স্বার্ণিক দাস, কলকাতা: চকচকে রোদ। তার মধ্যে হঠাৎ ঝমঝম। আচমকা বৃষ্টি। নতুন জামাকাপড় পরে মানুষ তখন বেহালা নূতন দলের প্যান্ডেলের সামনে। রোদ-বৃষ্টির খেয়ালি খেলায় দিশাহারা। হইহই করে দৌড়। কোনওরকমে মণ্ডপের ভিতরে ঢুকে তবে রক্ষে। জামাকাপড় একটু ভিজেছে। ‘ও যাক গে, রোদ উঠলেই শুকিয়ে যাবে।’
ষষ্ঠীর দুপুর গড়িয়ে বিকেল। বৃষ্টি অনেক আগেই থেমে গিয়েছে। ভিড় উপচে পড়ছে বেহালার প্যান্ডেলগুলিতে। একের পর এক জিজ্ঞাসা— ‘বেহালা নতুন সংঘটা কোন দিকে?’ ‘ফ্রেন্ডস যাওয়ার রাস্তাটা বলবেন একটু?’ ‘আদর্শ পল্লিতে গেলে বাইক রাখার জায়গা পাওয়া যাবে তো?’ প্রশ্নবাণে জর্জরিত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মী থেকে সিভিক ভলান্টিয়ার। বেহালায় ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন বাসন্তীদেবী কলেজের একঝাঁক কলেজ ছাত্রী। অন্বেষা, সুনিষ্কা, অভিরূপা। তাঁরা ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত। এবার একটু বসলেন। গল্পে মশগুল। দুপুরের খাবার সেরেছেন জেমস লং সরণির একটি চীনা রেস্তরাঁতে। রাত পর্যন্ত ঘোরার প্ল্যান। তাই বিকেলে বসে চলছে রাতের জন্য রেস্তরাঁর খোঁজ। দুপুরে চীনে হয়েছে। রাতে মোগলাই হলেই ভালো, এই সব প্ল্যান চলছে। একজন বললেন, ‘নতুন জুতো রে। পায়ে ফোসকা পড়েছে। একটু কম হাঁটব কিন্তু।’
এদিকে পূর্বাভাস শুনিয়েছে আবহাওয়ার অবনতির খবর। অষ্টমী আর নবমী নাকি বৃষ্টি, এই পূর্বাভাস আগেই দিয়েছে হাওয়া অফিস। তার জেরেই কি ষষ্ঠীর দুপুর থেকে পুরোদমে প্যান্ডেল হপিং? এই প্রশ্ন করতেই বারাকপুর থেকে বেহালায় আসা জয়ন্ত-প্রগতি-স্বরূপা-পারমিতার বক্তব্য, ‘অলরেডি প্ল্যান সেট! অষ্টমীতে উত্তর কলকাতা। আর নবমীতে বান্ধবীর গ্রামের বাড়ির পুজোয় জমিয়ে আনন্দ। সঙ্গে ভোগ, ছবি তোলা সবই হবে। বৃষ্টি হোক বা না হোক আমরা অষ্টমী, নবমীতেও বেরবোই। দশমীতে জমিয়ে বিসর্জনের নাচও হবে।’ আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অসুর হয়ে দাঁড়িয়েছে তরুণ প্রজন্মের কাছে। কিন্তু তা বলে বিন্দুমাত্র যে টলাতে পেরেছে, তা নয়। দুর্গাপুজোয় বৃষ্টি হোক আর না হোক, হপিং চলছে। চলবেও।
বেহালা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে খিদিরপুর। সেখানে দুপুরে ভিড় খানিক কম। তা কি প্রচণ্ড গরমের কারণে। তাই বোধহয়। কারণ সূর্য অস্ত যেতেই ঢল নামতে শুরু করল বন্দর এলাকার পুজোগুলিতে। ২৫ পল্লি থেকে ৭৪ পল্লি—ঠাসা ভিড়। বাইরে গাড়ি পার্ক করা সামলাতে নাস্তানাবুদ পুলিশকর্মীরা। কসবা থেকে সপরিবারে খিদিরপুরের ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন সমীর পাঁজা। কোলে চার বছরের ছেলে সন্ধিৎসু। তার হাতে একটা ছোট বাঁশি। সারাক্ষণ প্যাঁ পোঁ করে বাজিয়েই চলেছে। হঠাৎ বলে, ‘তেন্দুয়া যাব। অত্তমীতে অনদলি দেব। বাবা বলেছে তেন্দু (কেন্দুয়া) যাব। তাঁদ (চাঁদ) দেথব।’ সন্ধিৎসুর মা এলিনা ছেলের কথা শুনে হেসে ফেললেন। বললেন, ‘ওর রেনকোটটা সঙ্গে এনেছি। আমাদের জন্য ছাতা আছেই। বৃষ্টি হলে হোক, অষ্টমী, নবমীতে ঠাকুর দেখব না, তা হবে না, তা হবে না। বৃষ্টি হলে রেস্তরাঁয় ঢুকে যাব বলে ঠিক করেছি আমরা। কিন্তু বেরচ্ছি, বেরিয়েছি, বেরবো।’