নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ডিসেম্বর শহর ছেড়েছে। জানুয়ারিও যায় যায়। শীতের চাদর ভাঁজ করে তুলে রাখা। রোদ এখন মোটেও মিঠে নয়। কিন্তু সান্তাক্লজ বরফের দেশে ফিরে যায়নি। তার ছুটি নেই। বাবা-মা-স্ত্রী-সন্তান রয়েছে পরিবারে। তাঁদের ভার তার উপর। সংসার চালাতে তাই বেরতেই হয়। সে রোদ চড়া হলেও বেরতে হয়। ঠান্ডায় হাড় কাঁপলেও বাড়িতে থাকার উপায় নেই।
লাল জামা বেজায় মোটা, রোদে দাঁড়ালে গরম লাগে। সাদা টুপি অস্বস্তিকর, কপাল ঘেমে যায়। লম্বা দাড়ি ঘেমে কুটকুট করে। তবুও রোদে দাঁড়ায় সান্তা। যার বাড়ি বরফে। যার গাড়ি স্লেজ। যার পোষ্য বলগা হরিণ। সেই সান্তাকেও বরফ মরশুম পেরিয়ে আসতে হয় কলকাতায়। বইমেলায় দাঁড়াতে হয়। তার কাউকে উপহার দেওয়া হয় না। উল্টে কেউ খুশি হয়ে দশ-বিশ টাকা দিলে তা নিয়ে ঘরে ফেরে সে। চারজনের সংসার। পেট চালাতে মাস গেলে খরচ ভালোই হয়। এই মাগ্গি-গণ্ডার বাজারে দিনভর খেটেও তাই কুল পান না সান্তা। মরিয়া হয়ে বলেন, ‘আমার নম্বরটা রাখুন না। কোনও অনুষ্ঠানে চাইলেই ডাকতে পারেন।’ বইমেলার সান্তার নাম নীলকণ্ঠ বিশ্বাস। অন্য কোনও মেলায় কোনওদিন তিনি জোকার হবেন। কোনো মেলায় কোনওদিন হবেন চার্লি। নীলকণ্ঠ বলেন, ‘আমি বহুরূপী।’
ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাকে দেখলে হইহই করে এগিয়ে আসে। সান্তা হাত বাড়িয়ে দেয়। ছবি তোলা হয়। কেউ খুশি হয়ে টাকা দিলে তবে একটু স্বস্তি। না দিলেও কোনো দাবি নেই। এরই মাঝে মেলায় ভিড়ের মাঝ থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় যখন, তখন তিনি হঠাৎ একাহয়ে পড়েন। বলেন, ‘মেলায় বেশিক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়াতে দিচ্ছে না। সিকিউরিটি এসে সরিয়ে দিচ্ছে।’ নীলকণ্ঠের জীবনজুড়ে প্রতিবন্ধকতা। মেলায় সিকিউরিটির তাড়া খাবেন, এ আর নতুন কি?
নীলকণ্ঠ বিয়েবাড়ি বা জন্মদিনের পার্টিতে বাচ্চাদের আনন্দ দিতে সেজেগুজে হাজির হয়ে যান। ছোটদের ভালোবাসেন বলে জানালেন। বইমেলার সময় বাড়তি রোজগারের আশায় কাটোয়া থেকে নিয়ম করে কলকাতায় চলে আসেন। মেলামাঠে এ সব কথাই হচ্ছিল। কথার ফাঁকে একটি খুদে এল। তার দাবি, দাড়িতে হাত দিতে হবে। সান্তা রাজি। আর এক খুদে বলগা হরিণ চড়বে। সান্তা বললেন, পরের বছর বলগাকে নিয়ে আসব। দাড়ির আড়ালে তাঁর তেরচা হাসি কখনও চোখে পড়ে না কারও। না হলে বোঝা যেত, সান্তা করুণ হাসেন। নিজের মনে বিড়বিড় করেন, নীলকণ্ঠ নামটা বুঝেশুনেই রেখেছিল পূর্বপুরুষরা। অভাবের গরল গিলে সান্তাক্লজের গলা পর্যন্ত নীল হয়ে যায়। সাদা দাড়ির আড়ালে থাকে বলে কারও চোখে পড়ে না।