সমুদ্রের টানে অনেকেই গোড়ালি ভেজানো জল থেকে নেমে যান গলা অবধি সাগরে! কীভাবে জলে ডোবা থেকে বাঁচবেন? জানাচ্ছেন বিশিষ্ট সাঁতারু বুলা চৌধুরি।
সমুদ্রের টানে অনেকেই গোড়ালি ভেজানো জল থেকে নেমে যান গলা অবধি সাগরে! কীভাবে জলে ডোবা থেকে বাঁচবেন? জানাচ্ছেন বিশিষ্ট সাঁতারু বুলা চৌধুরি।
পুরী আমার খুব প্রিয় জায়গা। বছরে বহুবার ওখানে যাই। অনেক বছর আগের ঘটনা। ওই পুরীর সমুদ্রেই আইআইটি কানপুরের একটি ছেলেকে জলে ডুবতে দেখেছিলাম। বিয়ের পরের ঘটনা। পুরীতে গেলে প্র্যাকটিসও করি। তেমনই জলে প্র্যাকটিস করছি, হঠাত্ দেখলাম পাড় থেকে খানিকটা দূরে, একটি ছেলে সমুদ্রে ভাসছে! সঙ্গে একটা হাওয়া ভরা টিউব আছে ঠিকই, তবে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে একটা হাত তুলে কী সব বলছে। ঢেউয়ের শব্দে তার গলা বার বার চাপা পড়ে যাচ্ছে। তবে বুঝতে পারলাম, ছেলেটি জলে একটা জায়গায় আটকে আছে, এগতেও পারছে না, পিছিয়েও আসতে পারছে না। সম্ভবত হিন্দিতে কিছু বলছিল! হাজব্যান্ডকে বললাম নুলিয়াদের ডেকে আনতে। অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছিল ওই ছেলেটি বিপদগ্রস্ত, জলে ডুবে যাচ্ছে! নুলিয়া ছেলেটিকে পাড়ের দিকে নিয়ে এল। আমিও হাত লাগালাম। ছেলেটি তখন অর্ধমৃত! সারা শরীর সাদা হয়ে গিয়েছে। পাড়ে এনে দীর্ঘ সময় ছেলেটিকে রোদে শুইয়ে রেখে, বুকে পাম্প করে ওকে সুস্থ করা হল। তাই আমি বারবার বলি, জলের অপর নাম জীবন হলেও জল হেলাফেলার বিষয় নয়।
আমার সব ঘাটেরই জল খাওয়া হল। স্যুইমিং পুল, পুকুর, লেক, সমুদ্র, গঙ্গা—সব ঘাটেরই চরিত্র আলাদা। তবে সমুদ্র সবচাইতে অনিশ্চিত। সমুদ্রের অদ্ভুত একটা টান আছে!
এই গোড়ালি ডোবানো জলে দাঁড়িয়েছিলেন, তারপর কখন যে একটু একটু করে এগতে এগতে কোমর জলে গিয়ে দাঁড়াবেন কেউ জানে না! আর সমুদ্রে পায়ের তলায় বালি সরে যায় বার বার। গর্ত হয়ে গেলে অনেকখানি শরীরের ভারসাম্য সহজে ধরে রাখাও যায় না। এমনকী পোড় খাওয়া সাঁতারুরাও সমুদ্রকে ডেঞ্জারাস বলেন। জলের কারেন্ট ঘোল খাইয়ে দেয় একেবারে। এখনও সমুদ্রে নামার আগে ঈশ্বরকে স্মরণ করি। সাঁতার না জানলে সমুদ্রে নামার আগে খুব সতর্ক হয়ে নামতে হয়। সবসময় সঙ্গে লোক থাকা দরকার, নুলিয়া থাকলে ভালো!
সমুদ্রে এত প্র্যাকটিস করি, তবু যথাসম্ভব সমুদ্রের কিনারার কাছেই থাকি। অথচ বাকিদের কার্যকলাপ দেখলে ভয় লাগে! অতশত লোক, স্নান করতে গিয়ে জাম্প দিচ্ছে, সাঁতার কাটতে কাটতে সমুদ্রের গভীরে চলে যাচ্ছে! সাঁতার জানে কি না জানি না! কেউ জোর করে টেনে নিয়ে যায় অন্যকে, বাচ্চাগুলো যেতে চায় না, কাঁদছে, তাও নিয়ে যাবে। এরা বোঝেই না যে সমুদ্রের টান, সমুদ্রের যে টেনে নিয়ে যাওয়া, এটাই সমুদ্রের চরিত্র!
আমি বলব, সবার আগে প্রত্যেকের সাঁতারটা শেখা উচিত। বয়স যাই হোক না কেন! বাবা-মায়েরা অবশ্যই সন্তানকে শেখান সাঁতার, অভিভাবকরাও শিখুন সাঁতার। সাঁতার জানলে কিছুটা আত্মবিশ্বাস থাকে। এই কনফিডেন্সটা খুব দরকার। আচমকা জলে পড়লে প্যানিক থেকে অনেক সময় হার্ট অ্যাটাক হয়। সাঁতার জানলে সেই প্যানিকটা কাটিয়ে ওঠা যায়। এই গরমকালে তাই সাঁতার শিখে নিন—এটাই আমার আবেদন।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক