বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: শুধুই কি মধ্যবিত্তের রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ২৯ টাকা বৃদ্ধি? মূল্যবৃদ্ধির বাজারে কেন্দ্রীয় সরকারি কোপের এখানেই শেষ নয়। মোদি সরকার এবার বড়োসড়ো আঘাত হানল প্রান্তিক মানুষের হেঁশেলেও। দেশের সাড়ে ১০ কোটির বেশি উজ্জ্বলা গ্রাহকের জন্য আগে বছরে ন’টি সিলিন্ডারে ভরতুকি বরাদ্দ ছিল। এখন তা নামিয়ে আনা হল মাত্র চারটিতে। এর আগে সিলিন্ডার পিছু ৩০০ টাকা হারে বছরে সর্বাধিক ২ হাজার ৭০০ টাকা ভরতুকি পেতেন উজ্জ্বলা গ্রাহকরা। এবার তা কমিয়ে সীমা বেঁধে দেওয়া হল ১ হাজার ২০০ টাকায়। অর্থাৎ বছরে দেড় হাজার টাকা ভরতুকি কম মিলবে। আচ্ছে দিনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া মোদি সরকারের এই পদক্ষেপে যথেষ্ট ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। কেন্দ্র এতদিন প্রচার করে এসেছে, দূষণ রোধ এবং কাঠের উনুনের ধোঁয়ার কারণে মা-বোনেদের চোখের জল মোছার লক্ষ্যেই তারা এনেছে উজ্জ্বলা যোজনা। ভরতুকির অঙ্কের কারণেই উজ্জ্বলা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়েছে গরিবের কাছে। কম দামে সিলিন্ডার পেয়ে আর কাঠ বা কয়লার ভরসায় থাকেন না মহিলারা। গ্রাহকদের একাংশের বক্তব্য, যাঁদের জন্য এতো কাণ্ড, ভরতুকি কমিয়ে সেই মহিলাদেরই আবার চোখের জল ফেলার ব্যবস্থা করে দিল মোদি সরকার।
ইরান ও আমেরিকার যুদ্ধ-পর্ব শুরু হতেই রান্নার গ্যাস নিয়ে নানা হুজ্জুতির মুখে পড়তে হচ্ছে গ্রাহকদের। একবার সিলিন্ডার ডেলিভারির পর শহরে ২৫ দিন এবং গ্রামাঞ্চলে ৪৫ দিনের আগে পরেরটির বুকিং করা যাচ্ছে না। আবার বুকিং করলেও, গ্যাস পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। সাধারণ ও উজ্জ্বলা—সব শ্রেণির গ্রাহককেই এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এরই মধ্যে দু’দফায় দাম বাড়ানো হয়েছে সিলিন্ডারের। ৭ মার্চ ১৪.২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছিল ৬০ টাকা। ঠিক তিন মাস পর ৭ জুন বাড়ানো হয় আরও ২৯ টাকা। বর্তমানে কলকাতায় সিলিন্ডারের দাম হয়েছে ৯৬৮ টাকা। উজ্জ্বলা যোজনার গ্রাহকদেরও বাজার থেকে এই দরেই সিলিন্ডার কিনতে হবে। তারপর ৩০০ টাকা ভরতুকি মিলবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট মারফত। এবার সেটাও হবে মাত্র চারটি সিলিন্ডার পর্যন্ত। তারপর পুরো দামেই সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য থাকবেন উজ্জ্বলা গ্রাহকরা।
এর সূচনা অবশ্য ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের জন্য বাজেট পেশের সময়ই করে রেখেছিল কেন্দ্র। তখন সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, উজ্জ্বলায় ভরতুকির সিলিন্ডার বছরে ১২ থেকে কমিয়ে ৯ করা হচ্ছে। পরে তা মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায়। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট ঘোষণায় নতুন করে সিলিন্ডারের সংখ্যা কমানোর কথা ঘোষণা করেনি কেন্দ্র। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভরতুকির সিলিন্ডারের সংখ্যা যে কমানো হতে পারে, তার ইঙ্গিত ছিল পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের বাজেট বরাদ্দতেই। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের জন্য উজ্জ্বলার ভরতুকি বাবদ বরাদ্দ হয়েছিল ১২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। খরচও হয়েছিল প্রায় পুরোটাই। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেট ঘোষণায় উজ্জ্বলার জন্য ৯ হাজার ১০০ টাকা বরাদ্দ করা হলেও, পরবর্তীকালে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১২ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য এ পর্যন্ত বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজেট ছাঁটাই হয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের কথায়, যুদ্ধ-পরিস্থিতিকে সামনে রেখে এবং কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সঙ্গেই উজ্জ্বলার ভরতুকি ছাঁটাই করা হয়েছে। কিন্তু এই ‘পরিকল্পনা’ যে যুদ্ধের আগেই হয়েছিল, তা স্পষ্ট কেন্দ্রীয় হিসাবে।