নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ধাক্কার পর স্বস্তি! মমতা-মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে হাইকোর্টের সিবিআই তদন্তের নির্দেশ খারিজ। স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) মামলায় রাজ্য মন্ত্রিসভার অতিরিক্ত পদ (সুপারনিউমেরারি) তৈরির সিদ্ধান্ত বৈধ। এ নিয়ে কোনও সিবিআই তদন্ত হবে না। মঙ্গলবার স্পষ্ট ভাষায় এই রায় দিল দেশের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্টে জয় হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের। গত ৩ এপ্রিল এসএসসির ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ‘কলুষিত’ আখ্যা দিয়ে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক–শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল করেছে দেশের প্রধান বিচারপতিরই বেঞ্চ। কিন্তু সেই মামলার অন্য একটি অংশে (অতিরিক্ত পদ তৈরি) এদিন রাজ্যকে স্বস্তি দিল সুপ্রিম কোর্ট। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু এদিন বিকাশ ভবনে বলেন, ‘এই রায়ের ফলে সত্যের জয় হল।’
২০২২ সালে রাজ্য মন্ত্রিসভা ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হয়েছিল মামলা। তদানীন্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বেঞ্চ থেকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ ঘুরে ফের শীর্ষ আদালত—তিন বছর ধরে চলল মোকদ্দমা। হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ অবশ্য এই মামলায় স্রেফ তদন্তই নয়, প্রয়োজনে মন্ত্রিসভার সদস্যদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দিয়েছিল সিবিআইকে। এদিনও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে সুপ্রিম কোর্টের মনোভাব পরিবর্তনের মরিয়া চেষ্টা চালান আইনজীবী মণিন্দর সিং এবং বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। যোগ্যতা সত্ত্বেও যাঁরা চাকরি পাননি বলে অভিযোগ, তাঁদের হয়েই সওয়াল করেন দু’জনে। যদিও রাজ্যের আইনজীবী কপিল সিবাল জানান, ২০১৬’এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘অতিরিক্ত’ পদ তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শিক্ষাদপ্তর। ২০২২ সালের ৫ মে সেব্যাপারে অনুমোদন দেয় মমতা-মন্ত্রিসভা। তৈরি হয় ৬ হাজার ৮৬১টি ‘অতিরিক্ত’ শূন্যপদ। যদিও ওই পদে ওয়েটিং লিস্টের তালিকা তৈরি হয়েছে মাত্র। কাউকে নিয়োগ করা হয়নি।
উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে আদতে রাজ্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তেই সিলমোহর দেয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এবং বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চ। এপ্রসঙ্গে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭৪(২) এবং ১৬৩(৩) ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন প্রধান বিচারপতি। যেখানে স্পষ্ট বলা আছে, মন্ত্রিসভা যদি কোনও কিছু রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালকে সুপারিশ করে, তা কোনও আদালতের বিচার্য বিষয় নয়। শুনানির পর্যবেক্ষণে দেশের প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, রাজ্য সরকারের ক্যাবিনেট বৈঠকের সিদ্ধান্ত বৈধ কিনা, সেটা ঠিক করবে কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সি? এটাই কি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো? তাছাড়া মন্ত্রিসভার ওই সিদ্ধান্তে রাজ্যপালের সই রয়েছে। ফলে এই সিদ্ধান্তের কোনও বিষয় কোনও আদালত আলোচনাই করতে পারে না। ২০২৪ সালের ৭ মে দেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের বেঞ্চও সিবিআই তদন্তের উপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। এদিন বর্তমান প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্নার বেঞ্চ পুরো তদন্তের নির্দেশই খারিজ করে দিল।
এই মামলায় স্বস্তি মিললেও চাকরিহারাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক থামেনি। গোটা বিষয়টি নিয়ে অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। কয়েকদিন আগে দিল্লিতে তিনি সাক্ষাৎ করেছিলেন কয়েকজন চাকরিহারার সঙ্গে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার সরাসরি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে চিঠি লিখে নির্দোষদের চাকরি বহাল রাখার অনুরোধ করেছেন তিনি। আমেদাবাদে চলা এআইসিসি অধিবেশনের প্রস্তাবেও (রেজোলিউশন) এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করেন ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীররঞ্জন চৌধুরী এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। সিপিআই এম-এল লিবারেশনের দুই সাংসদও এনিয়ে চিঠি দিয়েছেন রাষ্ট্রপতিকে।