই হয় না, বরং হিংসা, ক্ষোভ, হতাশা, আক্ষেপের মতো বিষাক্ত আবেগ থেকে মনকে সরিয়ে আনাই মূল চাবিকাঠি। কৃতজ্ঞতা আমাদের মনকে ধীরে ধীরে সেদিকেই ঠেলে দেয়, যেখানে আমরা বারবার নিজের কষ্ট নয়, অন্যের অবদান আর জীবনের ভালো দিকগুলোর দিকে তাকাই।
২. চিঠি পাঠানো জরুরি নয়, লেখাটাই আসল
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়েছিল, তাঁরা চাইলে চিঠি পাঠাতে পারেন। না পাঠালেও সমস্যা নেই। বাস্তবে দেখা গেছে, মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু যাঁরা পাঠাননি, তাঁরাও মানসিক উপকার পেয়েছেন। মানে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুফল অন্যের কাছে পৌঁছানোর ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং নিজের ভিতরের অনুভূতিটা তৈরি করাই মূল বিষয়। আপনি যদি কাউকে উদ্দেশ করে একটি কৃতজ্ঞতার চিঠি লিখতে চান, কিন্তু পাঠাতে সংকোচ বোধ করেন, তবু লিখুন। লেখার প্রক্রিয়াটাই আপনার মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
৩. ফল আসে ধীরে, কিন্তু স্থায়ী হয়
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চিঠি লেখার এক সপ্তাহ পর তেমন কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। কিন্তু ৪ সপ্তাহ পর উন্নতি স্পষ্ট হয়। ১২ সপ্তাহ পর সেই প্রভাব হয় আরও গভীর। এর অর্থ, কৃতজ্ঞতা কোনো তাত্ক্ষণিক ম্যাজিক নয়। এটি ধীরে ধীরে কাজ করে, কিন্তু ফল স্থায়ী। অনেকে হতাশ হয়ে বলেন, ‘কিছুদিন কৃতজ্ঞতা চর্চা করেও তো কিছু টের পেলাম না।’ গবেষণা বলছে, সময় দিন। সুফল পাবেনই।
৪. কৃতজ্ঞতা মস্তিষ্কের গঠন ও কাজ বদলায়
তিন মাস পর অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখা যায়, যাঁরা কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন তাঁদের মস্তিষ্কের ‘মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অংশটি বেশি সক্রিয়। এ অংশটি শেখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সামাজিক অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। 
আমরা কেন এত কম কৃতজ্ঞ হই
আমাদের বেশির ভাগ সময় ও শক্তি ব্যয় হয় যা নেই, যা হয়নি, যা হতে পারত—এইসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে। কৃতজ্ঞতা এই দৃষ্টিভঙ্গিটাকে উল্টে দেয়। এটি শেখায়, যা আছে, যা পেয়েছি, যাঁরা পাশে আছেন, সেসবকে মূল্য দিতে। এই মানসিক পরিবর্তনই ধীরে ধীরে ভিতরের চাপ, হতাশা ও বিষণ্ণতা কমায়।
কীভাবে শুরু করবেন কৃতজ্ঞতা চর্চা
প্রতিরাতে তিনটি ভালো ঘটনার কথা লিখুন। সপ্তাহে একবার কাউকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চিঠি লিখুন। দিনে একবার নিজেকে প্রশ্ন করুন, আজ আমি কী পেয়েছি? এইসব ছোট অভ্যাসই ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সুরজিৎ মুখোপাধ্যায়

সম্পর্কিত সংবাদ