স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী: ‘সুন্দরী’— নিছক এই বিশেষণে তাঁকে বাঁধা যাবে না। তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর দেহবল্লরী, তাঁর হাঁটাচলা, কথা বলা, তাঁর চাউনি, সর্বোপরি তাঁর হাসি, পুরুষ তো বটেই, নারীদেরও বশ করতে পারত। তিনি রহস্যময়ী। ব্যক্তিত্বের এক অদৃশ্য প্রাচীর সর্বদা তাঁকে ঘিরে থাকত। যা টপকানো সাধারণ মানুষের তো বটেই, এমনকি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেউকেটাদের পক্ষেও ছিল অসম্ভব। যে কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন চর্চার বিষয়। তিনি বাঙালির হিরোইন সুচিত্রা সেন। ১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাশা’ ফ্লপ, তিনিও উধাও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে। এরপর জীবনের ৩৬টি বছর স্বেচ্ছায় অন্তরালবর্তিনী হয়েই কাটিয়ে দিলেন। বাইরে বেরলে একান্ত আপনজনেরাই তাঁর সঙ্গী হতেন। একহাত ঘোমটার আড়ালে মুখ ঢেকে রাখতেন। কেন? কী হয়েছিল তাঁর? হঠাৎ বলা নেই, কওয়া নেই সিনেমা থেকে স্বেচ্ছাবসরই বা নিলেন কেন? এসব নিয়ে তখন জোর গুঞ্জন বাঙালি সমাজে। কত মানুষ, কত সাংবাদিক দিনের পর দিন চেষ্টা করে গিয়েছেন তাঁর নাগাল পাওয়ার। কিন্তু তিনি ধরা দেননি। মহিলা মহলে আলোচনা হতো— নিশ্চয়ই কোনো রোগ হয়েছে, সেই চোখ ধাঁধানো রূপে পড়েছে কালির ছোপ। তাই তিনি দেখা দেন না। কিন্তু এর সত্যতা যাচাই করার কোনো উপায় রাখেননি তিনি। তাঁর পরিবার, মেয়ে, জামাই, নাতনিরাও ছিলেন চুপ। কিন্তু না, এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তার সাক্ষী বাংলাদেশের অভিনেতা আলমগীর। ১৯৮৯ সালে তিনি মহানায়িকার সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের জনপ্রিয় কাগজ ‘প্রথম আলো’-তে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর সেই অভিজ্ঞতার বিবরণ। সেরকম হলে তাঁর বিবরণে নিশ্চয়ই কিছু ইঙ্গিত মিলত। তা মেলেনি।
আসলে সুচিত্রা ছিলেন অত্যন্ত ‘মুডি’। তাঁর সঙ্গে কাজ করা সে যুগের বহু নামী নায়িকাই এ কথা বলেছেন। তাঁর সঙ্গে যেচে কথা বলতে যেতেন না কেউই। কী জানি বাবা মুড কেমন থাকবে! হয়তো চিনতেই পারবেন না। কী দরকার যেচে অপমানিত হতে যাওয়ার। এরকমটাই ছিল তাঁদের মনোভাব। রাজ কাপুরের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারেন যিনি, তাঁর কাছে অন্যরা তো নেহাতই শিশু। রাজ কাপুরের প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ লোকটিকে তাঁর পছন্দ হয়নি। এমনই ছিলেন সুচিত্রা। যাঁকে তাঁর পছন্দ হবে, তাঁর সঙ্গে তিনি প্রাণ খুলে মিশবেন। আর যাঁকে তাঁর পছন্দ হবে না, তাঁকে তিনি ধারেকাছে ঘেঁষতেই দেবেন না। রাজ কাপুর তাঁর কাছে এসেছিলেন একটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়ে। প্রস্তাবটি রেখেছিলেন একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে। সুচিত্রা চেয়ারে বসেছিলেন। রাজ কাপুর তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে এক তোড়া গোলাপ হাতে দিয়ে ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যেন প্রেম নিবেদন করছেন। অন্য যে কেউ হলে রাজ কাপুরের এই প্রস্তাবে গলে যেত। কিন্তু তিনি সুচিত্রা সেন। ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট আদিনাথ সেনের পুত্রবধূ। তাঁর রুচিবোধে বেধেছিল। তিনি বলেছিলেন, এ কেমন পুরুষ, যে মহিলার সামনে নতজানু হয়!
ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের প্রস্তাবও। সত্যজিৎ রায় ‘দেবী চৌধুরাণী’ ছবিটি বানাতে চেয়েছিলেন তাঁকে নায়িকা করে। কিন্তু শর্ত ছিল, যতদিন সেই ছবির কাজ চলবে ততদিন অন্য কোনো ছবিতে কাজ করা যাবে না। এদিকে সুচিত্রার হাতে তখন অন্য দু’টি ছবি রয়েছে। তাঁদের ডেট দেওয়া হয়ে গিয়েছে। সত্যজিৎ রায়ের প্রস্তাবে সাড়া দিলে সেই দুই প্রযোজককে বিপদে ফেলা হতো। তাঁর প্রফেশনালিজমে বেধেছিল এই শর্ত। কাজেই তিনি রাজি হননি।
একবার তো দীনেন গুপ্ত পরিচালিত ‘দেবী চৌধুরাণী’ ছবির আউটডোর শ্যুটিংয়ে এক বিখ্যাত ফোটোগ্রাফারের সঙ্গে সুচিত্রার ঝগড়াই বেধে গিয়েছিল। কারণ সেই ফোটোগ্রাফার তাঁকে না জানিয়ে তাঁর ছবি তুলেছিলেন। সুচিত্রা সেই ছবির ফিল্ম ফেলে দিতে বলেছিলেন। ছবি তোলা নিয়ে অদ্ভুত খুঁতখুঁতুনি ছিল মহানায়িকার। তাঁর ধারণা ছিল, অধিকাংশ ফোটোগ্রাফারই তাঁর মুখের অ্যাঙ্গেল বোঝে না। আবার ঠিক বিপরীত ঘটনা ঘটেছিল ফোটোগ্রাফার ধীরেন দেবের ক্ষেত্রে। তিনি ছিলেন সুচিত্রার একান্ত আস্থাভাজন। একবার ধীরেন দেব সুচিত্রার বাড়িতে গিয়ে বলেছিলেন, আপনার এমন একটা ছবি তুলতে চাই যা যুবকদের বুক কাঁপিয়ে দেবে। সুচিত্রা নিঃশব্দে তাঁর বাথরুমে ঢুকে গিয়েছিলেন। তারপর ধীরেন দেবকে ডেকে নিয়েছিলেন ভিতরে। ধীরেন দেব সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন, তিনি ঢুকে দেখলেন সুচিত্রা সেন একটি মাত্র তোয়ালে বুকে বেঁধে দাঁড়িয়ে। তা ছাড়া আর কোনো পোশাক শরীরে নেই। অসীম সাহসে ভর করে ধীরেনবাবু বললেন, ম্যাডাম গালে যদি একটা ‘নো কিস’ লেখা যায়... সেই অনুরোধও রেখেছিলেন মহানায়িকা। সত্যিই সে ছবি গোটা দেশের যুবকদের বুকে তুফান তুলে দিয়েছিল।
সময়টা ভাবুন একবার। তিনি যখন খ্যাতির চূড়ায় আরোহণ করছেন, তখন দেশের যুব সমাজ দিশাহীন। রাজ্যে চূড়ান্ত রাজনৈতিক উচ্ছৃঙ্খলতা চলছে। ১৯৫৪ সালের শুরুতে শিক্ষকরা রাজভবনের সামনে মাইনে ও ডিএ বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে বসলেন। বিধান রায়ের পুলিশ তাঁদের উপর গুলি, টিয়ার গ্যাস ছুড়ল। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখল, অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সে বছরের মাঝামাঝি ছাত্রদের আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠল রাজ্য। এদিকে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তু আসছে। তাদের থাকার জায়গা নেই, মুখে অন্ন নেই। খাদ্যের চূড়ান্ত সংকট চলছে। সেই বছরই মুক্তি পেল ‘অগ্নিপরীক্ষা’। প্রেমের এক মহাকাব্য। সামাজিক উচ্ছৃঙ্খলতার মধ্যে এ যেন সমস্যাকে ভুলে থাকার এক মহৌষধি। উত্তম-সুচিত্রার রোমান্সে পাগল হয়ে গেল হয়ে বাঙালি সমাজ। অথচ এই জুটিকে নিতে কত লোকে যে বারণ করেছিল খোকাদাকে অর্থাৎ পরিচালক বিভূতি লাহাকে, তার ইয়ত্তা নেই। সেই জুটিই পরবর্তী তিন দশক ধরে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে শাসন করবে কে ভেবেছিল!
