নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: রাজা নেই। নেই রাজত্বও। ভাঙাচোরা রাজবাড়ি এখন নানা জীবজন্তুর আশ্রয়স্থল। কিন্তু, পুরনো প্রথা বজায় রেখেই তাম্রলিপ্ত রাজবাড়ি থেকে আজও ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় তরোয়াল সহ অধিবাস সামগ্রী বর্গভীমা মায়ের মন্দিরে পৌঁছয়। পুরোহিত ও ঢাকি সহযোগে পুজোর সামগ্রী রাজবাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয় মায়ের মন্দিরে। রাজার প্রতীক হিসেবে সঙ্গে থাকে একটি তরোয়াল। তাই দিয়ে নির্ঘণ্ট মেনে মায়ের অধিবাসপর্ব শুরু হয়। তারপর মহাসপ্তমী, সন্ধিপুজো ও মহানবমীতে রাজবাড়ি থেকে একটি করে পাঁঠা মায়ের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাচীন ধারা বজায় রেখে এখনও ওই তিন তিথিতে মায়ের কাছে তিনটি পাঁঠা বলি দেওয়া হয়। রাজবাড়ি থেকে আসা পাঁঠা সবার আগে বলি দেওয়া হয়। তারপর ভক্তদের মানত করা থাকলে অতিরিক্ত পাঁঠা বলি হয়। পুজো এলেই রাজবাড়ির সঙ্গে বর্গভীমা মায়ের মন্দিরের বহু প্রাচীন সম্পর্ক চাক্ষুষ করা যায়।
পুজোর চারদিন মা বর্গভীমা দুর্গারূপে পূজিতা হন। নির্ঘণ্ট মেনেই বর্গভীমা মায়ের মূর্তিকেই দেবী দুর্গারূপে পুজো করা হয়। সাধারণত, সকাল ৭টায় মন্দিরের গেট খোলা হয়। তবে, দুর্গাপুজোর চারদিন সকাল ৬টায় মন্দির খুলে দেওয়া হয়। এদিন মন্দিরে কয়েক হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে। ষষ্ঠীতে অধিবাস হয়। রাজবাড়ি থেকেই তার সামগ্রী আসে। এখানে অস্ত্রপুজো করা হয়। মা বর্গভীমা তমলুকের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। বলা হয়, তাম্রলিপ্ত জনপদ প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠিত। এটি অন্যতম জাগ্রত ও প্রধান শক্তিপীঠ। দেবীর ৫১পীঠের একটি। মেদিনীপুরের অনেক বিপ্লবী মাতৃভূমিকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার জন্য এখানে শপথ নিয়েছেন।
মহাষ্টমীর আরেক নাম হল ‘বীরাষ্টমী’। অর্থাৎ, বীরেরা ওইদিন অস্ত্রপুজো করতেন। তাই অস্ত্রপুজোর নিয়ম আছে। বর্গভীমা একটি শক্তিপীঠ হওয়ায় সেখানেও অস্ত্রপুজো হয়ে এসেছে। এখনও রাজপরিবার থেকে অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হয়। সেই অস্ত্রের পুজো দেওয়া হয়। কথিত আছে, তমলুকের পায়রাটুঙি থেকে শঙ্করআড়ার মাঝে বিস্তীর্ণ এলাকায় একটা সময় কোনও শক্তিপুজো হতো না। শুধুমাত্র বর্গভীমা মায়ের মন্দিরে শক্তির আরাধনা হতো। পরবর্তী সময়ে শক্তিপুজো শুরু হলেও উদ্যোক্তারা মায়ের কাছে প্রথম পুজো দিয়ে একপ্রকার অনুমতি আদায় করেন। এভাবেই দুর্গাপুজো থেকে কালীপুজো পর্যন্ত প্রায় সব পুজোর ক্ষেত্রে ক্লাব, বারোয়ারি পুজো কমিটি শোভাযাত্রা সহ মায়ের মন্দিরে পুজো দিতে আসে। সপ্তমীতে পুজো দেওয়ার জন্য ভিড় উপচে পড়ে।
পুজোর চারদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মায়ের মন্দিরে ভিড় লেগেই থাকে। সাধারণত, রাত সাড়ে ৮টায় মায়ের মন্দিরের গেট বন্ধ হয়ে যায়। পুজোর সময় অবশ্য গেট বন্ধ হতে রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা বেজে যায়। বর্তমানে মন্দিরের পরিকাঠামো প্রতি বছর একটু একটু করে উন্নত হচ্ছে। কুপনের মাধ্যমে মন্দিরের ভোগ সংগ্রহ করার ব্যবস্থা আছে। ৮৬৭০৩৪৫৬৮৮ নম্বরে ফোন করে ভোগের অর্ডার দেওয়া যায়। মূল্য ১১০টাকা। তবে, কুপন ভোগে শোলমাছ থাকে না।
বর্গভীমা মাতা মন্দির কমিটির সম্পাদক শিবাজী অধিকারী ও সভাপতি অরুণ অধিকারী বলেন, আলাদা করে কোনও মূর্তি গড়া হয় না। দেবী মূর্তিকেই দুর্গারূপে পুজো করা হয়। মহাস্নান থেকে পুজো, অঞ্জলি সবই নির্ঘণ্ট মেনে হয়। পুজোর কয়েকটা দিন ভক্ত সমাগম বেশি হয়। মন্দির কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি অতিরিক্ত ভলান্টিয়ার রাখা হয়। থানা থেকেও ফোর্স দেওয়া হয়।