Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নিজ দেশে পরবাসী

দেশভাগের পর কেটে গিয়েছে ৭৮ বছর। এই সুদীর্ঘকালেও পূর্ববঙ্গের সর্বহারা উদ্বাস্তুদের ভারতে নাগরিকত্ব সমস্যা মেটেনি। এই লক্ষ লক্ষ মানুষকে সুরাহা দেওয়ার ব্যাপারে নেহরু থেকে মোদি, কেন্দ্রের রকমারি সরকার হরেক রকমের কথা বলেছে।

নিজ দেশে পরবাসী
  • ২৬ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশভাগের পর কেটে গিয়েছে ৭৮ বছর। এই সুদীর্ঘকালেও পূর্ববঙ্গের সর্বহারা উদ্বাস্তুদের ভারতে নাগরিকত্ব সমস্যা মেটেনি। এই লক্ষ লক্ষ মানুষকে সুরাহা দেওয়ার ব্যাপারে নেহরু থেকে মোদি, কেন্দ্রের রকমারি সরকার হরেক রকমের কথা বলেছে। কিন্তু তারা না পেয়েছে উপযুক্ত পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ, না পেয়েছে ভারতের নাগরিকত্ব। কিছু সম্পন্ন পরিবার কৌশলে গুছিয়ে নিয়েছে হয়তো, কিন্তু বিপন্নতা আজও সঙ্গী অসংখ্য পরিবারের। বলা বাহুল্য, এই পরিবারগুলি মূলত দুঃস্থ, দরিদ্র। ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ তাদের সমান অধিকারের ভিত্তিতে গ্রহণ করেনি কোনোদিন, ভারতও তাদের দেগে দিয়েছে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে। অথচ এই হতভাগ্য মানুষগুলির বাপ-ঠাকুর্দারাও স্বাধীন ভারত গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। কোনও এক পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা হবেন, এমনটা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি তাঁরা। স্বাধীনতার জন্য দেশভাগ অনিবার্য হলে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আশ্বস্ত করেছিলেন যে, পাকিস্তান বাসযোগ্য মনে না-হলে যে-কেউ যেকোনও দিন ভারতে উঠে আসবেন। ভারত সরকারই তাদের যথার্থ পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু পুনর্বাসন দূর, ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভও যে একদিন আকাশের চাঁদের মতোই নাগালের বাইরে রয়ে যাবে, তা কেউ কখনও ভাবেনি। 

Advertisement

বস্তুত পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং নাগরিকত্ব মিলিয়ে উদ্বাস্তু জীবনকে ভারতের রাজনীতি এক নির্বাচনী পণ্যে পরিণত করেছে। ভোট এলেই উদ্বাস্তু পরিবারগুলির সামনে প্রতিশ্রুতির ডালি হাজির হয়। আর ভোট মিটলেই তা উধাও হয়ে যায় চুপিসারে। এবারও তার ব্যতিক্রম দেখছে না বাংলা। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (এসআইআর) বাংলায় কারও নাম বাদ পড়লেও কুছ পরোয়া নেই। একবার মাত্র ভোট দিতে পারবেন না। পরে সিএএ মারফতই দেওয়া হবে বহু আকাঙ্ক্ষার নাগরিকত্ব! অর্থাৎ ফের স্বমহিমায় হাজির নাগরিকত্বের ‘গাজর’। সৌজন্যে বঙ্গ বিজেপি। মূল টার্গেট মতুয়া ভোট। শুরু করা হয়েছে সিএএ ক্যাম্পও। কিন্তু, সেটাও যে মোদি-শাহের দলের নতুন এক জুমলা, তার প্রমাণ এই সংক্রান্ত সরকারি পরিসংখ্যান। দেশে সিএএ কার্যকর হয়েছে ছ-বছর আগে। কিন্তু সেই বিতর্কিত আইনে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বাংলার কজনকে নাগরিকত্ব দিয়েছে? মাত্র আটজন! তাও একবছর আগে। গত একবছরে অগ্রগতি এক ‘মহাশূন্য’। বিজেপি এবং কেন্দ্রের কথায় ভরসা করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সিএএ মারফত ৩২ হাজারের বেশি লোক আবেদন করেছে। কিন্তু শিকে আটজনের অতিরিক্ত কারও ভাগ্যেই ছেঁড়েনি। এই পরিস্থিতিতে বঙ্গ বিজেপির নাগরিকত্বের টোপ গিলে ভরসা করা কঠিন নয় কি? এসআইআর নামক এক সাক্ষাৎ বিপদের আবহে লক্ষ লক্ষ মতুয়া নরনারী এই প্রশ্নে ভয়ানক ক্ষুব্ধ। সিএএ, এসআইআর, এনআরসি প্রভৃতি গেরুয়া কৌশল নিয়ে বারবার তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সাফ সাফ বক্তব্য, মতুয়াসহ যে-সমস্ত উদ্বাস্তু মানুষ এরাজ্যে এবং এদেশে দীর্ঘদিন যাবৎ বসবাস করছেন, যাঁরা ভোট দিচ্ছেন, সরকার গঠনে অংশ নিচ্ছেন, তাঁদের নাগরিকত্বকে কেন বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলা হবে? তাঁরা তো এদেশেরই বৈধ নাগরিক। কেন তাঁদের ফের অগ্নিপরীক্ষায় বসতে হবে? কেন সিএএ মারফত নাগরিকত্বের জন্য তাঁরা আবেদন করতে যাবেন? এতে তাঁদের সুরাহার পরিবর্তে বিপন্নতাই বাড়বে। 
এই ইশ্যুতে মঙ্গলবারও নতুন করে সুর চড়িয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সাফ কথা, ‘সিএএ আসলে বিজেপির ঝোলানো এক গাজর। ওরা একদিকে নাগরিকত্বের জুজু দেখাচ্ছে আর অন্যদিকে সিএএর গাজর ঝুলিয়ে নির্বাচনী বৈতরণি পেরতে চাইছে।’ জননেত্রীর পরিষ্কার বক্তব্য, বাংলার বাসিন্দা, কোনও বৈধ নাগরিকের বিপন্নতা তিনি মেনে নেবেন না। এসআইআরে এক কোটি নাম ছাঁটার গেরুয়া চক্রান্ত সম্পর্কে তাঁর হুঁশিয়ারি, একজনও বৈধ নাগরিকের নাম বাদ গেলে তিনি তা বুঝে নেবেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য একইসঙ্গে মানবিক এবং আইনানুগ। এবার অন্তত বাঙালি উদ্বাস্তুদের সামনে রেখে ঘৃণ্য রাজনীতির অবসান হোক। বছর ঘুরলেই আমরা স্বাধীনতার আট দশক পূর্তির আয়োজন করব। স্বাধীনতার শতবর্ষও মাত্র দু-দশক দূরে। আর কতকাল দেশের মানুষকেই নিজ দেশে পরবাসী করে রাখবে রাষ্ট্র? এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া এবং ভাবমূর্তির। কোনও দায়িত্বশীল নাগরিকের পক্ষে এই নষ্ট সংস্কৃতি মেনে নেওয়া উচিত নয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