অধুনা বাংলাদেশের পাবনা জেলায় নিতান্ত মধ্যবিত্ত এক পরিবারে জন্মেছিলেন রমা দাশগুপ্ত। দিনটা ছিল ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল। তাঁর বাবা ছিলেন শিক্ষক। প্রাথমিক শিক্ষা সেখানেই শুরু। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই রমার ব্যক্তিত্ব, সৌন্দর্য ফুটে উঠতে শুরু করে। তারপর বাংলাদেশ ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি অন্যান্য উদ্বাস্তু পরিবারের মতোই। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই রমার বিয়ে হয়ে যায় শিল্পপতি আদিনাথ সেনের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে। বিয়ের সাত বছর বাদে জন্মায় তাঁদের একমাত্র সন্তান শ্রীমতি, যাঁকে পরবর্তীকালে সবাই চেনেন মুনমুন নামে। স্বামী দিবানাথের উৎসাহেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যোগ দেন রমা। ১৯৫২ সালে প্রথম ছবি বীরেশ্বর বসু পরিচালিত ‘শেষ কোথায়’। যা ২২ বছর পরে ‘শ্রাবণ সন্ধ্যা’ নামে মুক্তি পেয়েছিল। সেই অর্থে তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি সুকুমার দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘সাত নম্বর কয়েদি’। সেই ছবিতেই তাঁর নাম বদলে রাখা হয় ‘সুচিত্রা’।
যে গুটিকয় মানুষ সুচিত্রার নাগাল পেতেন, তার মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরী। তিনি ছিলেন সুচিত্রার বন্ধু। সুচিত্রা তাঁকে জানিয়েছিলেন, বসন্ত চৌধুরীর বিপরীতে ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’ ছবিতে বিষ্ণুপ্রিয়ার চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে তাঁর জীবনে পরিবর্তন আসে। তারপর থেকে তিনি আর কোনো কিছুতেই বিচলিত হয়ে পড়তেন না। এক অসীম সাহস তাঁকে ভর করে। যা সারাজীবন তাঁকে ঘিরে ছিল। ‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য’ ছিল তাঁর জীবনের চতুর্থ ছবি। খুব চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গ’ অবলম্বনে ছবি হলে তিনি দামিনীর চরিত্রে অভিনয় করবেন। সে আর হয়ে ওঠেনি। উত্তমকুমার সম্বন্ধে বলেছিলেন, উত্তম আমার অত্যন্ত ভালো বন্ধু, তার বেশি কিছু না। তাঁর কেমন পুরুষ পছন্দ, এই প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, পুরুষ হবে শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিবান, সুরসিক।
সুচিত্রা সেন কতটা ‘মুডি’ ছিলেন তার একটা উদাহরণ দিয়েছিলেন অপর্ণা সেন, তাঁর এক সাক্ষাৎকারে। ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবির জন্য মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলেন সুচিত্রা। সেখান থেকে ফিরে কলকাতায় এক পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে সুচিত্রা ওই ছবির সেই বিখ্যাত দৃশ্য, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর কলহের মধ্যে সুচিত্রা সৌমিত্রর জামা টেনে ছিঁড়ে দিচ্ছেন, পার্টিতে হুবহু সেই রকম ভাবে সৌমিত্রর জামা টেনে ছিঁড়ে দেন সুচিত্রা। এই প্রসঙ্গে একটি কৌতূহলজনক ঘটনা শুনিয়েছিলেন স্বয়ং সুচিত্রা সেন। সাত পাকে বাঁধা ছবিটিতে ওইরকম কোনো দৃশ্যের পরিকল্পনা পরিচালকের ছিল না। এটি সম্পূর্ণই সুচিত্রার মস্তিষ্কপ্রসূত। যেদিন ওই দৃশ্যটির শ্যুটিং, সেদিন সকালে মহানায়িকার সঙ্গে স্বামী দিবানাথের খুব ঝগড়া হয়। ঝগড়ার সময়ে সুচিত্রা দিবানাথের জামা টেনে ছিঁড়ে দিয়েছিলেন। শ্যুটিংয়ে যখন সৌমিত্রর সঙ্গে তাঁর ঝগড়ার দৃশ্য গৃহীত হচ্ছে তখন মহানায়িকাই পরিচালককে বলেন, তিনি যদি সৌমিত্রর জামা টেনে ছিঁড়ে দেন তাহলে কেমন হয়! বলা বাহুল্য পরিচালক সেই পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন এবং তাতে দৃশ্যটি অন্য মাত্রা পেয়ে যায়।
আসলে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে একটা সময়ে সুচিত্রার মোহভঙ্গ হয়েছিল। তিনি ভালো পরিচালকের অভাব বোধ করছিলেন। পরিবেশও দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। যার সঙ্গে তিনি মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। বীতশ্রদ্ধ বোধ করছিলেন। ফলে প্রণয় পাশা ফ্লপ করতেই তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন অবসরের। আর জনসমক্ষে আসেননি। নিজের বাড়ির বাইরে বেলুড় মঠ, গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন আর মাঝেমধ্যে গঙ্গার তীরই ছিল তাঁর গন্তব্য। এমনকি মৃত্যুর পরও কেউ যাতে তাঁকে দেখতে না পারে, তার জন্য মহানায়িকার ইচ্ছানুসারে কফিনে শায়িত রাখা হয়েছিল তাঁর দেহ। ফিল্মি কেরিয়ারের শুরু থেকে যে রহস্যের মোড়কে নিজেকে রেখে দিয়েছিলেন, জীবনের শেষদিনেও সেই আবরণ সরাননি। তিনি চির-রহস্যময়ী।