রাজদীপ গোস্বামী, গড়বেতা: গড়বেতা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে ধাদিকা মোড়। সেই মোড় থেকে ডানদিকে ১২ কিলোমিটার গেলেই পড়বে তিনখুলা। সেই তিনখুলার বুক চিরে চলে যাওয়া পাকা রাস্তার ধারে আড়াই কিলোমিটার এগলেই ছোটো আঙারিয়া গ্রাম। আজ গ্রামের চারপাশে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতার ভাঁজে লুকিয়ে রয়েছে এক রক্তাক্ত অতীত। একদা এই গ্রামে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যালীলায় কেঁপে উঠেছিল গোটা দেশ। তখন গ্রামের চারপাশে বারুদের গন্ধ আর গুলির শব্দে বাসিন্দাদের ঘুম উড়ে যেত। আজ গ্রামে ফিরেছে শান্তি। কিন্তু অতীতের আর্তনাদ এখনও গ্রামবাসীদের কানে বাজে। কথায় আছে, কৃতকর্মের ফল ভুগতেই হয়। হয়তো তাই আজও গড়বেতার ছোট আঙারিয়ায় প্রচারে নামতে পারেনি সিপিএম। বর্তমানে রাজনৈতিক সমীকরণও বদলেছে। ওই এলাকার অনেকেই সিপিএম ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছে। তাই গ্রামে নেই বিজেপিরও প্রচার। জার্সি বদল করা নেতারাও গ্রামে ঢোকার সাহস পায়নি। গ্রামবাসীদের একাংশের মত, উন্নয়ন আর স্থিতিশীলতার স্বার্থে বর্তমান শাসককেই ফের চাইছেন তাঁরা। কারণ মমতার হাত ধরেই গ্রামে ফিরেছে শান্তি।
ছোট আঙারিয়া গ্রামে বক্তার মণ্ডলের বাড়িতে চলেছিল নৃশংস হত্যালীলা। বক্তার প্রয়াত। বর্তমানে সংসারের হাল ধরেছেন তাঁর স্ত্রী আনিশা মণ্ডল। তিনি বলেন, ওই দিনের স্মৃতি আজও টাটকা। নৃশংস হত্যালীলার সময় আতঙ্কে পালিয়ে গিয়েছিলাম। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলেছে। সিবিআইও আর কিছু করল না। খুব কষ্ট করেছি। আজ আমরা কিন্তু ভালোভাবেই আছি। তিনি আরও বলেন, তখন যারা সিপিএম করত, তাঁদের অনেকেই আজ বিজেপির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু জোর গলায় বলছি দিদিই জিতবে। সিপিএম বহু মানুষকে মেরেছে। সিপিএমেরই তো জাত ভাই বিজেপি। দুই দলই প্রচার করতে আসেনি। গ্রামের দূর দিয়ে প্রচার সেরেছে বলে শুনেছি।
অভিশপ্ত সেই দিনটা ছিল ২০০১ সালের ৪ জানুয়ারি। সন্ধ্যায় ছোট আঙারিয়া গ্রামের তৃণমূল কর্মী বক্তার মণ্ডলের বাড়িতে গোপনে বৈঠক চলছিল। সেই বৈঠকের খবর পৌঁছে যায় সিপিএম নেতাদের কানে। বক্তারের বাড়ির চারিপাশ ঘিরে ফেলে সিপিএমের হার্মাদ বাহিনী। শীতের রাতে অন্ধকারে হামলা চালানো হয়। গুলি, বোমা তো চলেছিলই। তারপর তৃণমূল কর্মীদের মৃত্যু নিশ্চিত করতে ঘরের দরজা আটকে বক্তারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় হার্মাদ বাহিনী। পাঁচজন তৃণমূল কর্মীর নৃশংস মৃত্যু হয়। রাতে খবর পেয়েও এলাকায় ঢুকতে পারেনি পুলিশ বাহিনী। তবে পরের দিন একমাত্র সংবাদ মাধ্যম ও পুলিশের আধিকারিকরা এলাকায় পৌঁছয়। গ্রামবাসীদের কথায়, অল্পের জন্য রক্ষা পায় বক্তার মণ্ডল ও তাঁর পরিবার। এই ঘটনার পর গ্রাম ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। আজ গ্রামে শান্তি ফিরে এলেও, ভয়ে গ্রামে ঢুকতে পারে না সিপিএম-বিজেপির নেতারা। ছোট আঙারিয়া কাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত সিপিএম নেতা তপন ঘোষ এবার ভোটে গড়বেতা বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী। তপনবাবু বলেন, ওই গ্রামে প্রচার করিনি। কারণ ওই এলাকায় তৃণমূল সন্ত্রাসের আবহ তৈরি করেছে। তৃণমূলের নেতাদের কাছে প্রচুর বন্দুকও রয়েছে। তবে প্রচারে ভালো সাড়া পাচ্ছি। বিজেপি প্রার্থী প্রদীপ লোধা বলেন, ওই এলাকায় প্রচার করিনি। খুব তাড়াতাড়ি যাব। তৃণমূল প্রার্থী উত্তরা সিংহ হাজরা বলেন, সিপিএমের সন্ত্রাস আজও মানুষ ভোলেনি। তবে এখন সিপিএমের জায়গা নিয়েছে বিজেপি। ওদের মানুষ পছন্দ করে না। বাড়ির সামনে বক্তারের স্ত্রী।